জায়রাকে নিয়ে তসলিমার ভাবনা: এক মুসলিম বোনের অভিব্যক্তি

সাওদা নূর তাবিয়া ।।

সাম্প্রতিক বলিউড থেকে জায়রা ওয়াসিম নামক একজন মুসলমান অভিনেত্রীর বিদায়কে কেন্দ্র করে বিতর্কিত এবং ইসলাম বিদ্বেষী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের একটি লেখাকে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ খুব ঢালাও ভাবে প্রচার করেছে। লেখাটির টাইটেল ছিল “জায়রা ওয়াসিমের বলিউড ত্যাগ”। লেখাটিতে মূলত মুসলিম নারীদের ইসলাম সম্পর্কে মিসকনসেপশন দেওয়া হয়েছে, পরোক্ষভাবে ইসলামের মৌলিক বিষয় পর্দাকে হেয় করা হয়েছে। তাও আবার নারী অধিকারের নামে।

তসলিমা নাসরিন কি সত্যিই নারী অধিকার নিয়ে কথা বলে? নাকি ইসলাম ধর্মের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমালোচনার মাধ্যমে মুসলিম নারীদের ইসলামের ব্যাপারে আস্থাহীন করতে চায়?

যখন উত্তরপ্রদেশের রামকোলার বিজেপি মহিলা মোর্চার নেত্রী সুনীতা সিং গৌড় ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “হিন্দু ভাইদের ১০ জন করে দল তৈরি করে মুসলিম মা ও বোনেদের প্রকাশ্য রাস্তায় গণধর্ষণ করা উচিত” তখন কোথায় ছিল তসলিমার নারীবাদী আবেগ ? বিগত একমাসে শুধুমাত্র ধর্মীয় আক্রোশের কারণে ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকটি। তখন কিন্তু তসলিমা নাসরিন তার তথাকথিত নারীবাদী আবেগ নিয়ে প্রকট হয়নি।

প্রাকটেসিং এবং ইসলাম সম্পর্কে বেসিক কিছু লেখাপড়া আছে এমন যে কোন মুসলিম নারী যখন তসলিমার লেখা পড়বে তখন বুঝতে পারবে এই লেখিকা যেকোন বাহানায় শুধু ইসলামকে আক্রমণ করতে চায়। মুসলিম নারীদের বুঝাতে চায় ইসলাম তোমাদের প্রাপ্য অধিকার দেয় নি। দিয়েছে শুধু সীমাবদ্ধতা। স্বাধীনতার জন্য তোমাকে ইসলামের এই শিকল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে হবে। জায়রার ব্যাপারে তার লেখাটিতেও এর ব্যাতিক্রম ঘটেনি।

আমি একজন প্রাকটেসিং মুসলিম নারী,আলহামদুলিল্লাহ্‌। ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনাও করে যাচ্ছি। ইসলাম নারীকে কি পরিমাণ মর্যাদা দিয়েছে তা না জানা থাকলে এ ধরণের লেখা পড়ে হয়তো দুএকজন মুসলিম নারী আবেগী হয়ে উঠতে পারে। এই অনুভূতি থেকেই দু’কলম লিখবো বলে কলম হাতে তুলে নিয়েছি।

এবার আসুন দেখি তসলিমা নাসরিন জায়রাকে হাতিয়ার বানিয়ে কি শিক্ষা দিতে চাচ্ছে মুসলিম নারীদের।

প্রথমে সে জায়রার অভিনয় ছাড়া সম্পর্কিত ফেইসবুক পোস্ট কে অনুমানের এর উপর ভিত্তি করে বলে দিল -এটা অন্য কারো লেখা। তার এই অনুমানের ভিত্তি একটি মাত্র ঘুণেধরা যুক্তি। আর তা হল -জায়রা তার লেখায় বেশ কিছু কোরআনের আয়াত উল্লেখ করেছে।

শুনতে অবাক লাগলেও এটাই তার একমাত্র যুক্তি। তসলিমা নাসরিন একবারও ভেবে দেখেনি কোরআনের বিরোধিতা করার জন্য তাকে কোরআনের কিছু আয়াত নাম্বারসহ মনে রাখতে হয়েছিল। আর জায়রাতো কোরআনের উপর প্রাকটেসিং হতে যাচ্ছে। কোরআন পড়ার কারণেই তার লাইফে পরিবর্তন এসেছে। তাহলে তার কি কোরানের কিছু সিলেক্টেড আয়াত স্মরণে থাকাটা অযৌক্তিক ?

তসলিমা তার এই বেইসলেস অনুমানের উপর ভিত্তি করেই বললো -‘এ ধরণের লেখা এমন কোন মৌলবাদীর লেখা যে কিনা যে কোন মুহুর্তে সন্ত্রাসী বনে যেতে পারে।’ তাও আবার যেন তেন সন্ত্রাসী না, এমন সন্ত্রাসী, যে কিনা ধর্মের নামে মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করে না। একটু পরে এই পোস্টদাতাকে সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস এর দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এবার একটু দেখে নেওয়া দরকার জায়রার ফেইসবুক আইডি থেকে এমন কি লেখা পোস্ট করা হল যার লেখককে ধর্মের নামে মানুষ খুন করে এমন মানুষের সাথে তুলনা করা হল এবং “বাংলাদেশ প্রতিদিন” এ লেখাকে গুরুত্বের সাথে প্রচার করতে হল।

জায়রার ফেইসবুক পোস্টের যে বাক্যটির কারণে তসলিমা নাসরিন সন্ত্রাসের এবং আইএস এর গন্ধ পাচ্ছে সেটি হল –

জায়রার পোস্ট

“While I continued to work in an environment that consistently interfered with my imaan, my relationship with my religion was threatened.”

“এধরনের পরিবেশে কাজ করতে করতে দেখলাম যে এটা আমার ঈমানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, ধর্মের সাথে আমার সম্পর্কের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে উঠেছে।”

অর্থাৎ, বলিউডের পরিবেশে কাজ করা- যেমন মুভি করা, নিজের সৌন্দর্যকে অন্যের কাছে উম্মুক্ত করা, অর্ধউলঙ্গ অবস্থায় পুরুষদের সাথে ড্যান্স করা, নিজের শরীরের বেশিরভাগ অংশ মানুষের বিনোদের জন্য প্রকাশ করাকে যে বা যারা ঈমানের প্রতিবন্ধক মনে করে তসলিমা নাসরিন তাদেরকে সন্ত্রাসী বলতে চাচ্ছে। তাও আবার এমন সন্ত্রাসী যে কিনা ধর্মের নামে মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করে না।

ইসলাম সম্পর্কে একদমই সামান্য জ্ঞান রয়েছে এরকম সকলেই জানেন কোরআনের প্রতিটি আয়াত আল্লাহ তায়ালার থেকে নাজিলকৃত এবং এর একটি আয়াতও অবিশ্বাস করলে সে মুসলমান থাকবে না অর্থাৎ ঈমান থাকবে না। আর মুসলমানের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল ঈমান।
আল্লাহ তায়ালা কোরআনে মুসলিম নারীদেরকে উদ্যেশ্য করে বলেন –
(পরপুরুষকে) সাজ-সজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না, যেমন প্রাচীন জাহেলী যুগে প্রদর্শন করা হত (আহযাব:৩৩)

আল্লাহ তায়ালা মুসলিম নারীদের পরপুরুষের সামনে সাজ-সজ্জা প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছেন। আর বলাবাহুল্য যে বলিউডের নারীদের এ কাজটিই করতে হয় । সম্পূর্ন দুনিয়ার সামনে নিজের সাজ-সজ্জা প্রদর্শন করতে হয় যেটাকে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালার প্রতিটি কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন করার নামই ঈমান। অর্থাৎ বলিউডে কাজ করাকে ঈমানের জন্য বাঁধা মনে করাটাই ঈমানের দাবী। কারণ, মুমিনের জীবন তো আল্লাহর  হুকুম অনুসারেই হতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা যেটিকে নিষেধ করেছেন সেটিকে সঠিক মনে করে কেও ইসলামের মধ্যে থাকতে পারে কি ? অবশ্যই না । তাহলে একজন মুসলিম নারী হিসেবে জায়রার কথাটি কোরানের কথারই সমর্থক। অর্থাৎ একজন মুসলিম নারীকে এ কথার উপর অবশ্যই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, বলিউডে কাজের দ্বারা ইমানে বিঘ্ন ঘটে এবং ধর্মের সাথে ব্যাক্তির অটুট সম্পর্কের ক্ষেত্রে বলিউডে কাজ হুমকি স্বরূপ। এটাই প্রকৃত ইসলাম। কারণ, আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন “(পরপুরুষকে) সাজ-সজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না”। আল্লাহর এই বানীকেই তসলিমা নাসরিন ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ বা কট্টরপন্থী মুসলিমদের অভিমত বলে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিল।

তসলিমা নাসরিন মুসলিম নারীদেরকে বুঝাতে চাচ্ছে, এ ধরণের কথা যারা বলে তারা মানুষ পর্যন্ত খুন করতে পারে। এ ধরণের কথা যারা বলে তারা নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে দুরে সরিয়ে রাখতে চায়। মূলত ইসলাম বিদ্বেষী এ লেখিকা পরোক্ষ ভাবে কোরানের আয়াতের বিপরীতে মুসলিম নারীদের খেপিয়ে তুলতে চাচ্ছে। কোরআনের সঠিক শিক্ষা থেকে যে সকল মা বোনেরা কিছুটা দুরে রয়েছে তাদেরকে নিজের বেইসলেস যুক্তি আর মিথ্যা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে কোরআনের প্রতি আস্থাহীন করে দিতে চাচ্ছে। সেকুলার পত্রিকার ধারক বাহক আর তাসলীমা নাসরীনের মত ইসলাম বিদ্বেষীরা হয়তো জানে না ইসলামি শরিয়ত নারীদের মা হিসেবে কত উঁচু আসনে অবস্থান দিয়েছে , স্ত্রীকে কতটা মর্যাদার পাত্র বানিয়েছে, মেয়েকে কতটা যত্ন আর মুহাব্বতের সাথে পালার হুকুম করেছে। হয়তো কোরআনের সাথে কিছুটা সম্পর্ক হওয়ায় জায়রা বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। এজন্যই সে তার পোস্টে লিখেছে –

“In the great and divine wisdom of the Quran, I found sufficiency and peace. … …

Quran and the guidance of Allah’s messenger (PBUH) became the weighing factor in my decision making and reasoning and it has changed my approach to life and it’s meaning.”

“কোরআনের মহত্ব ও ঐশ্বরিক জ্ঞানের মাঝে আমি সচ্ছলতা ও শান্তি খুঁজে পেয়েছি ……
কোরআন এবং রাসূল সাল্লাল্ললাহু আলাইহি ওসাল্লামের নির্দেশনা, আমার চলার পথ এবং অর্থই পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং আমার যৌক্তিক সিদ্ধান্তের প্রধান উৎপাদকও এটি।”

তুমি মারহাবা পাওয়ার যোগ্য হে বোন জায়েরা। একদিকে ঈমান , আর অন্যদিকে কোটিকোটি টাকা তোমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তুমি ঈমানকেই প্রাধান্য দিলে। মারহাবা , মারহাবা।

 

 

পূর্ববর্তি সংবাদসরকারি সফরে কাল ঢাকায় আসছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তি সংবাদভারতে মুসলিম নিপীড়নের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে খেলাফত মজলিস