আবদুল্লাহ আল ফারুক ।।
বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ‘নয়ন’ নামের এক তরুণ খুনীর নাম এখন সবাই জানে।
এই নয়নের নামের সঙ্গে ‘বন্ড’ শব্দ আছে। কেউ কেউ ভুল করে ‘ভন্ড’ পড়ে থাকে। কিন্তু মূলত সে তার নাম লিখত ‘নয়ন বন্ড’। এ নামেই তার ফেসবুক আইডি।
প্রশ্ন হলো, ‘বন্ড’ তো তার পারিবারিক নাম নয়। মূল নাম হলো, সাব্বির আহমেদ নয়ন। এত সুন্দর পারিবারিক নাম বদলে এমন অদ্ভূৎ নাম কেন সে নিজের সঙ্গে যুক্ত করলো?
এর উত্তর শুনলে আপনি হয়তো চমকে ওঠবেন। নয়ন নামের এ ছেলেটি ছিল হলিউডের মারদাঙা ছবির দুশ্চরিত্র, স্বার্থপর ও ধর্ষক চরিত্রের অভিনেতা জেমস বন্ডের ভক্ত। জেমস বন্ডের ০০৭ ছবি দেখে, প্রভাবিত হয়ে, খুনী নয়ন নিজের নামের সঙ্গে বন্ড শব্দটি যুক্ত করে।
[সূত্র : কালের কণ্ঠ। ২৯ জুন তারিখের প্রতিবেদন।]
…
শুধু এতটুকুই নয়; এই নয়ন বন্ডের জিরো জিরো সেভেন (০০৭) নামে একটি গোপন বাহিনীর তথ্য পাওয়া গেছে। তারা সামাজিক ফেসবুকের সিক্রেট গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন অপকর্মের বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করত, বলে জানা গেছে।
[সূত্র : নয়া দিগন্ত। ২৯ জুন তারিখের রিপোট।]
….
প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাতের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর অনেক কিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। মিন্নির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে। আমাদের নতুন প্রজন্মের মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। খুনীদের পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়ার আস্কারা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে না, নতুন প্রজন্মের ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, আকাশ সংস্কৃতির ভয়াল থাবা ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নৈতিক শিক্ষার বাধ্যবাধকতার কথা।
…
আপনি হয়তো লক্ষ্য করবেন, বর্তমান প্রজন্মের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের মাঝে মারামারি, গ্রুপিং ও মহল্লাকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তারের মতো মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে এমন অপরাধের কথা কেউ কল্পনাও করত না। কিন্তু সেই অকল্পনীয় অপরাধগুলো এখন চোখের সামনে দিব্য-বাস্তব ঘটনা।
আমরা কি কখনো এই অপরাধের উৎসগুলো খতিয়ে দেখেছি?
১.
আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগেও মহল্লার ছেলে-মেয়েরা ফজর নামাযের পর মসজিদে এসে ফোরকানিয়া মক্তবে দ্বীনের বুনিয়াদি শিক্ষা পেত। খুব বেশি না হোক, অন্তত আমপারা-কায়দা শিখতো। অযু-গোসল-পবিত্রতা শিখতো। বড়দের সম্মান করা, সালাম দেওয়া ও ছোটদের আদর-স্নেহ করার শিক্ষা পেত।
এরপর তারা স্কুলে চলে যেত।
কিন্তু কিন্ডারগার্টেন এসে ধর্মীয় শিক্ষার সেই সোনালি শেকড়টাকে সমূলে উপড়ে ফেলেছে। বিষয়টির ভয়াবহতা আমরা কোনো দিন খতিয়ে দেখার চেষ্টা করিনি।
২.
বর্তমান পৃথিবীতে নেট অত্যন্ত সহজলভ্য। আমাদের সমাজের সিংহভাগ বাবা-মার মানসিকতা এমন হয়ে গেছে যে, তাদের চোখে স্রেফ পর্ন ছবিই খারাপ। এর বাইরে হলিউড-বলিউড-ঢালিউডের ছবি খারাপ নয়।
তারা মুভি দেখাকে খারাপ মনে করে না।
অথচ হলিউড ও চায়নার মারদাঙা ছবিগুলো দেখে আমাদের সন্তানগুলো যে আগ্রাসী, আক্রমণাত্মক, হিংস মানসিকতার বখাটে তরুণ হয়ে বেড়ে উঠছে, তার ব্যাপারে আমরা মোটেও সচেতন নই।
বলিউডের ছবিগুলোর কারণে বিয়েপূর্ব প্রেম, যৌনতা ও ইভটিজিং যে বর্তমান প্রজন্মের কাছে ডালভাতে পরিণতি হচ্ছে, সে ব্যাপারে আমরা সীমাহীন নির্বিকার।
….
সর্বশেষ প্রশ্ন, কোনো জঙ্গি যদি ড. জাকির নায়েকের ভক্ত হওয়ার কারণে ড. জাকির নায়েক অপরাধী হতে পারেন, তাহলে এ সমাজের শত শত তরুণকে ‘খুনী নয়ন বন্ড’-এ পরিণতি করার কারণে জেমস বন্ডরা কেন অপরাধী হবে না?
জেমস বন্ড যদি আমাদের রাষ্ট্রের ধরাছোঁয়ার বাইরের লোক হয়ে থাকে তাহলে যারা এমন অপসংস্কৃতি আমদানি করছে, তারা কেন অপরাধী হবে না?
















