এক মিজানের সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে, পুলিশে আছে আরও মিজান

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগে গতকাল ডিআইজি মিজানের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে ও  ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।  প্রায় আড়াই বছর ধরে পুলিশ বিভাগ ও দুদকে তার নানা কর্মকাণ্ডের তদন্ত ও অনুসন্ধান হয়েছে। এসব তদন্ত-অনুসন্ধানে দেশ-বিদেশে মিজানের বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হয়েও তিনি নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করেছেন–এমন অভিযোগেরও প্রমাণ মিলেছে।

তবে পুলিশে এরকম মিজান শুধু একজনই নন। নানা অপরাধ করে সমালোচিত হয়েছেন এসপি সুভাষ চন্দ্র সাহা,এসপি মিজানুর রহমান,পুলিশ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম,পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শেখ হিমায়েত হোসেন মিয়া প্রমুখ।খোঁজ নিলে মিলবে এমন আরও অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সন্ধান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ জমা দেওয়া, মাদক ব্যবসা, জেল-মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, জমি দখলে ভূমিকা রাখা, চাঁদাবাজি, নকল পণ্যের ব্যবসা ও কারখানা পরিচালনা, পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যবসা পরিচালনাসহ নানা অভিযোগ আছে  পুলিশের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। আবার,দুর্নীতি দমন যার কাজ সেই সংস্থা ‘দুদক’-এর বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগের তদন্তে নেমে দায়সারা প্রতিবেদন জমা দিয়ে তাদের বাঁচানোর অভিযোগও রয়েছে। এমন একটি ঘটনায় দুদক থেকে অভিযোগ অনুসন্ধানের পর দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়মুক্তিও দেওয়া

সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে নানা পর্যায়ের বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার অপরাধের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

 এসপি সুভাষ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ: ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর ফরিদপুরের সাবেক এসপি সুভাষ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী রিনা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক আবদুল ওয়াদুদ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও তিনি। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে আয় করা সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যাংকে জমা রাখার অভিযোগ করা হয়। দুদকের তথ্য বলছে,ওয়ান ব্যাংকের তিনটি শাখায় ১৯টি এফডিআরে দুর্নীতির টাকা জমা রেখেছেন সুভাষ ও তার স্ত্রী। কিন্তু তাদের আয়কর বিবরণীতে এই তথ্য গোপন রেখেছিলেন। ২০১৩ সালের ২৬ মে থেকে ২০১৭ সালের ২২ মে পর্যন্ত খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, পুলিশ বিভাগে চাকরির সূত্রে দুর্নীতি করে আয় করা টাকা স্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে ওয়ান ব্যাংকে ১৯টি এফডিআরে জমা রেখেছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। ওয়ান ব্যাংকের ঢাকার বংশাল শাখায় ৬টি, এলিফ্যান্ট রোড শাখায় ১টি ও যশোর শাখায় ১২টি এফডিআরে ৮ কোটি ৩৬ লাখ ১৩ হাজার ৩৬৭ টাকা জমা রাখা হয়। বর্তমানে সুদে-আসলে তা আরও বেড়েছে।

এসপি মিজান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ: গত বছরের ৫ জুন সাড়ে তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) কমান্ড্যান্ট (পুলিশ সুপার পদমর্যাদার) মিজানুর রহমান ও তার স্ত্রী সালমা আক্তার নীপার বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি মামলা করে দুদক। রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলা দু’টি করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, এসপি মিজান ও তার স্ত্রীর নামে ৩ কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার ৯৯৮ টাকার অবৈধ সম্পদ রয়েছে। এরমধ্যে মিজানের নামে ১ কোটি ১৭ লাখ ৬১ হাজার ১৮২ টাকার ও তার স্ত্রীর নামে ২ কোটি ৩২ লাখ ৫৯ হাজার ৮১৬ টাকার অবৈধ সম্পদ আছে। এজাহারের তথ্য অনুযায়ী নীপার অবৈধ সম্পদের পরিমাণ স্বামীর অবৈধ সম্পদের দ্বিগুণ। এসপি মিজানের বিরুদ্ধে অবৈধ আয়ের টাকায় সাভারের হেমায়েতপুরে ৮৪ শতাংশ জমিতে ও রাজধানীর মিরপুরের মাজার রোডে বাড়ি নির্মাণ এবং নির্মাণকাজে এসআইসহ বিভিন্ন পদের ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে  শ্রমিক হিসেবে কাজ করানোর অভিযোগ ওঠে ২০১৬ সালে। ওই বছরের ২৫ আগস্ট এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়। নকল সারের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকারও অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সূত্র ধরেই গত বছর অনুসন্ধান চালায় দুদক। অনুসন্ধান শেষে মামলার সুপারিশ করে দুদক। মামলা হয় মিজান ও তার স্ত্রীর নামে।

মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ দাখিল করে সুবিধা নেন সিআইডি’র সাবেক প্রধান শেখ হিমায়েত: মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করে দাখিল করা সাময়িক সনদ ভুয়া প্রমাণ হওয়ায় গত ৮ মে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শেখ হিমায়েত হোসেন মিয়াকে অবসরে পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মিথ্যা তথ্য দিয়ে সম্মানী ভাতা নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল শেখ হিমায়েতকে সিআইডি থেকে পুলিশ অধিদফতরে বদলি করা হয়। ২০০৯ সালের ১০ জুন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সাময়িক সনদ পান তিনি। সনদে তার ঠিকানা ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার কাশিয়ানি গ্রাম।

শেখ হিমায়েত বিসিএস ক্যাডারে ১৯৮৪ সালের ১ জুলাইয়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী পুলিশে যোগ দেন। জন্ম তারিখ অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর তার বয়স ছিল ১১ বছর ৬ মাস ২৬ দিন। শিক্ষা সনদ, পূরণ করা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা অংশ নেওয়ার আবেদনপত্র, সরকারি কর্ম কমিশনের গেজেটে তার নাম শেখ হিমায়েত হোসেন মিয়া। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সাময়িক সনদে নামের শেষে মিয়া উল্লেখ নেই।

পুলিশ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে দায়মুক্তি দেয় দুদক: এসপি মিজানের মতো ২০১৫ সালে আরেক পুলিশ কর্মকর্তাও দুদক থেকে দায়মুক্তি পেয়েছিলেন। ওই বছরের ১৫ জুন দায়মুক্তির বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে চিঠি দিয়ে জানায় দুদক।

তবে দায়মুক্তির এক বছরের মধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত হয়েছিলেন মিজান। আর তিন বছরের মধ্যেই মিজান ও তার স্ত্রী দুদকের মামলায় আসামিও হন। তবে দায়মুক্তি পাওয়া পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ডিআইজি (প্রোটেকশন) রফিকুল ইসলাম আর নতুন করে আলোচনায় আসেননি। রফিকুলের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে ২০১৪ সালে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। সে সময় দুদকের কাছে তথ্য ছিল চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া বাজারে সরকারি খাস জমিতে টিনশেড বাড়ি আর কিছুই ছিল রফিকুলের। ১৯৮৬ সালে পুলিশে যোগ দেন তিনি। শুধু রফিকুল নয়, তার স্ত্রী শিরীন আক্তারও বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দুদকের অভিযোগ থেকে জানা যায় সে সময়। রফিকুল ইসলাম এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যার বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পরও প্রমাণ করা যায়নি। বারবার গণমাধ্যমে আলোচিত হওয়ার কারণেই কি দায়মুক্তি দিয়েও এসপি মিজানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে দুদককে? এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আগ্রহ দেখাননি কোনও দুদক কর্মকর্তা।

পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ খোদ সংসদ সদস্যের: চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়ার পর সুনামগঞ্জের নৌপথগুলো থেকে নৌ-পুলিশ প্রত্যাহারের দাবি জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে এক মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানান তিনি।

মাদক ব্যবসায় পুলিশ: মাদক ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসূত্রের অভিযোগে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপ-পরিদর্শক কৃপা সিন্ধুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি।

 

পূর্ববর্তি সংবাদভারতের হিমাচল প্রদেশে বাস দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৪, আহত ৩৫
পরবর্তি সংবাদসদরঘাটে লঞ্চের ঢেউয়ে নৌকা ডুবে ৫ জনের মৃত্যু, ২ শিশু নিখোঁজ