শাহ মুহাম্মদ খালিদ ।।
প্রতি বছর ঈদুল আযহা ঘনিয়ে আসলেই আলোচনায় উঠে আসে কোরবানির পশুর চামড়ার প্রসঙ্গ। বিগত বছরগুলোর মতো চলতি বছরও চামড়ার দাম বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিম্নমুখী। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কওমি মাদরাসাসমূহ। এই সংকট নিরসনে মুফতি আমিনী (রহ) তাঁর জীবদ্দশায় নিজস্ব প্রক্রিয়ায় চামড়া সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাত করার একটা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন বলে শোনা যায়।
সেই উদ্যোগের প্রেক্ষাপট এবং ইতিহাস জানতে যোগাযোগ করেছিলাম বেফাকের সহ-সভাপতি এবং লালবাগ মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি ফয়জুল্লাহ এবং বেফাকের সহ-সভাপতি ও আরজাবাদ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার সঙ্গে।
সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া বলেন, সময়টা সম্ভবত ২০০৪ সন। কোরবানির ঈদের আর দু’তিন দিন বাকি। এমন সময়ে ট্যানারি শিল্পের মালিকদের সম্মিলিত একটি ঘোষণা মুফতি আমিনী রহ. -এর হাতে আসলো যেখানে তারা সে বছরের কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। যা ছিল তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এই নোটিশ হাতে আসার পরে মুফতি আমিনী মারাত্মক ক্ষুব্ধ হন। এটাকে কওমি মাদরাসার উপর একটি বড় আঘাত হিসেবে বিবেচনা করেন এবং সেদিনই তিনি ঢাকার বিভিন্ন মাদরাসার মুহতামিমদেরকে ডেকে পাঠান। সম্মিলিত মিটিংয়ে এ বিষয়ে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
আরও পড়ুন: চামড়ার পড়তি দর: করণীয় প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের কতিপয় প্রস্তাব
মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া আরও বলেন, মুফতি আমিনীর হুংকারে ট্যানারি মালিকপক্ষ আতঙ্কিত হয়ে সরকারের উচ্চ মহলে যোগাযোগ করে এবং পরবর্তীতে সরকারের কয়েকজন এমপি এবং মন্ত্রীর মধ্যস্থতায় বিষয়টির সুরাহা হয়। কিন্তু মুফতি আমিনী ঘোষণা করলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মূল্য নির্ধারিত করে দেওয়া নোটিশের পরিবর্তে মূল্য উন্মুক্ত করে দেওয়া নতুন নোটিশ তার হাতে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত হবে না। পরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পূর্বের নোটিশ স্থগিত করে নতুন নোটিশ হাতে আসার পর তিনি কর্মসূচি স্থগিত করেন।
ওই ঘটনা সম্পর্কে লালবাগ মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি ফয়জুল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন তিন চার ঘণ্টার একটা কর্মসূচিতে চামড়ার নির্ধারণ করে দেওয়া মূল্য নিয়ে তৈরি জটিলতা দূর হলেও প্রতিবছরই এরকম একটা ঝামেলা হতে পারে এবং সে ঝামেলা দূর করার ক্ষেত্রে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়- সেটাও তখন আলোচনায় উঠে আসে। সভায় অনেকেই প্রস্তাব করেন, যেহেতু সারা দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো কোরবানির মৌসুমে লাখ লাখ চামড়া সংগ্রহ করে সেটা জাতীয় পর্যায়ের অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করে, সে ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসার স্বার্থ রক্ষার জন্য নিজস্ব প্রক্রিয়ায় লবণ দেওয়া, চামড়া সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে ট্যানারি স্থাপন করে চামড়াকে পুরোপুরি ব্যবহার উপযুক্ত করে দেশি এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে তখন ‘কওমি মাদরাসা কল্যাণ সংস্থা’ নামে একটি সমবায় সমিতি গড়ে তোলা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
‘কওমি মাদ্রাসা কল্যাণ সংস্থা’ পরবর্তীতে কোন দিকে গড়িয়েছিল সে ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায় আরজাবাদ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়ার কাছে। তার ভাষ্যমতে সেই সংস্থা পরবর্তীতে সমবায় সমিতিতে পরিণত হয়। যেখানে একজন একজন করে সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন ফলে সেটা আর কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রীক কোন সংস্থা থাকেনি, বরং ব্যক্তিগত সমিতিতে পরিণত হয়েছে এবং কওমী মাদরাসার উদ্যোগে চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত কিংবা ট্যানারি গড়ে তোলার প্রকল্পটি আর আগায়নি।
আরও পড়ুন: প্রতিবছরই কমছে কুরবানির চামড়ার দর: প্রতিকার নিয়ে কী ভাবছেন আলেমরা
তারপর বহু বেলা গড়িয়েছে। মুফতি আমিনী আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন তাও অনেক দিন। বর্তমানে চামড়ার বাজার দর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এমতাবস্থায় কওমি মাদরাসার সচেতন বিভিন্ন মহলে সেই পুরনো উদ্যোগের কথা নতুন করে আলোচনায় আসছে– বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়া সম্ভব কি না জানতে চাইলে মুফতি ফয়জুল্লাহ বললেন, অবশ্যই সম্ভব! কিন্তু এখানে একটা ‘কিন্তু’ থেকে যায়। কারণ মুফতি আমিনীর মতো সে ধরনের গ্রহণযোগ্যতা, সে ধরনের দৃঢ় মনোবল এবং উদ্যমী মানসিকতার মানুষের এখন বড়ই অভাব। সে ক্ষেত্রে নতুন করে এরকম কোনো উদ্যোগ হাতে নেওয়া কষ্টকর এবং সময় সাপেক্ষ। বর্তমানে সবার আগে প্রয়োজন হচ্ছে চামড়ার দাম বছর বছর কেন কমছে সে ব্যাপারে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা। সরকারের উপর চাপ তৈরি করা যাতে চামড়ার মতো এরকম সম্ভাবনাময় একটি শিল্প ধ্বংসের সম্মুখীন না হয়। বিশেষ করে এই শিল্পের সাথে বাংলাদেশের অজস্র মাদরাসার লক্ষ লক্ষ এতিম অসহায় ছাত্রের ভরণপোষণের বিষয়টি জড়িত। ফলে চামড়ার দাম কমার কারণে জনসংখ্যার একটা বিপুল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটার একটা দায় অবশ্যই সরকারের উপর বর্তায়।
একই প্রশ্নের উত্তর একটু ভিন্নভাবে দিলেন মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া। তার মতে বর্তমান সময়ে ব্যবসায়িক পলিসি রক্ষা করে ট্যানারি শিল্পের মতো বড় একটা প্রকল্প হাতে নিয়ে সেটাকে বাস্তবায়ন করা মাদরাসা কর্তৃপক্ষের জন্য অত্যন্ত কঠিন এবং দুরূহ কাজ। বিপরীতে কওমি মাদরাসার যারা দায়িত্বশীল তারা মাদরাসার দেখাশোনা এবং শিক্ষা ও দীক্ষার মান উন্নয়ন নিয়ে ব্যস্ত থাকাকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এবং আমার মতেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেই বহাল রাখা হোক। তাদেরকে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে না জড়ানো হোক। বরং এক্ষেত্রে দায়িত্বটা সরকারের কাঁধে রেখেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। তারা আমাদেরকে জবাব দিবে কেন বছর বছর চামড়ার মূল্য কমছে।
মাওলানা বাহাউদ্দিন যাকারিয়া বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এটা আন্তর্জাতিক একটা চক্রান্তের অংশ বলে মনে হয়। কারণ প্রথমত এই শিল্পের সাথে দেশের হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসার আর্থিক প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জড়িত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশ্বে চামড়া শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে অত্যন্ত লাভবান হতে পারে ফলে প্রতিবেশী দেশ এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্থ করে এই শিল্পে নিজেদের প্রভাব বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে মনে করি।
















