`ইউরোপে বিদ্বেষী দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতায় গেলে বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে’

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টবাদী সন্ত্রাসীর গুলিতে গত ১৫ মার্চ ৫০ জন মুসলমান শহীদ হন। বেদনাদায়ক ও নিষ্ঠুর এ ঘটনা এবং হত্যাকারীর বিভিন্ন বক্তব্য-আচরণে ইউরোপের মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতি ও মনোবৃত্তির ভেতর-বাইরের অবস্থাটি জানার কৌতূহল জেগে উঠেছে অনেকের মধ্যে। তাই এ নিয়ে কথা বলতে ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. হাম্মাদুর রহমানের সঙ্গে সামনাসামনি হয়েছিলেন শরীফ মুহাম্মদ। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. হাম্মাদ পিএইচডি করেছেন জার্মানির গিসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশে ফেরার পরও ইউরোপের রাজনীতি নিয়ে তিনি নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন।


 

ইসলাম টাইমস : নিউজিল্যান্ডে যে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে এ জাতীয় ঘটনা ইউরোপ-আমেরিকায় বা পশ্চিমা দেশগুলোতে কেন ঘটছে?

ড. হাম্মাদ : ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এন্টি মাইগ্রেশন/এন্টি মুসলিম রাজনীতির একটা উত্থান শুরু হয়েছে। এ রাজনীতির শাখা-প্রশাখা ধরে মুসলমানদের ব্যাপারে বহু রকম ঘৃণার চর্চাও হচ্ছে। এরই একটি বহিঃপ্রকাশ নিউজিল্যান্ডের এই কট্টর ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের’ বন্দুক হামলা। এটা একটা ভয়ঙ্কর প্রবণতা নিঃসন্দেহে।

ইসলাম টাইমস : মিডিয়ার তো এসব উসকানি সৃষ্টির পেছনে ভূমিকা আছে?

ড. হাম্মাদ : মিডিয়ার ভূমিকা আছে, রাজনীতির ভূমিকাও আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প্রের রাজনীতির স্লোগানে দেখা গেছে, ইমিগ্রান্ট বিরোধী অবস্থান। নয়-এগারোর পর পশ্চিমের রাজনীতি ও মিডিয়ায় এ জাতীয় বিভাজক ও আক্রমণাত্বক মনোভাবটা বেড়েছে। থিসিস করার সময় প্রায় চার বছর আমি নিজে জার্মানিতে ছিলাম। ২০০১-এ দেশে চলে আসি। তখন সেখানে এ জাতীয় বিদ্বিষ্ট মনোভাবের চর্চা বা প্রকাশ দেখিনি। মূলধারার কিছু কিছু গণমাধ্যম আছে, কিছু রাজনীতিকও আছেন ওইসব দেশে, যারা এই বিভাজন ও ‘শ্রেষ্ঠত্ব ধারণা’র বিরোধী। কিন্তু পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলছে ঘৃণাবাদীরাই। ডোনাল্ড ট্রাম্প্রের পর অভিবাসন বিরোধী রাজনীতিকদের তালিকায় ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ‘দক্ষিণপন্থী’ কট্টর দলগুলোর নেতাদের কথাও বলা যায়। ওদের স্লোগান ও নীতিতে বিদ্বেষ ও ঘৃণার চর্চাটা প্রকট।

ইসলাম টাইমস : এটাকে কি আপনি ক্রুসেড মনোভাব বা প্রস্তুতি বলবেন?

ড. হাম্মাদ : এই মনোবৃত্তি ও রাজনীতিকে এখনই ক্রুসেড মনোবৃত্তি ও প্রস্তুতি বলা যায় কি না, আমি এখনো নিশ্চিত না। তবে হোয়াইট সুপ্রিমেসি বা ‘শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদের’ বিষয়টা তো প্রকাশ্য। এটা তো তারা ঘোষণাই দিচ্ছে। এর পাশাপাশি ক্রুসেড মনোবৃত্তির হাত ধরাধরি ঘটতেও পারে। ভবিষ্যতই বলে দেবে আসলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। তবে পাশ্চাত্যের এসব হিংসাত্মক ঘটনা হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’কেই বাস্তব করে তুলছে বলে মনে করা যেতে পারে।

ইসলাম টাইমস : ইমিগ্রেশনের কথাটা খুব বড় করে বলা হয় ওইসব দেশে। কিন্তু যেসব যুদ্ধ কবলিত দেশ থেকে মুসলমানরা তাদের দেশে ছুটে যায়- সেসব দেশে যুদ্ধাবস্থা চাপিয়ে দেওয়া বা বোমা মেরে মানুষ হত্যা, মানুষের বাড়িঘর ধসিয়ে দিয়ে মানুষকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করার পেছনেও তো তাদের প্রত্যক্ষ- পরোক্ষ দায় আছে? আপনার কী মনে হয়?

ড. হাম্মাদ : এটা তো নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়। আইনগত কোনো দায়বদ্ধতা সম্ভবত তাদের নেই। তাদের একটি সাধারণ নীতি ছিল- জীবনের ভয়ে যেসব মানুষ, যেসব দেশ থেকে তাদের দেশে এসে আশ্রয় নেবে তারা তাদের আশ্রয় দেবে। এই নীতিগত অবস্থানের বিরুদ্ধেই এখন ওইসব দেশে রাজনীতি শুরু হয়েছে। সেই রাজনীতির ভাষা ও স্লোগান হয়ে উঠছে অনেক বিদ্বেষপূর্ণ ও হিংসাত্বক।

ইসলাম টাইমস : পশ্চিমের এই বিদ্বেষী মনোভাবের মধ্যে সেখানকার অধিবাসী বা অভিবাসী মুসলিমরা কি সংকটের মধ্যে বা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছেন না?

ড. হাম্মাদ : ইউরোপ-আমেরিকায় সম্ভবত সামনের দিনগুলোতে মুসলমানরা একটা চ্যালেঞ্জিং অবস্থার মধ্যে পড়বেন। ইউরোপে এন্টি মুসলিম-এন্টি ইমিগ্র্যান্ট রাজনীতি ও মনোভাব আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা হচ্ছে। এতে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। তবে আমার মনে হয়, এঙ্গেলা মার্কেলের মতো রাজনীতিকও সেসব দেশে আছে। শুভবুদ্ধির গণমাধ্যম ও বুদ্ধিবৃত্তিও আছে। তারা হয়তো সতর্কতামূলক পদক্ষেপ বাড়িয়ে দেবে। কারণ, তাদের সতর্ক হতে হবে। সতর্ক না হলে পরিস্থিতির অনেক রকম পাল্টাপাল্টি রূপ তৈরি হবে। সেটা কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।

ইসলাম টাইমস : আপনি বলছেন তাদের রাজনীতি ও গণমাধ্যমের একটি অংশ এই ঘৃণাচর্চার বিরুদ্ধে সতর্কতা তৈরির কাজ করবে, না করলে ক্ষতি হবে। সেটা কীভাবে?

ড. হাম্মাদ : ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে ইমিগ্র্যান্ট ও মাইগ্রেন্টরা এখনই গণনাযোগ্য একটি অবস্থানে আছে। দিন দিন তাদের শক্তি আরও বাড়বে। বর্ণবাদী ও মুসলিম বিদ্বেষী হামলা বাড়লে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঘটনাও ঘটবে। এটা একটা স্বাভাবিক অঙ্কের আশঙ্কা। এমনই হওয়ার কথা। আর যদি এই হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে ইউরোপে দক্ষিণপন্থী বিদ্বেষী রাজনীতিকরা ক্ষমতায় চলে যায়, তাহলে বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ ক্ষমতায় বসে তারা যখন নানারকম বৈরী আচরণ শুরু করবে তখন তার প্রতিক্রিয়াও নানা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। ছোট ছোট সংঘাত থেকে দেশভিত্তিক বিরোধ নানা ভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে এতে।

ইসলাম টাইমস : পশ্চিমা যেসব মিডিয়া এসব বর্ণবাদী ও খ্রিস্টবাদী উগ্রতার ব্যাপারে কিছুটা সোচ্চার কিংবা বলা যায়- ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনা ঘটার সময় ন্যায়ানুগ আচরণ করে তাদের দ্বারা ভালো কোনো প্রভাব পড়ে না ওই সমাজে?

ড. হাম্মাদ : মুসলমানদের প্রতি সহিংসতা ও সন্ত্রাসের খবর ও আলোচনা মিডিয়াগুলোতে এলেও এটা বেশিক্ষণ থাকে না। উত্তাপ তৈরি করতে পারে না। সহানুভূতি ও চাপ ধরে রাখতে পারে না, হারিয়ে যায়। এ কারণে ওইসব মিডিয়ার তাৎক্ষণিক ইতিবাচক ভূমিকা সেখানকার উগ্র মুসলিম বিদ্বেষের পরিস্থিতিটাকে ভালো করার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।

ইসলাম টাইমস: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক শুকরিয়া।

ড. হাম্মাদ: আপনাকে এবং ইসলাম টাইমসকেও শুকরিয়া।

পূর্ববর্তি সংবাদরাতে সিল মারা ঠেকাতে সকালে পাঠানো হবে ব্যালট পেপার : ইসি সচিব
পরবর্তি সংবাদফের কাশ্মীর সীমান্তে গোলাগুলি: ভারতীয় এক সেনা নিহত