বাগান দেখার এই সুখ-সকাল!

শরীফ মুহাম্মদ ।।

রাতে ছিল ঝড়ো বাতাস। সঙ্গে হালকা বৃষ্টি। ফজরের পর এক শান্ত সকাল। না শীত, না গরম। ছিল শীতল বাতাসের মৃদু আদর। দাওয়াহ বিভাগের ছাত্র মাওলানা মামুনকে নিয়ে বের হলাম সাতটার পর। বৌনাকান্দি মোড়ের হোটেলে পরাটা খাওয়ার ইচ্ছা। ক্ষেতের আইল আর ফাঁকা পথ বড় মায়াবী লাগছিল।

নাস্তা-চা পর্ব শেষ হওয়ার পর বৌনাকান্দি মোড় থেকে পশ্চিম দিকে চোখ ফেরালাম। অদূর থেকে যেন ডাকছে মাদরাসাতুল মাদীনার সবুজ গম্বুজ। অটোতে উঠে পড়লাম। পাঁচ মিনিট? হবে হয়তো। মাদরাসার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মসজিদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাঠজুড়ে নানা মাত্রিক বাগান। মাওলানা ইরফান গেট থেকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন।

মাদরাসাতুল মাদীনার সীমানা শুরু। প্রায় সব শিশু, অল্প ক’জন কিশোর ছাত্র। সাদা পোশাকে হাঁটাচলা করছে একঝাঁক ফুল। এদিকে থেকে ওদিকে যাচ্ছে তারা। এখন চলছে সকালের দস্তরখান। মাওলানা ইরফানের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরলাম। উত্তরের ভবনটা ছিল আমার চোখে নতুন। হাম্মামের উপরে বানানো ছোট্ট সুইমিং কর্ণার। দশ-পনের মিনিটের সফর ও অবস্থান। এত প্রশান্তিদায়ক; মাশাআল্লাহ! দেখা ও কথা হলো মাওলানা ফাইরোজের সঙ্গে। আমাদের ভাতিজা, মাওলানা বশির মিসবাহ ভাইয়ের ছেলে হোযাইফার সঙ্গে।

উস্তায মুহতারাম মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ ছাহেব- আদীব হুজুরের বাগান। সাজানো বাগান, স্বপ্ন ও কাজের বাগান। গেটের কাছে এসে বারবার ঘুরে দেখলাম। মসজিদের দিকে চোখ চলে যায়। চারদিকে সবুজের মধ্যে যেন এক সফেদ আলোর খণ্ড। চারদিকের নিরিবিলির মধ্যে যেন এক প্রশান্ত মজমা।

ফিরে চললাম বৌনাকান্দির মোড়ের দিকে। সামান্য ডানে মারকায যায়েদ ইবনে সাবেত রা.। একতলা একটি বড়সড় ভবন। কিছুদিন আগে মুহতামিম মাওলানা আনোয়ারুল আজিম সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। একসঙ্গে নাস্তা, একসঙ্গে সিএনজিতে করে মোহাম্মদপুর। মনে হলো, আজ আবার দেখা করে যাই। চলে গেলাম, কিন্তু গ্রিলের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো বিশ্রামে আছেন বেশিরভাগ মানুষ। ডাকাডাকি আর আওয়াজে সমস্যা তৈরি না করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেই চলে এলাম। আবার ঠিকানার পথে। মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার প্রধান প্রাঙ্গনে।

বলছিলাম কেরানীগঞ্জের হজরতপুরের কথা। হজরতপুর ইউনিয়নের এই গ্রামটির নাম বৌনাকান্দি। কিন্তু ইসলামপ্রিয় মানুষ ও আলেমদের কাছে এর সবটাই হজরতপুর! এখনো ঘন বসতি গড়ে উঠেনি। দূরে-অদূরে বাড়ি। চারদিকে সবুজ সবজির ক্ষেত। পথের বুকে হঠাৎ একটি-দুটি মামুলি বাহন। সকালের এই সময়টা এত সুন্দর! এত শান্ত! মারকাযুদ দাওয়াহর দাওয়া-ভবনের ছাদে উঠে কাছে-দূরে চারদিকে চোখ ফেরালাম। আমার মন-ভালো লাগার কারণেই কি না জানি না, মনে হলো, অদ্ভুত প্রশান্ত, ঝিমঝাম, ছিমছাম এক জগত। মনে হলো, এক উঁচু আলোর পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সবুজ দেখছি দু’চোখ ভরে। স্কাইলাইন বলতে একটা শব্দ আছে; দিগন্তরেখা। খুব দূরে নয়- কাছের দিগন্তরেখাই যেন এখানে বড্ড সবুজ আর মন কেমন করা শান্ত। আর মারকাযুদ দাওয়া যেন সবুজের সাগরে প্রাণের এক দ্বীপ। থেকে যাই, থেকে যাই- ডাক। কখনো কখনো এমন হয়- রাতের ঘুম ভালো হলে, সকালটা আদুরে হলে, ভিড়-হইচই না থাকলে মনের মধ্যে ভালো লাগার একটা আস্ত আকাশ নেমে আসে। সেই সকালে আমার তেমনই হলো।

গত রাতে আধা ঘণ্টার জন্য বসেছিলাম হযরত মাওলানা আবদুল মালেক ছাহেবের তেপায়ার সামনে। তার হাতে কিতাব, কপি, চারদিকে পড়ার মধ্যে ডুবে যাওয়ার আয়োজন। স্মিত হাসি মুখে তার টুকরো টুকরো কথায় মন ভালো হয়ে যায়। রাত বাড়ছিল। তিনি কিতাব তাক থেকে নামিয়ে রাখছিলেন। এবার পড়তে বসবেন। পড়ার মধ্যে ডুবতে বসবেন। বসে থাকতে তো ভালোই লাগে, কিন্তু আরও বসে থাকা মানে তার পড়াশোনার মধ্যেই বাধার সৃষ্টি করা। মন চায় বসে থাকি, মন চায় না বাধা হই। ধীরে ধীরে তাই উঠে দাঁড়াই।

একটা ছোট্ট ঘুম দিয়েই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হই। দুপুর ১২টা ছুঁয়েছে। মারকাযের রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ছাহেব কামরায় বসেছেন। আমার কাজ, জরুরি কয়েকটি কথা আর দেখা করে যাওয়া। ঢুকে পড়লাম কামরায়। আরেকটি আপন ভুবন আমার। ব্যক্তিগত, কাজগত, ভাবনাগত সব ডালি তার সামনে মেলে দিলেও হাসিমুখে উত্তর দিয়ে যান। সান্ত্বনা এবং সমাধান পেশ করেন। অসুস্থতার মধ্যেও স্নিগ্ধতার সঙ্গে সজীব এক কাজের মানুষ। তার কামরা থেকে বের হই। মিরপুর ফিরতে হবে।

স্নেহভাজন মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ ও নূরুল্লাহ পথের মোড় পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে আসে। রিকশা খুঁজে দেয়। আমার মাথায় তখনো ঘুরছে শান্ত একটি সকালের সবুজ।হজরতপুর মারকায আমার জন্য তো নতুন নয়। বারবার গিয়েছি, বারবারই হয়তো যাওয়া হবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু কোনো কোনো বেলার, কোনো কোনো সকালের রঙটা মনের মধ্যে আবির ছড়িয়ে দেয়। ১৮ মার্চের সকালটি তেমনই ছিল।

পূর্ববর্তি সংবাদনরওয়ের স্কুলে ছুরি হামলায় আহত ৪
পরবর্তি সংবাদকাজাখস্তানের প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের ঘোষণা