সাইয়েদ মুফতি মুহাম্মদ আদনান কাকাখাইল ।।
খলীফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিক একবার হজ্ব করার জন্য মক্কা শরীফ আসেন। কাবা শরীফ তওয়াফ করার পর তিনি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে যাবেন। কিন্তু মানুষের এত ভিড় ছিল যে তিনি কোনমতেই হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত যেতে পারলেন না। অপারগ হয়ে তিনি মাতাফের এক কিনারে দাঁড়িয়ে ভিড় কমার অপেক্ষা করতে লাগলেন।
এমন সময় সেখানে তাশরীফ নিয়ে গেলেন হযরত যায়নুল আবেদীন রহ.। তাকে আসতে দেখেই সবাই তার জন্যে রাস্তা ছেড়ে দিলেন। তিনি তওয়াফ শেষ করে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত সেখানে ছিলেন কেউ নিজের জায়গা থেকে একটু নড়াচড়া করল না। বরং সকলেই মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
খলীফা হিশামের সাথে সিরিয়া থেকে যারা এসেছিলেন তারা হিশামকে জিজ্ঞাসা করলেন: কে এই যুবক? আপনি আমিরুল মোমেনীন, তারপরও লোকেরা আপনার কোন পরওয়া করল না। আর তাকে এত সম্মান করে জায়গা ছেড়ে দিল!
খলীফা হিশাম প্রথম থেকেই ঘটনাটি দেখছিলেন, আর রাগে ফুঁসছিলেন। তার নিকট এই মহান ব্যক্তির পরিচয় জিজ্ঞাসা করায় তার শাহী মর্যাদায় আঘাত লাগলো। তিনি ঈর্ষান্বিত হয়ে জবাব দিলেন: আমি তাকে চিনি না।
সেখানে ছিলেন বিখ্যাত কবি ফারাজদাক। খলীফা হিশামের জবাব শুনে তার ঈমানী মর্যাদাবোধ জেগে উঠল। তিনি বললেন: আপনি তার পরিচয় জানেন না? আমি তার পরিচয় জানি। আমার নিকট তার পরিচয় শুনুন। এই বলে তিনি হযরত যয়নুল আবেদীন রহ. এর প্রশংসায় এমন একটি কবিতা মুখে মুখে রচনা করে শুনালেন যা আরবী সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।
ফারাজদাক বললেন,
هَذَا الَّذِىْ تَعْرِفُ الْبَطْحَاءُ وَطْأَتَهُ – وَ الْبَيْتُ يَعْرِفُهُ وَ الْحِلُّ وَ الْحَرَمُ
তিনি এমন ব্যক্তি যার পদচিহ্ন বাতহা উপত্যকা চিনে। যাকে এই বাইতুল্লাহ, হারাম এবং হারাম এলাকার বাইরের লোকেরাও চিনে।
هَذَا ابْنُ خَيْرِ عِبَادِ اللَّهِ كُلِّهِمُ – هَذَا التَّقِيُّ النَّقِيُّ الطَّاهِرُ الْعَلَمُ
তিনি আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট বান্দার সম্মানিত সন্তান। তিনি সকলের চেয়ে পরহেজগার, সকলের চেয়ে পবিত্র চরিত্রের অধিকারী এবং সকলের চেয়ে সঠিক ও সৎ।
هَذَا ابْنُ فَاطِمَةٍ (عليها السلام) ، إِنْ كُنْتَ جَاهِلَهُ – بِجَدِّهِ أَنْبِيَاءُ اللَّهِ قَدْ خُتِمُوْا
আপনি যদি তাকে না চিনেন, তবে শুনুন, তিনি হযরত ফাতেমাতুয যাহরা রা. এর সম্মানিত সন্তান, তার নানাজানের দ্বারাই নবুয়তের ধারা শেষ হয়েছে।
وَلَيْسَ قَوْلُكَ “مَنْ هَذَا” بِضَائِرِهِ – العُرْبُ تَعْرِفُ مَنْ أَنْكَرْتَ وَ الْعَجَمُ
সুতরাং আপনার এই কথা ‘ইনি কে’ তার মর্যাদা কমাতে পারে না । কারণ আপনি যাকে চিনেন না বলেছেন, তাকে সমগ্র আরব-আজম চিনে।
كِلْتَا يَدَيْهِ غِيَاثٌ عَمَّ نَفْعُهُمَا – يَسْتَوْكِفَانِ، وَلَا يَعْرُوْهُمَا عَدَمُ
তিনি দুহাত খুলে দান করেন, গরীব দুখীদের দান করে তার হাত কখনো ক্লান্ত হয় না।
سَهْلُ الْخَلِيْقَةِ، لاَ تُخْشَى بَوَادِرُهُ – يَزِيْنُهُ اثْنَانِ: حُسْنُ الْخُلْقِ وَ الشِّيَمُ
তার স্বভাব নম্র, তার নিকট থেকে রুক্ষ্ম আচরণের কল্পনাই করা যায় না। তাকে দুইটি গুণ সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে: সুন্দর চরিত্র ও উত্তম স্বভাব।
مَا قَالَ لاَ قَطٌّ إِلَّا فِىْ تَشَهُّدِهِ – لَوْلَا التَّشَهُّدُ كَانَتْ لاَءَهُ نَعَمُ
তিনি তাশাহ্হুদে ‘লা’ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু) ব্যতীত কখনো ‘লা’ শব্দ বলেন না। যদি তাশাহহুদে ‘লা’ না থাকত, তবে তার সব ‘লা’ ‘নাআম’ হয়ে যেত।
عَمَّ الْبَرِيَّةَ بِا لْإِحْسَانِ فَانْقَشَعَتْ – عَنْهَا الغَيَاهِبُ وَ الْإِمْلَاقُ وَالْعَدَمُ
তার অনুগ্রহ সর্বসাধারণের মধ্যে পরিব্যপ্ত হয়ে আছে, তাই তার থেকে সকল অন্ধকার, অভাব-অনটন ও দরিদ্রতা বিদূরিত হয়ে গেছে।
إِذَا رَأَتْهُ قُرَيْشٌ قَالَ قَائِلُهَا – إِلَى مَكَارِمِ هَذَا يَنْتَهِى الْكَرَمُ
কোরাইশরা যখন তাকে দেখেন, তারা বলেন : দান-খয়রাতের মহান গুণটি তার কাছে এসে সমাপ্ত হয়ে গেছে।
يُغْضِي حَيَاءً وَ يُغْضَى مِنْ مَهَابَتِهِ – فَمَا يُكَلَّمُ إِلَّا حِيْنَ يَبْتَسِمُ
তিনি লজ্জাবশত: সর্বদা মাথা নিচু করে রাখেন, আর তার মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করে অন্যরা তার সামনে মাথা নত করে থাকে। তিনি যখন হাসি মুখে থাকেন তখনই শুধু তার সামনে কেউ কথা বলতে সাহস পায়।
اللَهُ شَرَّفَهُ قِدماً وَعَظَّمَهُ – جَرى بِذاكَ لَهُ في لَوحِهِ القَلَم
আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির সূচনা থেকেই তাকে সম্মানিত করেছেন। তার দয়া ও অনুগ্রহের কথা লাওহে মাহফূজে লিখে রেখেছেন।
কবি ফারাজদাক খলীফা হিশামের সামনে তার আরও অনেক প্রশংসা করলেন।
ফারাজদাকের মুখে বনী হাশিম গোত্রের লোকের প্রশংসা শুনে খলীফা হিশামের শরীরে যেন আগুন ধরে গেলো। হিশাম সাথে সাথে ফারাজদাককে উসফান নামক স্থানে বন্দী করে রাখার নির্দেশ দিলেন।
হযরত যয়নুল আবেদীন রহ. কবি ফারাজদকের বন্দী হওয়ার কথা শুনে তার নিকট বার হাজার দিরহাম হাদিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। এবং বললেন, আমার কাছে যদি আরও থাকত, তাহলে আমি আরও পাঠাতাম।
ফারাজদাক দিরহামের থলে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান! আমি তো কেবল মহান আল্লাহর নিকট এর প্রতিদান পাওয়ার জন্যে এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বংশধরদের সাথে মহব্বত ও ভালোবাাসা প্রকাশ করার জন্যই এই কবিতা আবৃত্তি করেছি।
হযরত যয়নুল আবেদীন রহ. তার কথা শুনে বললেন, আবু কারাশা! আপনি যদি সত্যই আমাদেরকে মহব্বত করেন, তবে এটা গ্রহণ করুন। কেননা, আমি এগুলো মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্যই নিজস্ব সম্পদ থেকে আপনাকে দিয়েছি। এখন আমি তা আর ফিরিয়ে নিতে পারি না।
অবশেষে কবি ফারাজদাক হযরত যয়নুল আবেদীন রহ. এর সেই উপঢৌকন গ্রহণ করেন।
সুত্র: সিরয়ারু আলামিন নুবালা ৪/৩৯৯, তহযীবুল কামাল ২০/৪০২
অনুবাদ: মামুনুর রশীদ
















