চামড়া রপ্তানি নিয়ে এখনও সংশয়ে মন্ত্রণালয়

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: কোরবানির পশুর চামড়ার নজিরবিহীন দর বিপর্যয়ের পর কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত ঐ সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারবে কিনা  এ  নিয়ে সংশয়ে রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ট্যানারি মালিকরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া ক্রয় করলে দেশীয় শিল্পের স্বার্থে ঐ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মফিজুল ইসলাম।

 

জানা গেছে, বেশকিছু কারণেই অতীতের চাইতে কাঁচা চামড়ার চাহিদা কমেছে। এর মধ্যে চামড়া পণ্যের উত্পাদন এখনো পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকার ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ক্রয় কমিয়ে দিয়েছে। গত দুই অর্থবছর ধরেই চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি পড়তির দিকে। আবার যারা এসব দেশের ক্রেতার কাছে রপ্তানি করছেন, তারা মূলত ব্র্যান্ডের চাহিদা অনুযায়ী আমদানিকৃত চামড়ায় তৈরি করা পণ্য রপ্তানি করছেন। গত বছর ১১১ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৯০০ কোটি টাকা) চামড়া বাংলাদেশ আমদানি করেছিল। এর আগের বছর আমদানি করেছিলো ৯৭ মিলিয়ন ডলারের। চামড়ার বিকল্প হিসেবে সিনথেটিক ও ফাইবারের জুতার ব্যবহার বেড়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে বাংলাদেশের চামড়ার বড়ো বাজার ছিল চীন। কিন্তু সম্প্রতি চীন ও মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাবে চীনের এই শিল্পের রপ্তানিতে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। এর ধাক্কা লেগেছে চীনে বাংলাদেশের চামড়া পণ্যের রপ্তানিতেও। সব মিলিয়ে চামড়ার চাহিদা কমতির দিকে।

অন্যদিকে দেশে প্রতিবারই কোরবানির পশুর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে চামড়া পণ্যের কাঁচামালের (কাঁচা চামড়া) যোগানও বাড়ছে। এর সঙ্গে অবিক্রিত চামড়া মিলিয়ে চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কাঁচা চামড়ার দামের ভারসাম্য রক্ষায় মন্ত্রণালয় যথাসময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বলে মনে করছেন অনেকে। তারা মনে করেন, মন্ত্রণালয়ের রপ্তানির সিদ্ধান্ত দেওয়ার দরকার ছিল অন্তত ছয় মাস আগে। কেননা রপ্তানির সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরপরই কাঁচা চামড়া বা ওয়েট ব্লু রপ্তানি করা সম্ভব হয় না। এজন্য ফাইটোসেনিটারিসহ বিভিন্ন রোগজীবাণুমুক্ত করার সনদ থাকতে হয় আমদানিকারক দেশের চাহিদা অনুযায়ী। গতবারের ন্যায় এবার সরকার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দর নির্ধারণ করেছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা আর ঢাকার বাইরের ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এছাড়া সারাদেশে প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে এই মূল্য আরো বেশি পাওয়া যাবে। তবে চামড়ার দর বিপর্যয়ের পর ইতিমধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যখন কোনো বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় (সরকার কর্তৃক কাঁচা চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেওয়া) তখন যথাযথ নজরদারি না থাকলে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার জন্য একটি গ্রুপ দাঁড়িয়ে যায়। অতীতে কাঁচা চামড়ার যোগান থাকলেও বাজারে চাহিদাও ছিল। ফলে খুব সমস্যা হয়নি। এবার যে পরিমাণ চামড়ার যোগান তৈরি হয়েছে, সেই পরিমাণ চাহিদা নেই। এই বিষয়টি আরো অনেক আগেই অনুধাবন করে সরকারের সিদ্ধান্ত থাকা প্রয়োজন ছিল। এবারের ধানের বাজারের মতো অবস্থা হয়েছে চামড়ার বাজারের। সরকার চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত আগে নিলে বাজার এভাবে পড়তো না। তবে দেরিতে নেওয়া হলেও এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত হবে না। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চামড়া রপ্তানির সুযোগ থাকা উচিত। এবারের অভিজ্ঞতায় পরবর্তী বছরের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। ফলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব থাকবে।

অবশ্য চামড়া রপ্তানির বিষয়ে আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব। তিনি বলেন, দেশীয় শিল্পের মালিকরা রপ্তানির বিপক্ষে। আমরাও স্থানীয় শিল্পের স্বার্থ বিবেচনা করে রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। কিন্তু এখন দেখলাম দাম পড়ে গেছে। এখন চামড়া নষ্ট হওয়ার চাইতে যাতে দুইটা পয়সা আয় হয়, সেজন্য রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

অবশ্য চামড়ার অস্বাভাবিক দরপতনে যেসব উপকারভোগী বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের জন্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা তহবিল থেকে বিকল্প উপায়ে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলেও মনে করেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

পূর্ববর্তি সংবাদ‘কলব পরিশুদ্ধ করুন, সব বিশুদ্ধ হয়ে যাবে’
পরবর্তি সংবাদচলন্তিকা বস্তির অগ্নিকাণ্ড, তিন হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত