৫ সেপটেম্বর বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব পল্লবী মারকাযুদ্দাওয়ার হলরুমে মাসিক মুহাযারায় বয়ান করেন মারকাযুদ্দাওয়া আল ইসলামিয়া ঢাকার ফিকহ বিভাগের উস্তায মুফতি ইয়াহইয়া সাহেব। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত নবীন আলেম ও মাদরাসার তালিবে ইলম এ মুহাযারায় উপস্থিত ছিলেন। মুহাযারায় প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকগুলোর মুরাবাহা লেনদেনের উপর পর্যালোচনা করা হয়।
ষোল শতাব্দীতে শিল্প-বিপ্লবের সময় ইউরোপে যখন ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে প্রচুর পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয় তখনই আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। সঞ্চয়কারীদের টাকা জমিয়ে ক্লায়ন্টদের কাছে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে ব্যাংক তার কার্য পরিচালনা করে।
ব্যাংকিং বা অর্থ-ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তিনটি পদ্ধতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১. সুদি ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ২. সুদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ৩. ইসলামি অর্থ-ব্যবস্থা।
সুদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিষয়টি তো প্রকাশ্যই। বর্তমান সমাজে ইসলামি ব্যাংকিং-এর নামে যে সকল প্রতিষ্ঠান, ব্যবস্থাপনা বিধি হিসেবে তার অধিকাংশই আসলে কোনো উপায়ে সুদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থার কথাই বলে। পূর্ণ ইসলাম সম্মত লেনদেনে তারা আগ্রহী না।’
ব্যাংক একটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। তার জন্য ব্যবসার অনুমোদন নেই। ব্যাংক তার প্রকৃত কাজ বিনিয়োগ সম্পাদনের জন্য জনগণের অর্থ সঞ্চয় করে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইসলামি করতে হলে সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ দুটি কাজই ইসলাম সম্মত হতে হবে।
অর্থ-ব্যবস্থা ইসলাম সম্মত করতে হলে দুইপ্রকারের লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
১. মুযারাবা= একজনের মূলধন নিয়ে আরেকজন শ্রম দিয়ে ব্যবসার কার্যাদি পরিচালনা করবে। এক্ষেত্রে লাভের অংশ দুইজনে চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে নিবে। মুযারাবা কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথেও হতে পারে।
২. শিরকত= পরস্পরে চুক্তির মাধ্যমে মূলধন, শ্রম এবং লাভের অংশ নির্দিষ্ট করে লেনদেন করা। শিরকতের ক্ষেত্রে মূলধন এবং শ্রম উভয়টিতেই সবাই অংশীদার হবে।
তবে এ দুই পদ্ধতিতে লাভের পরিমাণ জানা থাকে না। ব্যবসায় উন্নতি করতে না পারলে কখনো মূলধনও গচ্ছা যেতে পারে। তাই ইসলামি ব্যাংক নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এ দুই পদ্ধতিতে তাদের কার্যাদি পরিচালনা করে না। তারা বরং কোনো উপায়ে নূন্যতম সুদবিহীন কারবার করতে চায়। সেজন্য প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকগুলোতে মুরাবাহা ( লাভের চুক্তিতে লেনদেন) পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।
একদম সীমানা ধরে হাঁটলে যেমন সীমানার ওপারে পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তেমনি কোনো উপায়ে সুদবিহীন থাকার নীতি অবলম্বন করা প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকগুলোও তাদের কোনো কোনো লেনদেনে সুদি ব্যাংকের মতো কাজ করে বসে। ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে মুরাবাহার যে পদ্ধতি প্রচলিত তা আসলে ফিকহের কিতাবাদিতে থাকা পূর্ণ শরয়ী মুরাবাহা নয়। প্রচলিত মুরাবাহার জন্য বর্তমানের ফকিহরা ‘মুরাবাহ লিল আমিরি বিশ শিরা’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। যাতে বাইয়ে ইনাহ বা তাওয়াররুয়ের পদ্ধতি অবলম্বন করে বৈধতা প্রদানের চেষ্টা করা হয়।
প্রচলিত যে মুরাবাহা, সুদি ব্যাংকের লেনদেন থেকে ভিন্নতা প্রদানের অত্যাবশ্যক পদ্ধতি সেটিও সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না অধিকাংশ সময়। চুক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায় পণ্য ক্রয়ের জন্য কেউ টাকা নিতে এলে তার সাথে যে পদ্ধতিতে লেনদেন করা হয় তাতে সে ব্যক্তি একই সাথে ব্যাংকের পক্ষ থেকে পণ্য ক্রয়ের উকিল এবং ক্রেতা থাকে। ফলাফল দেখা যায়, চুক্তি হয় কেবল রসিদের উপর। পণ্য দোকানেই থেকে যায়। ক্লায়ন্ট এসে টাকা নিয়ে চলে যায়। এ পদ্ধতিটি শরিয়ত সম্মত হওয়ার ব্যাপারটি নানা দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ।
এ পদ্ধতির ব্যাপারে পাকিস্তানের মুফতি তাকি উসমানি ব্যাংকের পক্ষ থেকেই একজন প্রতিনিধি নিয়োগের যে প্রস্তাব পেশ করেছেন তা পালন করলেও কিছুটা মুক্তি পাওয়া যেতো। কিন্তু ব্যাংক তা করে না। আমাদের মুদীর সাহেব মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ বলেন, ব্যাংক নিজের সদ্বিচ্ছার অভাবেই এটা করে না। এটা করতে খুব বড় অসুবিধে তাদের ছিল না।
প্রচলিত মুরাবাহার ক্ষেত্রে ব্যাংক আরও যে ত্রুটি করে সেটি হলো যদি ক্লায়ন্ট সময়মতো মুরাবাহা চুক্তির অর্থ আদায় না করে তাহলে ব্যাংকের সদকাহ ফান্ডে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জরিমানা করতে হয় ক্লায়ন্টকে। এক্ষেত্রে সুদি ব্যাংক থেকে কোনো পার্থক্যই দৃশ্যত থাকে না।
যদিও তাকী উসমানি সাহেব সাময়িক প্রস্তাবনা হিসেবে আরও ত্রিশ বছর আগে এ পদ্ধতি পেশ করেছিলেন তবে সারাবিশ্বের ব্যাংকগুলো এ পদ্ধতিটাকে লুফে নিয়েছে। অথচ তিনি পরীক্ষামূলক একটি পদ্ধতি হিসেবে এটি পেশ করেছিলেন।
শ্রুতিলিখন : ওলিউর রহমান
















