ঢাবির সাবেক ছাত্রনেতাদের চোখে যেমন হলো ডাকসু নির্বাচন

আবরার আবদুল্লাহ ।।

আজ অনিয়মের অভিযোগের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে বর্জনের মাধ্যমে শেষ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। দীর্ঘ ২৮ বছর পর হওয়া এই নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভেতর ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। এতে অংশগ্রহণ নেয় ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ বাম ও ইসলামি ধারার একাধিক ছাত্র সংগঠন।

শুরু থেকেই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ব্যতীত অন্যরা প্রশাসনের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ আনলেও শেষ পর্যন্ত প্রচার-প্রাচরণা চালিয়ে যায় তারা। আশা ব্যক্ত করে শেষ পর্যন্ত একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সাধারণ ছাত্ররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। কিন্তু দিনশেষে ‘প্রহসনে’র নির্বাচন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

আজ সকালে ভোট শুরু হওয়ার আগেই কুয়েত মৈত্রী হলে সিলমারা ব্যালটবাক্স পাওয়া যায়। এই অভিযোগের ভেতর দিয়েই শুরু হয় ডাকসু নির্বাচন। এরপর একই রকম অভিযোগ আসে রোকেয়া হল ও সুফিয়া কামাল হল থেকে। মুহসীন হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। হামলা হয়েছে বিরোধী প্যানেলের কোনো কোনো প্রার্থীর উপর।

আজকের ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কথা বলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতার সঙ্গে। এ সময় তারা নির্বাচন নিয়ে তাদের ক্ষোভ, ব্যথা ও হতাশার কথাই তুলে ধরেন। তারা বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে নিয়ে স্বৈরাচারী-সামরিক শাসকদের অধীনেও ডাকসু নির্বাচনে এমন ভোট ডাকাতি হয়নি। এই নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের গায়ে কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

আমরা ব্যথিত, তবে বিস্মিত নই : অধ্যাপক ড. আহমদ আবদুল কাদের,

আজ ডাকসু নির্বাচনে যা হলো তাতে আমরা ব্যথিত তবে বিস্মিত নই। এমনটিই হবে সেটা আগ থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো। যখন অস্বচ্ছ ব্যালটবাক্স দিলো, ছাত্রলীগ ছাড়া আর কারো দাবি মানা হলো না তখনই আমাদের মনে হয়েছে এখানেও ৩০ ডিসেম্বরের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তবুও অনেকেই মনে করেছিলো, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ এখানে হয়তো ন্যূনতম নৈতিকতা দেখানো হবে। কিন্তু তা হয়নি। স্বৈরাচারী সরকারের কাছে সাধারণ নির্বাচন ও ডাকসুর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।

আমরা মনে করি, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটাধিকারের জন্য এখন যে আন্দোলন করছে তা অযৌক্তিক নয়। এর প্রতি আমাদের নৈতিক সমর্থন রয়েছে।

-মহাসচিব, খেলাফত মজলিস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই নির্বাচন কলঙ্ক হয়ে থাকবে : অ্যাডভোটেক শাহীনূর পাশা চৌধুরী

বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন যখন অবাধ ‍ও সুষ্ঠু হলো না, তখন আর কোথায় হবে? এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার আশা করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ নির্বাচনের নামে যে প্রহসন হলো তা তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলবে, তাদের চরমভাবে হতাশ করবে।

আমার মনে হয়, এই নির্বাচন সরকারের প্রকৃত রূপ তুলে ধরেছে। মানুষ ক্ষুব্ধ। যে কোনো সময় জনবিস্ফোরণ ঘটবে এবং সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও হতে পারে। আমরা ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন দেখেছি। সরকার সেখানে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি এবং তা করতে পারে বলেও কেউ কল্পনা করতো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবে অনেকেই গর্ববোধ করেন। কিন্তু আজকের পর তারা কী সেটা পারবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই নির্বাচন কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

-সহ-সভাপতি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ

ভিসির নুরুল হুদার সুরে কথা বলা দুঃখজনক : মাওলানা গাজী আতাউর রহমান

আওয়ামী লীগ সরকার আবারও প্রমাণ করলো তাদের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। সচেতন মহল আগ থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলো যে, ডাকসু নির্বাচনে অনিয়ম হবে। কারণ, শুরু থেকেই প্রশাসন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছিলো। তারপরও ধারণা করা হয়েছিলো, যেহেতু শিক্ষকরাই নির্বাচনের সব দায়িত্বপালন করবেন এবং সরকারি বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের বিশেষ কোনো ভূমিকা থাকবে না, তাই হয়তো ছাত্ররা ভোট দিতে পারবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আজ যেভাবে নির্বাচনি জালিয়াতিতে সহযোগিতা করলেন, তাতে বলা যায় সমাজের মাথায় পচন ধরেছে। আজ নির্বাচনের পর ভিসি প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদার সুরেই কথা বললেন। প্রায় সবগুলো হল থেকেই অভিযোগ পাওয়া গেছে অথচ ভিসি বলছেন, অবাধ-সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন হয়েছে। ছাত্ররা সকাল থেকে বিক্ষোভ করছে, প্রতিবাদ করছে আর ভিসি বলছেন উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক।

-যুগ্ম মহাসচিব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

প্রতিবাদকারীদের ব্যাপারে হামলা, মামলা ও গুমের আশঙ্কা করছি : গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম

সরকারের লেখা নাকটই মঞ্চস্থ করা হয়েছে ডাকসু নির্বাচনে। দেশ ও জাতি যে দিকেই যাক একই কবিতা সব জায়গা পড়া হচ্ছে। এজন্য আমরা এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে নই। তারপরও মনে করা হয়েছিলো, এখানের ভোটাররা সচেতন এবং আয়োজকরা (প্রশাসন) শিক্ষক হিসেবে জাতির বিবেক –এখানে হয়তো অনিয়ম হবে না। কিন্তু রীতিমত ডাকাতি হলো সেখানে। একটা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সাথে যদি ডাকসু নির্বাচনের কোনো পার্থক্য না থাকে তাহলে দেশ কোথায় যাচ্ছে বলেন? মূলত সামগ্রিক পরিবর্তন ছাড়া এই অনিয়মের হাত আত্মরক্ষা পাওয়া যাবে না।

যারা আন্দোলন করছে আমি তাদের সাথে একমত। কিন্তু আন্দোলন কতো দূর এগিয়ে নিতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাদের ব্যাপারে হামলা, মামলা ও গুমের আশঙ্কা করছি।

-সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম

পূর্ববর্তি সংবাদহবিগঞ্জে বইমেলায় নেওয়ার কথা বলে স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় আটক ১
পরবর্তি সংবাদআপন জুয়েলার্সের মালিকের বিরুদ্ধে পুত্রবধূর মামলা