গোলান মালভূমি : ট্রাম্পের স্বীকৃতি ইসরাইলের উপকারে আসবে তো?

আবরার আবদুল্লাহ ।।

সিরিয়ার গোলান মালভূমির উপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে একটি অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল সোমবার হোয়াইট হাউজে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর উপস্থিতি এই অন্যায় স্বাক্ষর করেন তিনি। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অবৈধ স্বীকৃতির তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশ্ব নেতারা।

তারা বলেছেন, ট্রাম্পের এই স্বীকৃতি আক্ষরিক অর্থে কোনো অর্থ বহন না করলেও তা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে আরও বেশি হুমকির মুখে ফেলে দেবে। আগ্রাসী ইসরাইলকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে আরও বেশি উৎসাহিত করবে।

Image result for Golan Height

গোলান মালভূমি কখন কার ছিলো?
১৮০০ বর্গ কিলোমিটারে গোলান মালভূমি প্রাচীনকাল থেকেই সিরিয়ার শাসনাধীন। খ্রিস্টীয় ষোল শতকে উসমানীয় সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব থেকে ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে সিরিয়ার স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত গোলান সব সময় সিরিয়ার অংশ ছিলো। ১৯৬৭ সালের ৬ দিনব্যাপী আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল গোলান মালভূমির দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে নেয়। তবে ইসরাইলিদের দাবি খ্রিস্টপূর্ব সময়ে এখানে বাশান নামে একটি ইসরাইলি শহর ছিলো। যা তারা মিসর থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর যুদ্ধ করে জয় লাভ করেছিলো।

ঐতিহাসিক সেই শহরের নামেই ইসরাইল গোলান মালভূমির নাম পরিবর্তন করে বাশান রেখেছে। গোলান মালভূমি এলাকায় বর্তমানে ৪০ হাজার অধিবাসী বসবাস করেন। তাদের অর্ধেক আর অর্ধেক দখলদার ইসরাইলি।

১৯৬৭ সালে গোলান মালভূমি হাতছাড়া হওয়ার পর সিরিয়া একাধিকবার এই ভূমি উদ্ধারের চেষ্টা করেছে। তবে তারা সফল হয়নি। কখনো সেনা অভিযান চালিয়ে, কখনো আলোচনার মাধ্যমে। এর মধ্যে ‘অক্টোবর বা রমজান’ যুদ্ধ অন্যতম। ১৯৭৩ সালে মিসর ও সিরিয়া যৌথভাবে ইসরাইলের উপর হামলা করে। এই যুদ্ধে ইসরাইলের ৩ হাজার সেনার মৃত্যুসহ ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়।  কিন্তু গোলান মালভূমি বা মিসরের সিনাই উপত্যকা কোনোটাই উদ্ধার করা যায়নি। পরবর্তীতে ইসরাইলের সঙ্গে এক শান্তিচুক্তির অধীনে মিসর সিনাই উপত্যকা ফিরে পায়।

Image result for Golan Height

১৯৯৯-২০০০ সালে ইসরাইল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি শান্তিচূক্তি বিষয়ক আশা জাগিয়ে তুললেও তা শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। এই আলোচনার সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ইয়াহুদ বারাক বলেছিলেন, ইসরাইলের দখলে থাকা গোলান মালভূমির অধিকাংশ ভূমি তার দেশ ফিরিয়ে দিবে তবে বিনিময়ে গ্যালিলি সাগরের দাবি ছাড়তে হবে সিরিয়াকে এবং গোলান মালভূমির অবশিষ্ট অংশের উপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিতে হবে। সিরিয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলে ১৯৪৮ সালের সীমানায় বাইরে ইসরাইলের দখলকৃত কোনো ভূমি স্বীকৃতি দেবে না তারা। এরপর ১৯৮১ সালে পার্লামেন্টে আইন পাস করে গোলান মালভূমি অধিগ্রহণ করে ইসরাইল। তবে আন্তর্জাতিক মহল তা প্রত্যাখ্যান করে।

ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য গোলান মালভূমির গুরুত্ব
গোলান মালভূমি দখল করে রাখায় আন্তর্জাতিকভাবে ইসরাইল চরম সমালোচনার মুখে পড়লে এই ছাড়তে নারাজ ইসরাইল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তারা কোনোদিন গোলান ভূমি ছাড়বেন না। এর কারণ হলো, গোলানভূমির সামরিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

প্রাচীন বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী মিসর থেকে বিতাড়িত হয়ে এই ভূমিতে ইসরাইলিরা আশ্রয় নিয়েছিলো এবং এখানে তাদের নিজস্ব সভ্যতা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিলো। যার প্রমাণ পাওয়া যায়, গোলানের প্রাচীন কিছু স্থাপত্য থেকে।

Image result for Golan Height

গোলান মালভূমির নিয়ন্ত্রণ থাকায় ইসরাইল খুব সহজে সিরিয়া, লিবিয়া ও জর্ডানের উপর নজর রাখতে পারছে। এখান থেকে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক মাত্র ৬০ কিলোমিটার হওয়ায় ইসরাইল সিরিয়ার উপর সামরিক প্রভাবও বিস্তার করতে পারছে।

এছাড়াও ইসরাইলের পানির অন্যতম উৎস গোলান মালভূমি। দেশের মোট পানির এক তৃতীয়াংশ চাহিদা পূরণ করা হয় এখান থেকে। গোলানের ভূমি অত্যন্ত উর্বর হওয়ায় ইসরাইলের কৃষি পণ্যের বড় একটি অংশ উৎপাদিত হয় গোলানে। ২০১৫ সাল থেকে ইসরাইলে গোলানের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করেছে। ধারণা করা হয়, গোলান মালভূমিতে তেলের বড় একটি মজুদ রয়েছে। যা ইসরাইলের বহু বছরের জ্বালানি তেলের মেটাতে পারবে।

কেন এই স্বীকৃতি?
আরব রাজনীতিকরা মনে করছেন, ইসরাইলের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে পার করতেই এই স্বীকৃতি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুর্নীতিসহ নানা কারণে ইসরাইলে ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে। আদালত দুর্নীতির সাথে অভিযুক্ত থাকার অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতিও দিয়েছে। গোলান মালভূমির স্বীকৃতি এবং গাজায় হামাসকে দমনের অজুহাতে ব্যাপক হামলার মাধ্যমে ইসরাইলি ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন এই নেতা।

ধারণা করা হচ্ছে, জেরুজালেমকে আমেরিকা ইসরাইলের রাজধানী স্বীকৃতি দেওয়ার পর যেমন কিছু রাষ্ট্র তার অনুসরণ করেছে। হয়তো গোলান মালভূমির ক্ষেত্রেও একই রকম রাজনৈতিক লাভ হবে ইসরাইলের। আর সেটা হলে, ১৯৬৭ সালে গোলান ছেড়ে যাওয়া ১ লাখ ৫০ হাজার আরব মুসলিমদের নিজ মাতৃভূমিতে ফেরার পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ করা যাবে।

Image result for Golan Height

আসলেও কী কোনো লাভ হবে?
আক্ষরিক অর্থে গোলান মালভূমির উপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের এই স্বীকৃতি ইসরাইলের কোনো কাজে আসবে না। বরং ইসরাইলে আরও কোণঠাসা করবে বলেই ধারণা অনেকের। কারণ, আন্তর্জাতিক মহল কোনো ইসরাইলের দখলদারিত্বের স্বীকৃতি দেবে না বলে জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকা বিষয়ক রাশিয়ার বিশেষ দূত মিখাইল বোগদানভ বলেছেন, এই স্বীকৃতি কোনো পরিবর্তন আনবে না। এর পূর্ব ও পরের মধ্যে কোনো ব্যবধান তৈরি হবে না। বরং সমাধানের পথ বন্ধ করবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, তারা গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের বলে স্বীকৃতি দেবে না। তারা মনে করে এটা ইসরাইল অবৈধভাবে দখল করে আছে।

জাতিসংঘের মুখপাত্র বলেছেন, গোলানের ব্যাপারে জাতিসংঘের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না। নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকেই গোলানের সমাধান করতে হবে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা মনে করে গোলান ইসরাইলের দখলকৃত ভূমি। তারা কখনো গোলানে ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেবে না। নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনেরও কোনো সম্ভাবনা নেই।

এছাড়াও আরব লীগ ও গালফভূক্ত দেশগুলো ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে অবৈধ ও অন্যায় বলে মন্তব্য করেছে।

Image result for Golan Height

ট্রাম্পের স্বীকৃতি ইসরাইলকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না তো?
অনেকেই ধারণা করছে, ট্রাম্পের এই স্বীকৃতি আঞ্চলিক রাজনীতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। ট্রাম্প গোলান মালভূমির দখলদারিত্বের স্বীকৃতি দেওয়ায় ইসরাইলের অন্যান্য প্রতিবেশীকে আতঙ্কিত করে তুলবে। এই ক্ষেত্রে ইসরাইলের সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলোর যে সখ্যতা গড়ে উঠেছে তা হুমকির মুখে পড়বে।

আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলের দৃষ্টি সরানোর জন্য ফিলিস্তিনিরে স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোকে পূর্বের মতো সহযোগিতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাতে ইসরাইলের স্থিতিশীলতা আবারও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তাছাড়াও অবৈধ দখলদারিত্বতেকে বৈধতা দেওয়ার এই প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মহলকে ইসরাইল থেকে বিমুখ করতে পারে।

পূর্ববর্তি সংবাদনির্বাচনের আগে মুসলিম পরিবার উচ্ছেদ করা হচ্ছে আসামে
পরবর্তি সংবাদঅস্ট্রেলিয়ায় চাকরি প্রলোভন : ভানুয়াতুতে আটকা শতাধিক বাংলাদেশি