ওলিউর রহমান ।।
ধর্ষণ। শ্লীলতাহানী। বর্তমান সমাজের একটি মারাত্মক ব্যাধি। নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে বর্তমানে ধর্ষণ একটি মানবিক সংকট রূপে দেখা দিয়েছে। একজন নারী এখন ঘরে-বাইরে কোথাও নিজের জীবনকে নিরাপদ ভাবতে পারে না। কর্মস্থল, পরিবহন, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই ঘটছে ধর্ষণের মত বর্বর ঘটনা। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় গত ছয়মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাড়ে ছয়শোর উপরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
প্রযুক্তির কল্যাণে সমাজে অশ্লীলতার বিভিন্ন মাধ্যম সহজলভ্য হয়ে ওঠায় নৈতিকতার বাঁধগুলো এখন ভেঙ্গে যাচ্ছে। সচিব, উপ-সচিব, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, জেলা-প্রশাসকের মতো সম্মানজনক পদাধীকারীদের বিরুদ্ধেও উঠছে বিভিন্ন উপায়ে ধর্ষণের অভিযোগ। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেকেও ধর্ষণের অভিযোগে আটক হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে খবরের কাগজে।
সম্প্রতি নারায়ানগঞ্জের এক ক্যাডেট মাদরাসার প্রধান, নেত্রকোণায় এক মহিলা মাদরাসার শিক্ষককে ধর্ষণের দায়ে আটক করা হয়েছে। এছাড়াও গত কিছুদিনে সংবাদমাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত কয়েকজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠেছে।
এসব দুঃখজনক সংবাদে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। তারা তাদের আস্থার শেষ জায়গাটুকুও হারাচ্ছে যেন। এসব লজ্জাজনক ঘটনা মাদরাসার ঐতিহ্য নষ্ট করছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাহাত্ম ক্ষুণ্ন করছে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এসব দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে কথা বলা হয় মারকাযুদ্দা’ওয়া আল ইসলামিয়ার উস্তায মাওলানা যাকারিয়া আবদুল্লাহ ও জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার মুহাদ্দিস মাওলানা তাহমিদুল মাওলার সঙ্গে।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে মাওলানা যাকারিয়া আবদুল্লাহ বলেন, প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার এখন নীতি নৈতিকতার অবক্ষয় সৃষ্টি করেছে। পারিপার্শিক অশ্লীলতা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও কিছু প্রভাব ফেলে। তবে এসব দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় কাররণ হলো পর্দাহীনতা, দ্বীন সম্পর্কে উদাসিনতা।
এর সাথে যোগ করে এ প্রসঙ্গে মাওলানা তাহমিদুল মাওলা বলেন, নিয়ন্ত্রণহীন ধর্মীয় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ । একটা প্রতিষ্ঠান করতে হলে বিশেষত মহিলা মাদরাসা শুধু আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারাই যথেষ্ট না। প্রতিষ্ঠানের পেছনে কোনো দায়বদ্ধতা না থাকলে, কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলে অপকর্ম ঘটে থাকে। সবজায়গায়ই কিছু মন্দ মানুষ থাকেই। তারা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির সুযোগ নিয়ে এসব পাপাচারে লিপ্ত হয়।
মাওলানা তাহমিদুল মাওলা আরও বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর্যায় শেষ করেই দেখা যায় অনেকে এখন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। অথচ বুযুর্গদের সোহবতে নিজের আমাল বিশুদ্ধ করে তাদের থেকে চারত্রিক সনদ নিয়ে উস্তাযদের নেগরানি ও মুরুব্বীর পরামর্শে মাদরাসা করা ও তা পরিচালনা করা উচিত।
প্রতিকার প্রসঙ্গে জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার এ মুহাদ্দিস বলেন, পর্দার বিধান শুধু হাত-মুখ ঢেকে রাখার নাম নয়। শরিয়তে পর্দার যে মাকসাদ তা লক্ষ্য রেখে সকলকে চলতে হবে। মাদরাসাগুলোর উপর দায়বদ্ধতা ও উলামায়ে কেরামের নিবিড় পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষত মহিলা মাদরাসায় যদি শরিয়তের মানশা পূরণ করে পড়ানোর জন্য পুরুষ শিক্ষকের প্রয়োজন হয় তাহলে বয়স ও চারিত্রিক স্বচ্ছতার বিষয়টি বিবেচনা করেই শিক্ষক নিয়োগ করা উচিত।
মাওলানা যাকারিয়া আবদুল্লাহ বলেন, কোনো অপকর্মকে তো সমর্থন করা যাবে না। তবে যেকোনো অনাচারের ক্ষেত্রেই তদন্ত করে সত্যতার ব্যাপারটি নিশ্চিত হতে হবে। আর ব্যক্তির অপরাধকে সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের দিকে সম্পৃক্ত করার যে প্রবণতা বাংলাদেশে চলমান তা থেকে আমাদের সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্কুল বা এ জাতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের একজন কোনো অপরাধ করলে পুরো প্রতিষ্ঠানের কাঁধে সে অপরাধের দায় চাপিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায় তেমনি ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত কোনো ব্যক্তি থেকে অশ্লীল কিছু প্রকাশ হয়ে গেলে সমগ্র জাতির দিকে তা সম্পৃক্ত করে দেওয়াও অপরাধ।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এ জাতীয় অবক্ষয় প্রতিরোধে কী করণীয় জানতে চাইলে মারকাযুদ্দাওয়ার এ উস্তায বলেন, প্রথমত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী সে যেই হোক তার পরিচয় সে অপরাধী।
দ্বিতীয়ত, দেশের বিদ্যমান বোর্ডগুলোর উচিত সে বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মাদরাসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। বোর্ড কর্তৃপক্ষের উচিত, কারো দ্বারা অন্যায় প্রকাশ হলে সাধ্যানুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষার্থে কঠিন সিদ্ধান্তই নেওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, দেশের শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বীদের মহিলা মাদরাসার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারী প্রয়োজন। ব্যবস্থাপনাগত কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ থাকলেও আবাসিক কোনো কাজকর্ম ও পাঠদানে যেন পুরুষের কোনো অংশগ্রহণ না থাকে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
উল্লেখ্য, সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকহারে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মাদরাসার কথা বলা হলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব ঘটনার অস্তিত্ব খুবই কম। দুয়েকটা যা প্রকাশ পাচ্ছে তা ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ মহিলা মাদরাসাগুলোতে দেখা যাচ্ছে। তবে সংখ্যা ও পরিমাণ বিবেচ্য নয়। ধর্মীয় অঙ্গনে সংগঠিত অনৈতিক যে কোনো ঘটনায় লজ্জা, শঙ্কা ও সতর্কতার বার্তা দেয়।
















