টাকাকড়িই শুধু নয়, রোহিঙ্গাদের সংস্কৃতিও লোপাট করছে এনজিওগুলো!

আবু তাশরীফ ।।

এবার এনজিওগুলোর অসদুদ্দেশ্য নিয়ে মুখ খুলেছেন খোদ সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তিনি কোনো রাখঢাক না করেই বলেছেন, ‘আমরা লক্ষ করছি যে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কিছু এনজিও আছে, যারা ইল মোটিভ (খারাপ উদ্দেশ্য) নিয়ে কাজ করছে। আমাদের গোয়েন্দা রিপোর্টে তা উঠে এসেছে।’

ঘটনা গত বুধবারের (১৩ মার্চ)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন মুক্তিযুক্ত বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করা পশ্চিমা এনজিওগুলোর কাজ-কারবার নিয়ে নানা রকম অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল আরো আগে থেকেই। মূলধারার গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেসব অভিযোগের সচিত্র বর্ণনা বারবারই চোখে পড়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে উপরের কেউ গা করেছেন বলে চোখে পড়েনি। এবার সরকারের একজন মন্ত্রীর কথায় বোঝা গেল –এতদিনকার আলোচিত অভিযোগগুলো আসলেই কল্পিত কোনো অভিযোগ ছিল না, অভিযোগগুলো মিথ্যাও ছিল না।

মন্ত্রী মহোদয় অবশ্য এনজিওগুলোর টাকাপয়সা ঘটিত অনাচার নিয়েই মুখ্যত মুখ খুলেছেন। অন্য বিষয়ে তিনি কথা বাড়াননি। তিনি বলেছেন-‘আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে, গত সেপ্টম্বরের পর থেকে এ পর্যন্ত এনজিওগুলো আবাসিক হোটেলগুলোর বিলই দিয়েছে ১৫০ কোটি টাকার উপরে। ফ্ল্যাট ও বাসা-বাড়ি ভাড়া দিয়েছে প্রায় আট কোটি টাকা। বিদেশ থেকে টাকা এনে খরচ করার কথা রোহিঙ্গাদের জন্য, অথচ সেই টাকা ২৫ ভাগও তাদের জন্য খরচ হয় না। ৭৫ ভাগই খরচ হয়  যারা দেখাশোনার জন্য আসেন তাদের জন্য। এটা খুবই দুঃখজনক।’ মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, এ জাতীয় ‘অর্থ লোপাটকারী’ এনজিওকে চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো সারাদেশেই ‘অর্থভোগী’ এনজিও ছড়িয়ে আছে। রাজধানীতে বড়সড় জাঁকালো অফিস বসিয়ে তৃণমূলে ‘দারিদ্র নির্মূলের’ সেবা-ব্যবসা করছে এমন এনজিওর মোটেই অভাব নেই দেশে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মূলত সেই ‘সেবা-ব্যবসার’ই একটি ছায়াচিত্র সামনে চলে এসেছে। এজন্য কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেশজুড়ে জাল বিস্তার করে রাখা পাশ্চাত্য-দেশের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত এনজিওগুলোকে মনিটরিংয়ে আনার ব্যবস্থা করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। এনজিও কর্মকাণ্ডের মনিটরিংয়ে সরকার যত শিগগির মনোযোগ দেবে –দেশের জন্য ততই মঙ্গলজনক হবে।

পাশাপাশি এ কথাও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার জন্য আমরা সরকারের উপর মহলের কাছে আহবান রাখতে চাই যে, এনজিওগুলোর অকাজ শুধু টাকাপয়সা ভোগ করার মধ্যেই সীমিত নয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ধর্মীয় মূল্যবোধ বিনাশ ও মুসলিম শিক্ষা সংস্কৃতি বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও বিভিন্ন এনজিওর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। সে বিষয়েও চোখ রাখা দরকার। দরকার তড়িৎ পদক্ষেপের। বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের প্রায় শতভাগই হচ্ছেন মুসলিম। জীবনাচারে ইসলাম ধর্মীয় অনুশাসন তারা মেনে চলেন। সেই রোহিঙ্গাদের মাঝে খ্রিস্টান মিশনারি প্রভাবিত কোনো কোনো এনজিওর কী কাজ থাকতে পারে বোধগম্য নয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ধর্মান্তরের ধটনার কথাও কয়েক মাস আগে থেকেই উচ্চারিত হয়ে আসছে। এসব বিষয়ে মনোযোগ দেওয়াটা অর্থকড়ির ভোগ-লোপাটের প্রতি লক্ষ করার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জাতি-রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও মুসলিম আত্মমর্যাদার প্রয়োজনেই এনজিওগুলোর ‘ভিন ধর্মীয়’ তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ শিগগির নেওয়া উচিত।

মুক্তিযুক্ত বিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে আমরা সামগ্রিক আশাবাদ নিতে চাই। শুরুটা অর্থকড়ির লোপাটের বিষয়ে মনোযোগ দানের মধ্য দিয়ে হলেও রোহিঙ্গাদের সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য বিনাশের এনজিওপ্রয়াসের ব্যাপারেও সচেতন পদক্ষেপের পথচলা শুরু হতে দেরি হবে না। কারণ, বছর-দুই বছর পর টেকনাফে ধর্মান্তরিত লাখ খানেক খ্রিস্টান রোহিঙ্গা দেখতে চায় না বাংলাদেশের মানুষ।

রোহিঙ্গা  শরণার্থী-মুহাজিরদের জন্য দেশি-বিদেশি সাহায্য প্রয়োজন। এ কথা তো সত্যই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সাহায্যের পরিমাণের চেয়ে বাদ্য-বাজনার মাত্রাটা বেশি হচ্ছে। চোখে পড়ছে সহায়তার চেয়ে তাদের মন, চিন্তা ও সংস্কৃতি দখলের চেষ্টা। ধর্মান্তরের মিশনারি সহায়তা নয় –মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সহায়তাটাই মুখ্য হওয়া উচিৎ। সে সহায়তা বড় সংস্থাই করুক, ছোট সংস্থা করুক। সে সহায়তা প্রাচ্য থেকেই আসুক, পশ্চাত্য থেকেই আসুক। এখন এক মন্ত্রীর মুখে আমরা শুনতে পাচ্ছি এনজিওগুলোর অর্থকড়ি লুটপাটের কথা। অচিরেই আরেক মন্ত্রীর মুখে যেন শুনতে না হয় এনজিওগুলির উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি ছিনতাইয়ের কথা।

পূর্ববর্তি সংবাদটাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ৩১টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর
পরবর্তি সংবাদমুক্তি পাচ্ছেন না সাবেক সংসদ সদস্য রানা