‘হিন্দুদের শত্রুরা জাতির শত্রু’, তাহলে মুসলমানদের শত্রুরা কাদের শত্রু?

খসরু খান ।।

তেইশে আগস্ট ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্মাষ্টমী। ওই দিন হিন্দু সম্প্রদায় বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের উদ্যোগে দেশজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। দেশের প্রধান সংখ্যালঘু ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠী হিসেবে তাদের এই অনুষ্ঠানের দিনে সরকারের উচ্চ মহল থেকে বিভিন্ন রকম বাণী-বক্তব্য দেওয়া হয়। সাধারণত এটা নিয়ম হিসেবেই করা হয়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট বক্তব্য দিয়েছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও উন্নয়ন নিয়ে। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় সরকারের মন্ত্রীরাও জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন, বক্তব্য দিয়েছেন।

বাণী-বক্তব্য দেওয়ার এ বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা দায়িত্বপূর্ণ কথা বলবেন, বক্তব্য দেবেন এটা স্বাভাবিক। সংখ্যালঘুদের বিশেষ ধর্মাচার পালনে নিরাপত্তা যেন কোনো সমস্যা না হয় সেটাও তারা দেখবেন-এটাও অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও মুসলমানদের সাধারণ ধর্মবোধ আহত না করে সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশে কোনো সমস্যা দেখারও কিছু নেই।

কিন্তু জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ঢাকার পলাশী মোড়ের একটি র‌্যালিতে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি অনেকের চোখে পড়েছে। অনেকের চোখে এবং কানে লেগেছে। তিনি বলেছেন, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের শত্রুরা জাতিরও শত্রু।’  তার এ বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। এই শিরোনাম অথবা এর কাছাকাছি শিরোনামই ছিল। আগে-পরে আরো কথাও তিনি ওই বক্তব্যে বলেছেন। কথা হচ্ছে, হিন্দুদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে এমন বক্তব্য দেওয়া যে, এদেশে হিন্দুদের শত্রুরা জাতিরও শত্রু- একথাটা কেমন একটু উল্টো ধরণের কথা হয়ে গেল না!  মুখে বলা হচ্ছে, দাবিও করা হচ্ছে এবং বাস্তব সত্যও এটা যে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ বিদ্যমান। এবং সম্প্রীতির এই চিত্রটি এদেশে এতোটাই উজ্জ্বল যে আশপাশের বড় দেশগুলোতেও এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই। তারপরও একটি ‘সম্প্রদায়ের শত্রু জাতিরও শত্রু’ এমন বক্তব্য তো একটি বড় রকম ভুল বার্তা তৈরি করে। তার বক্তব্য থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে গণনা করার মতো এবং আতঙ্কিত হওয়ার মতো শত্রুর সংখ্যা রয়েছে।

বাস্তবে এরকম অনুমান অথবা ধারণা কি আসলে সঠিক? তাহলে এতটা জোরালো ভাষায় ‘হিন্দুদের শত্রু জাতির শত্রু’ এমন কথা বলার কী দরকার ছিল তার!

এখান থেকে পাল্টা কিছু প্রতিক্রিয়া ও বক্তব্যও তো সামনে চলে আসতে পারে এবং আসে। তিনি একটি ‘সম্প্রদায়ের শত্রু’ কথাটা যেভাবে বললেন, সেখানে তো সংখ্যাগুরু ধর্মাবলম্বী মানুষের পক্ষ থেকেও এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, তাহলে ‘মুসলমানদের শত্রুরা’ এদেশে কার শত্রু? তারা কি তবে জাতির শত্রু নয়? নাকি এখানে মুসলমানদের কোনো শত্রুই নেই? মুসলমানদের শত্রুরা কি তাহলে এদেশে কারো কারো বন্ধু? কেউ কেউ অবশ্য বলতেই পারেন, এদেশে মুসলমানরা তো সংখ্যাগুরু, তাদের আবার শত্রু আসবে কোত্থেকে?’ বাস্তবে এমন প্রশ্ন করাটা কি সঠিক? সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে বাংলাদেশ থেকে কয়েক কোটি হিন্দু ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার যে ‘তথ্য’ প্রিয়া সাহা নামের এক  হিন্দু মহিলা উচ্চারণ করেছেন, তার এই আচরণটি কি জাতির প্রতি শত্রুতা কিংবা সংখ্যাগুরু মুসলমানদের প্রতি কোনো শত্রুতা ছিল না? চট্টগ্রামে ‘উগ্রবাদী’ হিন্দু সংগঠন ইসকনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্কুলে মুসলিম শিশুদের মাঝে খাদ্য বিতরণ করে ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ উচ্চারণ করানোর ঘটনায় কি মুসলিমদের প্রতি শত্রুতার অথবা প্রতারণার কোনো উপাদান ছিল না?

এসব প্রশ্নের জবাব কী? কে দেবেন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর? নাকি হিন্দুদের বিষয়ে নিরাপত্তাবোধ ও নমনীয়তার মাত্রা নীতিনির্ধারকদের মাঝে এতটাই প্রবল যে তাদের কারো কারো দ্বারা দেশ, জাতি অথবা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের প্রতি কোনো শত্রুতা হতে পারে এটা ধারণা করাও তারা ঠিক মনে করেন না! এমন ধারণা আমলে নেওয়াও উচিত মনে করেন না!  হতে পারে উপরতলার মানুষেরা সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রদায়ের সম্পর্ক ও শত্রুতা-মিত্রতার ব্যাপারগুলো নিয়ে গভীর কোনো ধারণা ও স্বপ্ন লালন করেন। যার সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকলেও কোন সমস্যা নেই!

ভারতে সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকারের যুগে ভারত ও তার আশপাশের দেশগুলোতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের বাতাস যে ছড়িয়ে পড়েছে, একথা তো এখন অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী সুধীজনও বলতে শুরু করেছেন। অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশেও এ উগ্রতার বিভিন্ন ছায়া দেখা যাচ্ছে। আশপাশের অন্য কয়েকটি দেশেও হিন্দু উগ্রবাদ ও আগ্রাসন চেতনার নানা বিস্তার চোখে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে ‘হিন্দুদের শত্রুরা জাতির শত্রু’ এ জাতীয় বক্তব্য দেওয়া কতোটা বাস্তবানুগ কিংবা কতোটা সময়োচিত- এ প্রশ্নটা উঠতেই পারে। হয়তো মন্ত্রী সাহেবের সামনে গিয়ে মুখের উপর এ প্রশ্নটা কেউ করবেন না । দেশে স্বচ্ছ সাংবাদিকতা ও স্পষ্ট কথার সংস্কৃতিতে এক ধরনের ধুসর সময় চলছে। তার মানে তো এটা নয় যে মানুষের মনের মধ্যেও প্রশ্নগুলো নেই এবং সংশয়গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে না।

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানদের ধর্মবিস্তার বিষয়ে সক্রিয় একটি অংশ কিংবা নানা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সশস্ত্র উপজাতিদের অংশের কথা থাকুক। এদেশে ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদী ব্লগার, অ্যাক্টিভিস্ট ও অপপ্রচারবাদী মহল সম্পর্কে তাহলে আমরা কী বলবো? তাদের দ্বারা কি মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাস আক্রান্ত বা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে না? তারা কি মুসলমানদের সাথে শত্রুতা করছে না? তাদের অনিয়ন্ত্রিত ও বিদ্বেষপূর্ণ লেখালেখি ও বক্তব্যে কি দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে না? তাহলে তারা কার বা কাদের শত্রুতা করছে? সেই ইসলাম বিদ্বেষী শত্রুরা কি জাতির শত্রু নয়? নাকি ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী মহলের দ্বারা জাতির কোনো ক্ষতি হওয়ারই আশঙ্কা নেই? এজন্যই ‘মুসলমানদের শত্রু জাতির শত্রু’ এমন কথা উপর মহলের কারো বলারই দরকার নেই ?

শুধু ‘হিন্দুর শত্রু জাতির শত্রু’ এমন স্লোগান দিয়ে যদি বিশেষ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল কিংবা দেশের ভেতরে-বাইরে বিশেষ কোনো প্রভাবশালী মহলের আনুকূল্য হাতিয়ে নেওয়া উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে আর কী কথা বলা যায়!  রাজনীতির হিসাব- নিকাশ ও অংক মিলানোর জন্যে লাইন মিলানো অনেক বক্তব্যই আসে, অনেক কিছুই চলে। বিভিন্ন যুগেই চলেছে, এখনও চলছে। এটাও কি তবে সেরকম একটি বক্তব্য?

যদি সেরকমই কিছু হয় তাহলে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু বলতে পারি, একটু খেয়াল তো অন্তত রাখা দরকার যে এজাতীয় বক্তব্যের একটা পাল্টা প্রতিক্রিয়া, একটা বিপরীত বিরক্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। আমরা শুধু এদিকটাতেই সবিনয় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

পূর্ববর্তি সংবাদনেত্রকোনায় মোটরসাইকেল চাপায় মসজিদের ইমামের মৃত্যু
পরবর্তি সংবাদএরশাদের আসনে প্রার্থী নিয়ে বিরোধ বাড়ছে পরিবারে