আবদুল করিম শাহেদ।।
শুক্রবার (২২ মার্চ) করাচি জুমার নামাজ পড়াতে যাওয়ার পথে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন বর্তমান পৃথিবীর বরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা তাকী উসমানী। তাকে হত্যার জন্য উপুর্যপরি তার গাড়িতে গুলি করা হয়। আল্লাহ তাআলার অসীম দয়া ও কুদরতি হেফাজতে তিনি রক্ষা পান। তার দৈহিক কোন ক্ষতি না হলেও অপর গাড়িতে থাকা তার দুজন সফরসঙ্গী ও দেহরক্ষী নিহত হন, শাহাদাত বরণ করেন। মুহূর্তের মধ্যেই এই হামলার খবর সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। দেশে দেশে সচেতন মুসলমানরা এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, কেন এই মহান ব্যক্তিত্বকে টার্গেট করা হলো? হত্যাকারীরা কেন তাকে হত্যা করার প্রাণপণ মিশনে নামল? পাকিস্তানে টার্গেট কিলিং- এর লক্ষ্যটা কী? আর এর গন্তব্য কোথায়?
পাকিস্তানে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা নতুন নয়। এমনকি, নতুন নয় টার্গেট কিলিংয়ে বরেণ্য আলেমদের হত্যা করার ঘটনাও। বহু রাজনীতিক এবং বিশিষ্ট নাগরিকও বিভিন্ন সময়ে টার্গেট কিলিং এর শিকার হয়েছেন। কয়েক মাস আগে নিজের বাড়িতে বিছানায় শায়িত বরেণ্য আলেম রাজনীতিক মাওলানা সামিউল হককে হত্যার ঘটনাটা এখনো তাজা।
এর আগে অরাজনৈতিক আলেমদের মধ্যে হত্যা করা হয় ড. হাবিবুল্লাহ মুখতার রহ., মুফতি নিজাম উদ্দিন শামযাঈ রহ., মুফতি ইউসুফ লুধয়ানবী রহ., মাওলানা আসলাম শেখুপুরী রহ., মাওলানা আবদুল মাজিদ দ্বীনপুরী রহ. – কে। এই আলেমরা ছিলেন একাডেমিশিয়ান, শিক্ষক ও পথনির্দেশক ব্যক্তিত্ব।
একেক সময় একেক জনকে গুলি করে, বোমা ফাটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত মাওলানা জিয়াউর রহমান ফারুকী রহ., মাওলানা হক নওয়াজ ঝাঙ্গভী রহ.- এর হত্যার ঘটনাও ছিল এমনই আক্রমণাত্মক ও টার্গেটমূলক। কিন্তু তাদের সবার ক্ষেত্রেই উগ্রপন্থী শিয়াদের পক্ষ থেকে আক্রমণ পরিচালনার কথা জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। ইসলামী আকীদার বিশুদ্ধতা তুলে ধরা ও শিয়া মতাদর্শের ঈমান বিধ্বংসী বিভিন্ন বিষয় তারা সবসময়ই জনসমক্ষে তুলে ধরতেন। এজন্য তাদের ক্ষেত্রে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় শিয়াদের নাম এসেছে সবার আগে।
এসব ঘটনার পর অবশ্য টার্গেট কিলিং – এর গতি বন্ধ হয়নি। পাকিস্তানে এ জাতীয় বিরোধ ও বিরোধপূর্ণ হত্যাকাণ্ডের জের সক্রিয়ই ছিল। হানাহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দুই দিকেই। কেউ কেউ মনে করেন, শিয়া-সুন্নি বিরোধকে টার্গেট কিলিংয়ের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং হত্যা- পাল্টা হত্যার চেইন সৃষ্টি করার পেছনে পাকিস্তানে তৎপর বিদেশি গোয়েন্দাদের হাতই ছিল মুখ্য।
অনিঃশেষ রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার এক গোলকধাঁধায় দেশটি যেন আটকে যায়-বিদেশি গোয়েন্দাদের নকশা না কি সে রকমই। তাই সেখানে আবেগ ও বিরোধের সঙ্গে দেশবিনাশী ও আলেম হন্তারক গোয়েন্দা তৎপরতা একাকার হয়ে মিশে গেছে। এভাবেই ঘটে গেছে অনেক হত্যাকাণ্ড। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোয়েন্দা, কিংবা গোয়েন্দাদের ভাড়াটে খুনি ধরাও পড়েছে। সেসব ঘটনা জনসমক্ষে প্রচারও হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আলতাফ হোসাইন- এর নাম। লন্ডন প্রবাসী এই ব্যক্তি পাকিস্তানে এমকিউএম (মুহাজির কওমী মুভমেন্ট) নামক দলটির প্রধান। অভিযোগ আছে, করাচিতে হত্যা-খুনের একটা অঘোষিত রাজ্য সে-ই চালাতো। তার দল থেকে চলে যাওয়া নেতাকর্মীরা পরবর্তী সময়ে জানায়, আলতাফ হোসাইন বিদেশী গোয়েন্দা স্বার্থ পূরণে সাধারণ হত্যা, বোমাবাজি ও টার্গেট কিলিংয়ের বাজার গরম করেছেন। আলতাফ হোসাইন এখন পলাতক জীবন যাপনে আছেন।
এরপর পাকিস্তানি ভূমি ব্যবহার করে আমেরিকা কর্তৃক আফগানিস্তানে হামলার পর থেকে পাকিস্তানে শুরু হয় আরেক রকম হামলা। আত্মঘাতী হামলা ও টার্গেট কিলিং নতুন আরেকটা রূপে চলতে থাকে। এতেও বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। গত কয়েক বছরে আত্মঘাতী হামলা ও টার্গেট কিলিং- এর সাথে জড়িত ভাড়াটে লোকজনের জবানবন্দিতেও বিদেশি গোয়েন্দাদের সংশ্লিষ্টতার খবর সামনে চলে আসে। সরকারি পর্যায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। হামলার মাত্রা কমে যায়। একরকম শান্ত একটি পরিবেশে হামলা চালানো হয় জগৎ – বিখ্যাত আলেম মুফতি মোহাম্মদ তাকি উসমানির উপর।
পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলেন, শায়খ তাকি উসমানির উপর হামলা কারা করেছে, কোন পক্ষ বা মহল এ হামলায় জড়িত- এটা হয়তো কিছুদিন পর প্রকাশ হবে অথবা কোনদিনই প্রকাশ হবে না। কিন্তু যে মহলই এ হামলা করুক, গোড়ায় খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে বিদেশি কোনো এজেন্সির হাত। গোটা পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন ধর্মীয় মহলের মাঝে অনিঃশেষ একটা অশান্তি সৃষ্টি করে দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য। পাকিস্তান নামের পুরো দেশটাকে আবার অশান্ত ও অস্থির হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাদের লক্ষ্য – তাদেরই এ হামলার পেছনে কলকাঠি নাড়ানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী।
জানা যায়, আল্লামা তাকী উসমানীর কাজের ভঙ্গিটা হচ্ছে দাওয়াতি। ইতিবাচক ভঙ্গিতে তিনি কথা বলেন। আক্রমণাত্মক ভাষায় কাজ করেন না তিনি। কোন চিন্তা বা দলের সঙ্গে তার হিংসার সম্পর্ক হওয়ার কথা নয়। কাদিয়ানী কিংবা শিয়া কিংবা বিদআতী সবার ব্যাপারেই তার উপস্থাপনা একাডেমিক। কারো ব্যাপারেই তিনি বাস্তব প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার লোক নন। বিরোধপূর্ণ বিষয়েও জোরালো কোনো অবস্থান তিনি কখনো গ্রহণ করেন না।
পাকিস্তানে জিহাদপন্থী সশস্ত্র গ্রুপের পক্ষে বা বিপক্ষে তার কোনো জোরালো অবস্থান নেই। এজন্য সশস্ত্র গ্রুপের পক্ষ থেকে তাকে আক্রমণের জন্য বেছে নেওয়ার কোনো কারণ ছিল না। তারপরও তাকে কেন টার্গেট করা হলো? আন্তর্জাতিক ইসলাম বিরোধী শক্তি সাধারনত এভাবে নিরস্ত্র কোন ব্যক্তিত্বকে টার্গেট করে না। তারা তাদের বড় মিশনের স্বার্থেই এ জাতীয় হত্যা থেকে দূরে থাকে। এরপরও সন্দেহ সম্ভাবনা থেকে তারাও মুক্ত নয়।
তবে তাকি উসমানী সাহেবের ব্যক্তিত্ব ও প্রতিনিধিত্ব এমন একটি বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত, যাকে এভাবে হত্যা করা হলে গোটা উপমহাদেশ এবং পুরো দুনিয়ায় তার জের ধরে অনেক হিংসাত্মক ঘটনার পথ খুলে যেতে পারে। এটাই হতে পারে হামলার মূল কলকাঠি নিয়ন্ত্রকদের লক্ষ। বিশেষত পাকিস্তানের রাষ্ট্রসত্তাকে বিদ্ধ করা এতে তাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়। এজন্যই কেউ কেউ বলেন, এ সূত্র অনুযায়ী পাকিস্তানের অন্য বড় বড় আলেমরাও এখন টার্গেট হতে পারেন- এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেবল দেশ ও সমাজকে অস্থির করে তোলাই এ জাতীয় হত্যা হামলার প্রধান লক্ষ্য। এর সঙ্গে পরস্পর রক্তক্ষয়ী বিরোধ চাঙ্গা হওয়া , বড় বড় মনীষীর হত্যার পথ খুলে দেওয়ার মতো আরো বহু টার্গেট তাদের পুরা হতে পারে।
দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট আলেমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মতভেদ ও বিরোধের জায়গাগুলো যেন টার্গেট কিলিং – এর মত পর্যায়ে না গড়ায় সে বিষয়ে বাংলাদেশসহ সব মুসলিম দেশেই সর্বোচ্চ সতর্কতা গ্রহণ করা উচিত। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এবং মহলগত ভাবেও। কারণ হিংসা ও রক্তপাতের পথ তৈরি হলে স্থায়ী অশান্তি ও হানাহানির বীজ বপনের কাজটা বিদেশি এজেন্সির জন্য সহজ হয়ে যায়। আবেগের সঙ্গে অস্ত্র ও অর্থ জড়িয়ে দিয়ে তখন তারা ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর কাজগুলো সেরে নিতে সক্ষম হয়। মতভিন্নতা ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে টার্গেট কিলিং কোন সমাধান নয়। বরং এটা একটা অনিঃশেষ পাল্টাপাল্টি ধারাবাহিকতার ধ্বংসাত্মক পথ তৈরি করে। আর এখান থেকে সুযোগ নিতে ওতঁ পেতে থাকে দেশ বিরোধী ও মুসলিম বিরোধী বিভিন্ন প্রকার শক্তি। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর এই সম্পদ- আল্লামা তাকী উসমানীকে হেফাজত করুন। তার মত অন্যান্য আলেম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বকে হেফাজত করুন। আর জাতির বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন মুসলিম দেশে অন্তঃবিরোধের জায়গাগুলোকে রক্তক্ষয়ী হানাহানির পর্যায়ে নেওয়ার জন্য শত্রুরা যে ষড়যন্ত্র করেছে তা ব্যর্থ করে দিন। শত্রু সংস্থার পাতা ফাঁদে কদম রাখা থেকে উম্মাহকে হেফাজত করুন। আমিন।
















