বাতাসে ভাসছে আরব রাজা-বাদশাদের আত্মা পোড়ার গন্ধ!

আবু তাশরীফ ।।

গতকাল ২৫ আগস্ট আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। এ সম্মাননা পদক দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছিল আগে থেকেই। কিন্তু পদকটা দেওয়া হলো কাশ্মীর নিয়ে মোদি সরকার কর্তৃক নিবর্তনমূলক ও জুলুমবাজির একটি আইন পাশ করার পর, যখন কাশ্মীরের মুসলমানরা চোখের পানি ঝরাচ্ছেন এবং রাস্তায় বিক্ষোভ করছেন।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একই রকমভাবে কয়েক ঘণ্টা পরই মোদিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা পদক দিল আরেকটি আরব রাষ্ট্র বাহারাইন। মোদির হাতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আরবের দুটি স্বচ্ছল ও বিত্তবান রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মাননা পদক উঠলো।

আরব রাষ্ট্রগুলোর রাজারা যেন ভারতে মুসলমানদের নানামাত্রিক নির্যাতনের প্রধান অভিভাবক এবং কাশ্মীর -আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের জীবন বিপন্ন করা ও তাদের নাগরিকত্বের মর্যাদা-অবস্থানকে ক্ষুন্ন করার রাষ্ট্রীয় নায়ক নরেন্দ্র মোদিকে পুরস্কৃত করা ও সম্মানিত করার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। এনিয়ে সারা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মুসলমানরা ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করছেন। এ ব্যাপারে আরব রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রনেতাদের কারো কোনো কথা না পাওয়া গেলেও এশিয়ার অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র এবং আমেরিকা-ইউরোপসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুসলমান অধিবাসীদের বিভিন্ন জন, বিভিন্ন কমিউনিটি, বিভিন্ন নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্ব তীব্র ভাষায় ক্ষোভ ও নিন্দা ব্যক্ত করেছেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেসব প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে।

এরও আগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও নরেন্দ্র মোদিকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলে আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে সৌদি আরব, বাহরাইন, আরব আমিরাতকে একটি বলয়ভুক্ত শক্তি মনে করা হয়। কাতার বিরোধী অবরোধের সময় থেকে এ বলয়টির চেহারা সামনে এসেছে। এজন্য আরব আমিরাত ও বাহরাইনের পক্ষ থেকে মোদিকে দেওয়া পদকের ঘটনার পর পর সৌদি আরবের শাসকদেরও নানা হঠকারিতার প্রসঙ্গ সামাজিক মাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে ।

পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, আরবের এ বলয়টি এবং এর সঙ্গে মিশর-এরা মূলত নতুন আরব রাজনীতির ক্ষেত্রে ইসরাইলের প্রতি সহযোগ ও সহানুভূতি পোষণের নতুন কূটনীতিতে নেমেছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা, ইসরাইল, ভারতসহ এজাতীয় ছোট-বড় মুসলিমবিদ্বেষী প্রভাবক দেশগুলোর সঙ্গে আঁতাত ও কূটনীতির নয়া খেলারই একটি বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে নরেন্দ্র মোদিকে এভাবে সম্মাননা প্রদান। এজাতীয় ‘মুসলিম ঘাতক তোষণে’র কূটনীতি যে আরব রাজাদের কোন খাদে নিয়ে ফেলে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিছু আইন-কানুন রহিত করে দিয়ে শুধু যে কাশ্মীরের মুসলমানদের ব্যাপারে কঠোর হয়ে উঠেছেন, বিষয়টি এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়, এটা সচেতন প্রায় সবাই জানেন। এই নরেন্দ্র মোদি যেই দলটির নেতৃত্ব দেন, সেই বিজেপি, তার সঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, আরএসএস, বজরং দল, শিবসেনার মতো অনেকগুলো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক দল তার সঙ্গে রয়েছে। যারা মোদির আমলে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় মুসলমানদের হত্যা করছে, আঘাত করছে, বাড়িতে উঠে মারছে, রাস্তাঘাটে পিটাচ্ছে। একইসঙ্গে টার্গেট করে ভারতে মুসলমানদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করা এবং তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার কাজগুলোও প্রকাশ্যে করে যাচ্ছে। এজন্য নরেন্দ্র মোদির প্রতি আরব রাজাদের এজাতীয় মাত্রাতিরিক্ত সম্মাননা ও গদগদ আচরণে ক্ষুব্ধতা, বিরক্তি ও হতাশার মধ্যে পড়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিম।

নরেন্দ্র মোদিকে বিশ্বমিডিয়া ‘গুজরাটের কসাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে অনেক আগেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের আসনে বসার পর মোদির প্রতি বিশ্বের বড় রাষ্ট্রগুলোর আচরণে কিছুটা পরিবর্তন এলেও ভারতের মুসলমানদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদির আচরণে ক্ষমতার প্রথম দিন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত বিশেষ কোনো রদবদল ঘটেছে বলে কোনো আলামত প্রকাশ হয়নি। তারপরও প্রথম মেয়াদে যখন মোদির কেন্দ্রীয় ক্ষমতারোহন ঘটে, তখন অনেকেই দর্শকের চোখে মুসলিমদের প্রতি তার আচরণ পরখ করার একটা মেজাজে ছিলেন। তার সঙ্গে কোনো কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের সহজাত কূটনৈতিক সম্পর্ক ও স্বাভাবিক আচরণকে শুরুর দিকে অনেকেই সহনীয় একটি দৃষ্টি নিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর মোদি এবং তার অনুসারীরা ভারতে যা যা করছেন, কাশ্মীর ও আসাম নিয়ে যেসব নতুন নীতিমালা ও আইন-কানুন তৈরি করছেন, যেই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন- এসব কিছু দেখার পর সবার স্মৃতিতে আবারো ‘গুজরাটের কসাই’- এর ভাবমূর্তিটি সামনে চলে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে এই ‘কসাই’ সাহেবকেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহারাইনের পক্ষ থেকে খুব ঘটা করে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়ার ঘটনায় নিঃসন্দেহে ভারতে বসবাসরত মুসলমান এবং কাশ্মীরের মুসলমানসহ সব ভারতীয় মুসলমানের প্রতি একধরনের অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে।

নরেন্দ্র মোদির প্রতি আরব রাষ্ট্রগুলোর রাজা-বাদশাদের এজাতীয় আচরণে ও সম্মান প্রকাশের ঘটনায় তাই অনেকে বলছেন, আরব দেশগুলোর নেতারা, বিলাসী রাজা-বাদশারা তাদের নেতৃত্বের নৈতিক ও মানবিক সব যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন। বন্দুক ও ভোগের উপর ভিত্তি করেই তারা ক্ষমতা চালাচ্ছেন। বরং অনেকেই বলছেন, এখন মোদির প্রতি তাদের এই অতিরিক্ত সম্মাননা থেকে তাদের পচে যাওয়া হৃদয় ও আত্মা পোড়ার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে!

গত ৪০/৫০ বছরের বিশ্ব মুসলিম রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ছোট-বড় আরবদেশগুলো উম্মাহর নানারকম পরিস্থিতিতে অভিভাবকত্ব ও সহযোগী ভূমিকা পালন করেছে। কোনো কোনো আরব রাষ্ট্রের প্রতি বহু ছোটখাটো উম্মাহ-ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর নাগরিকরা এক ধরনের প্রত্যাশা লালন করতেন। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো খোলামেলা ও বিলাসপ্রবণ একটি দেশকেও মুসলমানদের নেতৃত্বশীল একটি দেশ হিসেবে গণ্য করা হতো। ২৫ আগস্ট মোদিকে দেওয়া সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননার ঘটনার পর এখন আর তাদেরকে নিয়ে কোনো আশা লালন করার সুযোগ আছে বলে কেউ মনে করেন না।

উম্মাহর ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক মোড় এখন চলছে‌। চলছে বাঁক বদল। আরব দেশগুলোর রাজা-বাদশারা মুসলিমবিরোধী বিশ্বশক্তির পায়ের কাছে নিজেদেরকে লুটিয়ে দিচ্ছেন। ক্ষমতার জন্য, বিলাসিতার জন্য, পারিবারিক রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তারা এখন মুসলিম বিশ্বের বড় বড় খুনিদের কাছে নিজেদের আত্মা খুব সস্তা দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। সেসব আত্মা যেন খোলা হাটে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে আত্মা পোড়ার সেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।

কষ্ট ও দরদ মাখা চোখ নিয়ে কোটি কোটি মুসলমান দুনিয়ার নানা প্রান্তে এখন এই মোনাজাতের মধ্য দিয়েই চোখের অশ্রু ফেলছেন যে, কবে, কোন দিন, কতদিন পর আবার আরব দেশগুলোসহ প্রতিটি মুসলিম দেশে উম্মাহদরদী, গায়রতমান্দ, সাহসী ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব হাল ধরবেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে মোদির এই সর্বোচ্চ পদক প্রাপ্তির পর আরব রাষ্ট্রগুলোর নেতাদের পক্ষ থেকে আরো বড় সড় কোনো স্খলন  ও নৈতিক বিচ্যুতির আশঙ্কায় বুক কাঁপছে দ্বীনপ্রাণ মানুষের। সবাই বাঁচার পথ খুঁজছে এই অবমাননা, লাঞ্ছনা ও হতাশা থেকে। অভিভাবকত্বহীন এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে।

পূর্ববর্তি সংবাদআল-আকসার খতীবকে তলব করল ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা
পরবর্তি সংবাদহাটহাজারীর ‘বাবা হুজুর’ আইসিইউতে, দোয়া কামনা