‘কলব পরিশুদ্ধ করুন, সব বিশুদ্ধ হয়ে যাবে’

মাওলানা আবদুল মতীন ।।

আমরা আজ একত্রিত হয়েছি একটি ইসলাহী মজলিসে। ইসলাহী মজলিস বলা হয় সংশোধনের মজলিসকে। ইসলাহ মানে সংশোধন। আমলের সংশোধন। কলবের সংশোধন। তাযকিয়া নফস বা কলবের পরিশুদ্ধির মজলিস।

 কলব পরিষ্কার রাখা আবশ্যক

প্রত্যেকের উপর তার কলব পরিষ্কার রাখা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলার আদেশগুলোর মাঝে অন্যতম একটি আদেশ। তবে সরাসরি না। এই নির্দেশ বিভিন্ন আয়াত ও হাদীস থেকে বুঝে আসে।

কখনো গুনাহর মাধ্যমে কলবে ময়লা জমে যেতে পারে। তখন ময়লা দূর করতে হবে। পরিষ্কার করতে হবে। গুনাহ হলে যেমন তাওবা করতে হয়। তেমনি কলবে ময়লা জমলে কলব পরিষ্কার করতে হয়।

যেমন অনেকে নিজের জামা কাপড় খুব যত্নের সাথে পরে, কোন ময়লা লাগতে দেয় না। আর একটু ময়লা হলেই ধুয়ে ফেলে। কারো জামা অল্পতেই  ময়লা হয়ে যায় বেখেয়ালির কারণে। তো সেই জামা আবার ধুয়ে ব্যবহারযোগ্য করতে হয়।

ঠিক তেমনি কারো কলব একদমই ময়লা হয় না। নিজেকে সগিরা কবিরা সব ধরণের গুনাহ থেকে বাচিঁয়ে রাখে। তার কলব সব সময়ই পরিচ্ছন্ন। কলবে কোন দাগ নেই। আর কারো কলবে গুনাহের কারণে দাগ পড়ে যায়। কলব ময়লা হয়ে যায়। কলব ময়লা হয়ে গেলে কলব পরিষ্কার করতে হয়।

কলব পরিষ্কার রাখার উপকারিতা

কলব পরিষ্কার রাখার বড় ফায়দা হল এতে আল্লাহর মহব্বত সব সময় থাকবে। নেক কাজ করতে ভাল লাগবে। খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে ভাল লাগবে।

আমার কলব যখন কলবে সালিম হয়ে যাবে, নির্মল হয়ে যাবে, তখন আমার মুআমালা লেনদেন, আচার ব্যবহার সব ঠিক হয়ে যাবে। গালি দেব না কাউকে। ঝগড়া করব না কারো সাথে। অন্যায় কোন কাজ করব না। আমার দিল এসব কাজে আমাকে বাধা দিবে।

ইবাদত বন্দেগীতে অন্যরকম এক স্বাদ পাব।

আমাদের সালাফের দিলের বিশেষ হালতের কারণে ইবাদতের প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল তাদের মাঝে। হযরত গাংগুহি র. শেষ বয়সে, যখন হাম্মামে যেতে দু তিন বার দম নেয়া লাগত, তখন মাগরিবের পর বিশ রাকাত সালাত আদায় করতেন! এটা কি এমনি এমনিই সম্ভব? না, বরং দিলের বিশেষ অবস্থার কারণে।পরিচ্ছন্ন পূত পবিত্র হৃদয়ের কারণে।

সুস্থ ও পরিশুদ্ধ মন ছাড়া পরকালে মুক্তি পাওয়া যাবে না। আল্লাহ তালা বলেন,

يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ  إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ [الشعراء: 88، 89]

 

আখেরাতে অর্থ সম্পদ ও সন্তান সন্ততি কোনও কাজে আসবে না। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে সুস্থ ও পরিশুদ্ধ মন নিয়ে (সে মুক্তি পাবে)।

 কলব বিকৃত হলে সবই বিকৃত হয়ে যায়

কলব সাফাই না করলে, কলবে ময়লা জমতে জমতে এমন অবস্থা হয়ে যায় যে, ভাল কোন কাজ ভাল লাগে না । কলব বিকৃত হলে রুচিই বিকৃত হয়ে যায়। তখন ভাল কাজগুলো তার কাছে আর ভাল লাগে না। গুনাহের কাজ ভাল লাগে। গান শুনতে ভাল লাগে। ওয়াজ শুনতে ভাল লাগে না। দীনের কথা শুনতে ভাল লাগে না। কারো জ্বর হলে যেমন রুচি বিকৃত হয়ে যায়, যেটাই খায় তিতা লাগে। তেমনি কলব বিকৃত হলে ভাল কিছু আর ভাল লাগে না।

 সব কিছুর নিয়ন্ত্রক এই কলব

হাদীস শরীফে এসেছে। হযরত নুমান ইবনু বাশির রা. এর হাদীস। রাসুল স. বলেন,

ا وإن في الجسد مضغة، إذا صلحت، صلح الجسد كله، وإذا فسدت، فسد الجسد كله، ألا وهي القلب. أخرجه الإمام البخاري ومسلم

জেনে রাখ, সবার দেহের ভেতর একটি মাংসপিণ্ড আছে, এটা যখন ভাল থাকে ‍গোটা দেহ ভাল থাকে। আর এটা যখন নষ্ট হয়ে যায়, পুরা দেহ বিনষ্ট হয়ে যায়।আর এটা হল কলব।-সহিহ বুখারি ৫২, সহিহ মুসলিম ১৫৯৯.

কলব খারাপ হলে দেহের সব অঙ্গ খারাপ হয়ে যায়। কলব ভাল হলে সব ভাল। এটা ‍শরীরের রাজা। নিয়ন্ত্রক। সব কিছুর মূল।

দিলের হালের উপর মানুষের সব কাজ আবর্তিত হয়। দিলের অবস্থা যেমন কাজও হয় তেমন।দিলে দয়া থাকলে মানুষ দান করে। কৃপণতা থাকলে দান করে না। জোর করেও আপনি তার হাত দানের দিকে প্রসারিত করতে পারবেন না। দিল বিকৃত হলে খারাপ কাজে যাবে। ভাল কাজে উৎসাহ পাবে না। ভাল কাজে যাবে না।

ত্মসমর্পনকারী দিল বানান

আমদেরকে শরিয়তের সামনে আত্মসমর্পনকারী দিল বানাতে হবে। শরিয়ত যখন যা করতে বলবে তাই করব এবং করতে ভাল লাগবে। এতেই আনন্দ পাব। আল্লাহ ও রাসুলের সামনে সমর্পিত অন্তর বানাতে হবে। যে অন্তর আল্লাহ ও তার রাসুলের বিধানের বাইরে গিয়ে কিছু করতে প্রস্তুত হবে না।

দিলের অবস্থা দিয়ে বুঝব আমি কেমন?

আমি ভাল, না খারাপ সেটাও বোঝা যাবে দিলের অবস্থা দেখে। ভাল হওয়ার লক্ষণ হল দিলের হাল এমন হবে আমি নিজেকে কিছুই মনে করব না। নিজেকে অতি নগন্য ও তুচ্ছ ভাবব। এটা শুধু মুখে মুখে বললে হবে না, অন্তর থেকে হতে হবে। অন্তরে থাকতে হবে আমি ছোট,আমি ক্ষুদ্র ও নগন্য বান্দা।নিজেকে যাহের করা মানে বড় মানে   করা। এটা ভাল গুণ না। ভাল হওয়ার লক্ষণ না।

কীভাবে দিল পরিষ্কার করব?

দিল পরিষ্কার করার অন্যতম মাধ্যম যিকরুল্লাহ। বেশি বেশি আল্লাহর যিকর করা, আল্লাহর স্মরণ করা।

এই যিকরুল্লাহর অনেক ফযিলত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ. البقرة: 152]

তোমরা আমাকে স্মরণ করলে আমিও তোমাদের স্মরণ করব।আর আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো, কুফুরি করো না।

 

 

৭. ১১. ১৪৪০ হিজরী, ইসলাহি মজলিস,  বাইতুল আযীয জামি মসজিদ, রামপুরা

অনুলিখন: শিহাব সাকিব