শিশু শিক্ষার্থীদের মাত্রাতিরিক্ত প্রহারের ঘটনা : যা বললেন কওমি বোর্ডের দায়িত্বশীলরা

আতাউর রহমান খসরু ।।

কয়েকদিন আগের কথা। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার পাওয়া একটি ভিডিওতে চোখ আটকে গেলো। এক মিনিটের এই ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে একজন শিক্ষক শিশু শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে বেদম প্রহার করছেন। প্রহারের এক পর্যায়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং শিশুকে তুলে আছাড় দিলেন। আবার পেটালেন এবং আবার আছাড় দিলেন। এদিকে গত ৮ মার্চ বেত্রাঘাতের অভিযোগে টাঙ্গাইলে এক মাদরাসা শিক্ষককে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সরকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে শিশুদের বেত্রাঘাত নিষিদ্ধ করেছে। তবুও মাদরাসাগুলোয় এই প্রবণতা কিছুটা রয়ে গেছে। যার সুযোগে দেশের কিছু চিহ্নিত মিডিয়া ও ব্যক্তি বারবার ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে আঙুল তোলার সুযোগ পাচ্ছে। মাদরাসা শিক্ষকদের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে এলাকার ইসলাম বিদ্বেষী একটি মহল এবং কিছু অসৎ মিডিয়া তিলকে তাল বানিয়ে প্রচার করে। এতে সামগ্রিকভাবে দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।

মাদরাসার কতিপয় শিক্ষকের এই প্রবণতা দূর করা যাচ্ছে না কেন এবং তা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী- জানতে যোগাযোগ করেছিলাম দেশের তিনটি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের কর্তা ব্যক্তিদের সঙ্গে। উত্তরে তারা বলছেন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও মনিটরিংয়ের অভাবে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। তবে তারা শিশুদের বেত্রাঘাত যে কিছুতেই অনুমোদনযোগ্য নয় সে বিষয়ে একমত হন।

বোর্ড কর্মকর্তারা মনে করেন, এখন এই বিষয়ে সকল বোর্ডেরই মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিত মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়াও উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে পারে।

প্রবীণ আলেম ও বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড-বেফাকের মহাপরিচালক মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরী এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি এটাকে অন্যায় ও এক ধরনের নির্যাতন মনে করি। বেফাকের শিক্ষক প্রশিক্ষণগুলোতে এই বিষয়ে বারবার তাগিদ দেওয়া হয়, যেন তারা অসংযত কোনো আচরণ না করেন এবং শিশুদেরকে স্নেহ-মমতা দিয়ে বোঝান। তবুও অনেকেই বিষয়টা খেয়াল রাখেন না। আমরা বলি, প্রয়োজনে একটু ধমক দেবেন। এর বেশি শাসনের দরকার নেই।

একই কথা বলেন সিলেটের আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম-এর মুখপাত্র মাওলানা এনামুল হক। শিশুদের বেত্রাঘাত করা শুধু রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ নয়; বরং শরিয়তের দৃষ্টিতেও শিশুদের প্রহার করা একটি নিন্দনীয় অপরাধ। অমানবিক, অন্যায় কাজ। তাকে কিছুতেই শিক্ষকসূলভ আচরণ বলা যায় না।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষকতার জন্য শুধু পাঠদান যথেষ্ট নয়। শিক্ষকের বহুবিধ গুণাবলী থাকাও প্রয়োজন।

শিশুদের মাত্রাতিরিক্ত বেত্রাঘাত কিংবা প্রহার করা নিষিদ্ধ –এই কথায় একমত হলেও প্রয়োজনে মৃদু আঘাতে তাকে শাসন করা যাবে বলে মত দেন উত্তরবঙ্গের তানযীমুল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশ-এর মহাসচিব মুফতি এনামুল হাসান। তিনি বলেন, নাবালেগ শিশুকে বেত্রাঘাত করা বৈধ নয়। হাদিসের বর্ণনায় সর্বোচ্চ যে শাসনের কথা পাওয়া যায় তাহলো, হাত দিয়ে তিনবার মৃদু আঘাত করা। তাও স্পর্শকাতর অঙ্গে করা যাবে না। বেত্রাঘাতের অনুমতি একেবারেই নেই। হজরত মিরছাদ রা. শিশুদের পাঠদান করতেন। রাসুলুল্লাহ সা. তাকে বলেন, হাত দিয়ে তিনের অধিক আঘাত নয়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শরিয়তের এই মৃদু প্রহারের অনুমতি যেন ক্ষোভ মেটানোর বাহানায় পরিণত না হয়। প্রহারের নাম শাসন না। শাসনের আরও অনেক পদ্ধতি আছে। শিক্ষক যদি ব্যক্তিত্ববান হন, তবে তার চোখ রাঙানো ও ধমকই শাসনের জন্য যথেষ্ট। হাদিস শরিফে ধমকের অনুমতি পাওয়া যায়।

তার কাছেই প্রশ্ন করেছিলাম, মক্তবে শিশুদের মাত্রাতিরিক্ত বেত্রাঘাতের ব্যাপারে বোর্ড পরিচালকরা কঠোর মনোভাব পোষণ করলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন? উত্তরে তিনি কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেন। তাহলো, জ্ঞানের অভাব, স্বভাবসূলভ রূঢ়তা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব। অনেকেই জানে না যে, শিশুদের সঙ্গে ইসলাম তাকে কেমন আচরণ করতে বলেছে? তাকে শাসন করার পদ্ধতিটা কী?

মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরী এর সঙ্গে বয়সের অপরিপক্কতা ও অভিজ্ঞতার অভাবকে যুক্ত করেন। তার পর্যবেক্ষণ হলো, নবীনদের দ্বারা ভুলটা তুলনামূলক বেশি হচ্ছে। কারণ, শিক্ষকসূলভ মেজাজ গড়ে উঠতে যে সময় প্রয়োজন তা তারা পাননি।

মুফতি এনামুল হাসানের বক্তব্যেও অনভিজ্ঞতার কথাটি আসে। তার বক্তব্য হলো, এখন খুব অল্প বয়সে ছাত্ররা শিক্ষক হয়ে যাচ্ছে। তাদের জ্ঞানের পরিপক্কতা ও অভিজ্ঞতার অভাবটা থেকেই যায়। শিক্ষকতা কীভাবে করতে হবে সে সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকে না এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণকে তারা প্রয়োজনীয়ও মনে করে না।

অনভিজ্ঞতার কারণে তরুণ আলেমরা কর্মজীবনে পা রেখেই যেন ভুল করে না বসেন সেজন্য মুফতি এনামুল হাসানের পরামর্শ হলো, মাদরাসার উপরের দিকের দরসে শিক্ষকতা কীভাবে করতে হবে সে সম্পর্কেও আলোচনা হোক। বিশেষত তাখাসসুসের ছাত্রদের শিক্ষকতার নিয়ম পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া একান্তই প্রয়োজন।

এই তিনজনের মধ্যে দুইজনই স্বীকার করেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণে তারা শিশুদের বেত্রাঘাতের ব্যাপারে সতর্ক করলেও বোর্ডের পক্ষ থেকে মাদরাসা পরিচালকদের জন্য এই ব্যাপারে কোনো লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয় না। আর অন্যজন বলেন, তাদের বোর্ড লিখিত নির্দেশনা দিলেও তা গুরুত্বের সঙ্গে নেন না মাদরাসা পরিচালকরা। তিনি বোর্ডগুলোর মনিটরিং বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।

অবশ্য বেফাক মহাপরিচালক জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং তারা মাদরাসা পরিচালকদের সতর্ক করে নির্দেশনা জারির চিন্তা করছেন।

বিষয়টির সঙ্গে একমত হন মাওলানা এনামুল হক। শিশুদের শাসন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। সব বোর্ডেই এমন করা দরকার। হাইয়াতুল উলয়াও এই বিব্রতকর পরিস্থিতি ও সমালোচনার হাত থেকে দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুক্ত রাখার উদ্যোগ নিতে পারে –প্রস্তাব মাওলানা এনামুল হকের।

তিনি জানান, আযাদ দ্বীনি এদারার পক্ষ থেকে শিশুদের শাসন করার ব্যাপারে থেকে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। তবে বোর্ডের বার্ষিক সাধারণ সভায় মাদরাসার দায়িত্বশীল শিক্ষকদের শিক্ষার উন্নয়ন ও পদ্ধতি, ছাত্রদের চরিত্র গঠন ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে এসব বিষয়ে নির্দেশনা তুলে ধরা হয়।

এই আলেমদের বক্তব্যে মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও প্রবলভাবে উঠে আসে। মাওলানা এনামুল হক আক্ষেপ করে বলেন, একটি কথা বললে হয়তো আমাদের উপর চলে আসবে। তবুও বলি, শিক্ষকদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ একান্ত প্রয়োজন। স্বল্প মেয়াদি ও বিক্ষিপ্ত কিছু প্রশিক্ষণ হচ্ছে। সমন্বয় না থাকার কারণে তার দ্বারা পুরোপুরি উপকারও পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘ মেয়াদি প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। শিক্ষক যে বিভাগেরই হোন না কেন তার মৌলিক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।

মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরীও প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্বারোপ করেন। সাথে সাথে প্রশিক্ষণের প্রতি শিক্ষকদের অনীহার কথাও জানান। তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। তা আরও বিস্তৃত হওয়া দরকার। প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের শিক্ষকরাও যে প্রশিক্ষণে আগ্রহী তেমন মনে হয় না। আমি তাদের বলি, পান দোকানদারেরও খিলি বানানো শিখতে হয়। নামাজের বিধান আসার পর হজরত জিবরাইল আ. রাসুলুল্লাহ সা.-কে হাতে-কলমে নামাজ শেখান। এটা প্রশিক্ষণ। আমাদের প্রিয় নবী সা. প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাহলে আমাদের নিতে সংকোচ কেন?

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহী করতে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক করা যায় কি না? এই প্রশ্নের উত্তরে বেফাকের পরিকল্পনা তুলে ধরে মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরী বলেন, শিক্ষকতার জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার চিন্তাও আমরা করছি। এটা হঠাৎ করেই করা যাবে না। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পর এমন সিদ্ধান্ত আমরা নেবো। আমরা দেশব্যাপী একটি ‘ছায়া’ বেতন স্কেল প্রণয়নের কাজ করছি। সেটার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অগ্রাধিকারের নির্দেশনা দেবো।

এখন থেকে যায়, শাসনের বিষয়। শিশুর শিক্ষা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে শাসনের প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই। সেটা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? আযাদ দ্বীনি এদারার মাওলানা এনামুল হক পরামর্শ হলো, বেত্রাঘাত মাধ্যমে শাসন নয়, আখলাক-চরিত্র, উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাধ্যমে ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেটা করতে পারলে তা হবে দক্ষ শিক্ষকের পরিচয়। শিশুরা আতঙ্কিত হয় এমন কোনো শাসনই করা উচিৎ বলে আমি মনে করি না।

প্রহার বা বেত্রাঘাত ছাড়াও যে শাসন করা যায় তার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রচুর দৃষ্টান্ত আছে যেখানে বেত্রাঘাত ছাড়াই শিশুদের পাঠদান করা হয়। আমরা সব জায়গায় যাইনি। কিন্তু আমাদের এলাকার প্রচুর মানুষ ইউরোপে থাকার কারণে জানতে পেরেছি, সেখানে বেত্রাঘাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি বেতের মাধ্যমে ভয় দেখানোও নিষেধ। ইউরোপের শিশুরা কী শিখছে না?

সর্বশেষ প্রশ্ন ছিলো শিশু শ্রেণির একজন শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য কী হবে? তানযীমুল মাদারিসের মুফতি এনামুল হাসান খুব সহজ ভাষায় সুন্দর করে বলেন, নিজের সন্তানের সঙ্গে আমি যেমন আচরণ প্রত্যাশা করি, অন্যের সন্তানের সাথেও একই রকম আচরণ করতে পারলে অনেক সমস্যারই সমাধান হবে।

তার বক্তব্যের বিশ্লেষণ করেন মাওলানা এনামুল হাসান। বলেন, শিশু শ্রেণির শিক্ষকরা চরিত্রবান, নম্রভাষী ও ধৈর্যশীল হবেন। আচার-আচরণ-ব্যবহার থেকে নিয়ে শব্দ প্রয়োগের ব্যাপারেও ভদ্র ও মার্জিত হবেন। পাশাপাশি তার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। কারণ, যার শিক্ষাই পরিপূর্ণ নয় সে শিশুদের সঙ্গে সুন্দর আচরণের মর্ম বুঝবে কীভাবে? আমাদের বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী মক্তবের শিক্ষক হওয়ার জন্যও দাওরা পাস হতে হয়।

বেফাক মহাপরিচালক তার সঙ্গে আরেকটু যোগ করে বলেন, আমি মনে করি, শিক্ষকতার ক্ষেত্রে শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি তার বোধবুদ্ধির অগ্রগতি ও বয়সের বিষয়টিও লক্ষ্য করা উচিৎ।

পূর্ববর্তি সংবাদক্যাম্পাসে আবারও নুরুর উপর ছাত্রলীগের হামলা!
পরবর্তি সংবাদক্লাসে আসেনি শিক্ষার্থীরা, থমথমে পরিস্থিতি ঢাবি ক্যাম্পাসে