ধর্মবিশ্বাসের সংস্কারক না হয়ে আপনি বরং ভিসিই থাকুন!

ওয়ারিস রব্বানী ।।

তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। পত্রিকার কলাম, টেলিভিশন টকশো আর খবরের শিরোনামে তাকে বেশি পাওয়া যায়। একাডেমিক কাজে তার ব্যস্ততার খবর খুব একটা সামনে আসে না। তবে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, দাপটমান ছাত্রলীগের প্রতি আনুকূল্য আর উন্নয়ন কাজের নানা বিষয়ে মাঝে মাঝে তার খবর গণমাধ্যমে চলে আসে। সবকিছু সত্ত্বেও  তিনি বেশ লম্বা সময় ধরে ভিসির চেয়ারে আছেন। সবই তার ভাগ্য! নেকনজর থাকলে হয়তো এমনই হয়।

আজ মঙ্গলবার (২ এপ্রিল) আবার তাকে শিরোনাম হতে দেখলাম। একটি সেমিনারে বক্তব্য রেখে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিলেন। বলা যায়, ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে নতুন তত্ত্ব ও নীতির এক অভিনব ডংকাই বাজিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, ‘শুধু নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে অন্য ধর্মকে বাতিল মনে করার মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে।’ বলতেই হবে, দুঃসাহসী এক বক্তব্য তিনি দিয়ে ফেললেন। তার এ বাক্যটা তিনি কোন ধর্মের মানুষকে উদ্দেশ্ করে বলেছেন, সেটা খোলাসা করে না বললেও বোঝা যায়, বাংলাদেশে এই কথাটার অভিমুখ ও উদ্দিষ্ট আসলে কারা। দ্বিতীয় ব্যাপারটা হচ্ছে, পৃথিবীর কোন ধর্মের অনুসারীরা অপর ধর্মকে বাতিল মনে করে না? নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান না করলে আর অপর ধর্মকে বাতিল মনে না করলে একটি ধর্মের অনুসারী হয় কেন মানুষ? হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, শিখ –কেউ কি ভিন্ন ধর্মকে মন থেকে সঠিক ধর্ম মনে করে? ভিন্ন ধর্মকে সঠিক মনে করলে সে তার ধর্মে কেন আছে?

বাংলাদেশের মতো দেশে ভিসি সাহেবের এই কথার প্রধান শ্রোতা ও উদ্দিষ্ট হলো এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠি। অন্য ধর্ম সম্পর্কে ইসলামের নীতি-আদর্শের কোনো কিছু জেনে কি তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন? বলা বেশ মুশকিল। অথচ সুরা আলে ইমরানের ১৯ নম্বর আয়াতে পরিস্কার এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে দ্বীন হচ্ছে একমাত্র ইসলাম।’ সুরা আলে ইমরানের ৮৫ নম্বর আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ধর্ম হিসেবে ইসলাম ছাড়া অন্যকিছু সন্ধান করবে সেটা গ্রহণ করা হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত।’ পবিত্র কুরআনের এই দুটি ভাষ্য থেকেই নিজ ধর্মবিশ্বাস ও অপর ধর্মের প্রতি ইসলামের  দৃষ্টিভঙ্গির কংক্রিট নীতি সাব্যস্ত হয়ে আছে। যুগে যুগে কোনো মুসলিম তাত্ত্বিকই কুরআনের এই স্পষ্ট নির্দেশনার ভিন্নতাপূর্ণ কোনো ব্যাখ্যা দেননি। অথচ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলছেন, ‘নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা আর অন্য ধর্মকে বাতিল মনে করার মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে’।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে তিনি কি নতুন কোনো দুঃসাহসী নীতি দাঁড় করাতে চাচ্ছেন? তিনি কি সচেতনভাবেই এই বক্তব্যটা দিয়েছেন? তিনি কি কথার তালে তালে এমন সাংঘাতিক ‘উদ্ভাবনী’ একটি নসিহত জাতিকে উপহার দিয়েছেন? ভিসি সাহেব কিন্তু শুধু এতোটুকু কথাই বলেননি, তিনি আরো বলেছেন, কতিপয় উগ্র ধর্মান্ধ ব্যক্তির কার্যক্রম মূলত ধর্মের অবমাননা স্বরূপ। এগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না।’

সমাজে সরল ও নির্বোধ প্রকৃতির কিছু লোক আছেন, যারা ইসলাম সম্পর্কে কথা বলেন, কিন্তু বলে যাওয়া কথার মূল বিষয়টির শিরোনাম পর্যায়ের ধারণাটাও রাখেন না। তারা মনে করেন, ইসলামকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং অন্য ধর্মকে বাতিল ধর্ম মনে করলে তো ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় উদারতার কিছুই বাকি থাকে না! ধর্মীয় সংকীর্ণতার ক্ষেত্রটা আরো জটিল হয়ে ওঠে। অথচ বাস্তবতাটা ঠিক এরকম নয়। বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এমন বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। বরং ইসলামের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও উদারতার ধারণাটি অন্যের প্রতি আচরণ ও অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মানের সঙ্গে ‍যুক্ত। মুসলিমের কাছে ইসলাম শুধু শ্রেষ্ঠ ধর্ম নয়, একমাত্র সত্যধর্ম। অন্য ধর্ম অবশ্যই বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু ওই বাতিল ধর্মের অনুসারীদের তাদের ধর্মপালনের সুযোগ দান, তাদের ধর্মপালনের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদান, তাদের নিরাপত্তা দান এবং তাদের সঙ্গে মানবিক সৌজন্যপূর্ণ আচরণ ইত্যাদি বজায় রাখতে হবে। এটাই ইসলামের বিধান। এ বিধান নীতিগত ও আচরণগতভাবে ইসলাম সমুন্নত রেখেছে এবং রাখার নির্দেশনা দেয়। ভিন্ন ধর্মকে সঠিক মনে করতে হবে –এমন কোনো ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বিশ্বাসের সুযোগ ইসলামে নেই। কোনোকালে কোনো জনপদে এমন বিশ্বাস ছিলও না।

আলোচিত ভিসি সাহেব কি সেই রকম সরলদের একজন কি না- আমাদের জানা নেই। তবে তার নসিহতের খোলাসা বের করলে তাকে ইসলাম-জানা কোনো পণ্ডিত মনে করার অবকাশ নেই। আর তিনি যদি ইসলাম না-ই জানেন তবে এত বড় বাঁক বদল করা কথা বলতে যান কেন? একজন মানুষের পাণ্ডিত্য কি সব জায়গায় থাকতেই হবে? এটা কি জরুরি? না কি তিনি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের সুনজর কাড়ার জন্যই জমিন তৈরি করছেন?

একবার এই ভিসি সাহেব ইসলামি ব্যাংকগুলোতে প্রচলিত পরিভাষা (মুদারাবা/মুরাবাহা/বাইয়ে মুয়াজ্জাল) বদলে ব্যাংকের প্রচলিত হিসাবের নাম ব্যবহারের জন্য টিভি টকশোতে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন। ব্যাংকের বিভিন্ন প্রোডাক্টের নাম কেন আরবিতে থাকবে –এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশও করেছিলেন। অবশ্য তখনও তিনি কথার তালে তালে বলেছিলেন, তিনি বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন না। সেই ভিডিও এখনো ইউটিউবে আছে। দেখা যাচ্ছে, ইসলামি বিষয় ও শব্দ সম্পর্কে জ্ঞান যে রাখেন না এটা তিনি নিজেই স্বীকার করছেন। আবার সংস্কারকের মতো মতামত উগড়েও দিচ্ছেন। তার বাক্য ‘অন্য ধর্মকে বাতিল মনে করার মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে।’ কত জোরালো, কত দিকনির্দেশক, কত সবজান্তা নসিহত! থমকেই যেতে হয় শব্দ-বাক্যের ব্যবহার দেখলে।

আমরা তাকে ‘বিনয়ের সাথে’ থামতে বলতে পারি। বলতে পারি, ধর্মবিশ্বাস নিয়ে সংস্কারক না হয়ে আপনি বরং ভিসিই থাকুন। এজন্য প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অন্য কোনোভাবে নজর কাড়ুন। ইসলাম ও কুরআনের নির্দেশনার বিরুদ্ধে সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে কথা বলার দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হয়নি। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্বে তো এটা পড়ে না।

পূর্ববর্তি সংবাদএবার ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নুরুদের
পরবর্তি সংবাদনাটোরে প্রতিবেশির লাঠির আঘাতে যুবক নিহত