ইসলাম টাইমস ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ মিয়ানমার। রাষ্ট্রটি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ঐতিহাসিকভাবেই যুগ যুগ ধরে নানা ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ সেখানে বসবাস করেন।
কিন্তু গত শতকের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন শুরুর পর থেকে মিয়ানমারের মুসলমান নাগরিকদের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। রাষ্ট্র এবং সমাজে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ-বৈষম্য, ঘৃণা বাড়ছে।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলা মিয়ানমারের মুসলমানদের নিরাপত্তা বিষয়ে এক প্রতিবেদনে দেশটির পুরাতন রাজধানী ইয়াঙ্গনের তিনজন মুসলিমের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা হয়েছে।
অং নাইং সো, ফটোসাংবাদিক
“২০১৬ সালে হঠাৎ আমাকে সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করা শুরু হলো। ফেসবুকে আমার ছবি ছড়িয়ে পড়লো। একদল কট্টর জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ এ কাজ শুরু করে।”
“সন্ত্রাসীদের কোন একটি ভিডিওতে একজনের চেহারার সাথে আমার মিল ছিল। সেই ভিডিও’র একটি স্ক্রিনশট নিয়ে আমার মুখের ছবির সাথে তা পাশাপাশি রেখে সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হলো।”
তারপর থেকে মুসলমান এই ফটো সাংবাদিক অং নাইং সো অনলাইনে টার্গেট হয়ে গেলেন।
“ফেসবুকে মানুষ কিছু না বুঝেই, না জেনেই আমার বিরুদ্ধে ঘৃণা উগরে দিতে শুরু করলো।”
পরিস্থিতি আরো সঙ্গিন হয়ে উঠলো, যখন ভিন্ন একটি ঘটনায় পুলিশ তাকে আটক করে।
“টানা ১১ দিন ধরে আমাকে জেরা করা হয়। তারপর পুলিশ ২০১৬ সালে ফেসবুকে পোস্ট করা সন্ত্রাসী ভিডিও দেখিয়ে বলে আমিই নাকি সেই সন্ত্রাসী।”
“এই ঘৃণার কারণ আমি ঠিক বুঝতে পারি না। সরকারি কর্মকর্তাদের মনের ভেতর যেন মুসলিমদের ভেতর চরম এক ঘৃণা জমে রয়েছে। তারা যেন মুসলিমদের সহ্যই করতে পারে না।”
টিন অং মিন্ট, ইয়াঙ্গনে মুসলিম অধিকার কর্মী
“প্রতিদিন আপনি সোশ্যাল মিডিয়াতে মুসলিমদের নিয়ে মনগড়া সব খবর দেখবেন। ফটোশপ করে ছবি পোষ্ট করতে দেখবেন। কিন্তু এগুলোর বিরুদ্ধে কিছু করার কোনো উদ্যোগ কারো মধ্যেই নেই।”
“এ ধরণের কোনো একটি বিষয় পোস্ট করা হলেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন বুঝতে পারি, এ নিয়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।”
প্রধানত সে কারণে টিন অং মিন্ট ফেসবুকে একটি পর্যবেক্ষণ গ্রুপে নাম লিখিয়েছেন । এই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। সোশ্যাল মিডিয়াতে মুসলিম বিদ্বেষী বিভিন্ন পোস্টের দিকে এরা নজর রাখেন।
“আমরা নিজেদের এদেশের নাগরিক মনে করি, কিন্তু তারা আমাদের ভিন্ন কিছু ভাবে। এরকম বৈষম্য চলতে থাকলে মুসলমানরা আরো বেশি করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।”
খিন সান্ডার, মানবাধিকার কর্মী, ইয়াঙ্গন
“আপনি যদি চাকরির জন্য আবেদন করেন আর আপনি যদি মুসলিম হন, তাহলে ঐ চাকরি হয়তো আপনি পাবেন না। পরিচয়পত্র বা নাগরিক কার্ড নবায়ন করা এখন মুসলমানদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খিন সান্ডার নিজেও এ নিয়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
“পরিচয়পত্র নবায়ন করতে গিয়ে আমার দু’বছর লেগেছে। অথচ বৌদ্ধরা দু’সপ্তাহ বা বড়জোর ২৮ দিনের ভেতরে তা পেয়ে যায়।”
“আমি যখন আবেদনপত্র পূরণ করছিলাম, স্বরাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বুঝে ফেলেন যে আমি মুসলমান। তিনি আমার মুখের ওপর বললেন ‘তুমি একজন কালায়া, আমি তোমার কাজ করে দেবো না।”
মিয়ানমারে মুসলমানদের ছোটো করতে ‘কালায়া’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
“প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম, রেগে গিয়েছিলাম।”
















