মাহদী হাসান ।।
সেনুসি আন্দোলনের এক মহান ইমাম মোহাম্মদ আল-মাহদি আস্-সেনুসি ওমর আল-মুখতার সম্পর্কে বলেছিলেন, “বিশ্বে নির্যাতিত মুসলমানদের বিজয়ের জন্য ওমর মুখতারের মতো শুধু দশ জন নেতাই যথেষ্ট।”
বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব জুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিজ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যে কয়জন নেতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বীরদর্পে লড়াই করে গেছেন, তাদের মধ্যে লিবিয়ার সেনুসী আন্দোলনের নেতা ওমর আল-মুখতার অন্যতম। অকুতোভয় এই বীর দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ইতালিয়ান শাসনের বিরুদ্ধে লিবিয়ান মুজাহিদদের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।
১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ইতালি দখলদাররা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০ হাজার মানুষের সামনে তার সে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরা হয়। তিনি শত্রুপক্ষের হাতে শাহাদত বরণ করেছেন, কিন্তু লিবিয়া তথা পুরো বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের কাছে অসম্ভব বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছেন।
তারপর লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় আল জাগবুব এলাকায় ভ্রমণ করেন তিনি, যা ছিল ইসলামি সংস্কার আন্দোলনের পথিকৃৎ শেখ মোহাম্মদ ইবন আলি সেনুসির এলাকা। তার কাছে আট বছর ধর্মতত্ত্ব, ইসলামিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয় অধ্যয়ন করেন ওমর মুখতার। এ সময় তিনি শেখ মাহদি সেনুসির কাছেও কিছু দিন অবস্থান করেন। ১৮৯৭ সালে শেখ মাহদি তাকে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাওইয়াত আল কুসুরের গভর্নর নিয়োগ করেন। সেখানে তার প্রজ্ঞা, ন্যায়পরায়ণতা এবং বিবাদ মীমাংসায় সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়ই তিনি সিদি ওমর নামে পরিচিতি লাভ করেন, মূলত শেখ ও পণ্ডিতদেরই এ উপাধি দেয়া হতো।
এরপর মুখতার সুদান গিয়ে কয়েক বছর শেখ মাহদি সেনুসির ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে মুখতার আবারো জাওইয়াত আল কুসুরের গভর্নর নির্বাচিত হন। সে সময় ওসমানীয় সাম্রাজ্য লিবিয়া শাসন করত। তবে একপর্যায়ে তিনি ধর্মীয় পণ্ডিত বা গভর্নর থেকে পাল্টে পরিণত হন উপনিবেশবিরোধী এক প্রতিরোধ সৈনিকে।
একের পর এক লড়াই করে যান ব্রিটিশ, ফ্রান্স ও সবশেষে ইতালিয়ান ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। ব্রিটিশ সৈন্যদের বিরুদ্ধে তিনি প্রথম লড়াইয়ে নামেন যখন তারা লিবিয়া ও মিসর সীমান্তে সেনা মোতায়েন করে। ১৯০০ সালে ফ্রান্সের বাহিনী দক্ষিণ সুদান ও শাদে হামলা চালাতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন মুখতার। ১৯১১ সালে ইতালি ওসমানীয় বাহিনীতে যোগ দেয়ার আগে মুখতার জাওইয়াত থেকে এক হাজার যোদ্ধা নিয়ে ওসমানীয় সেনাদলের জন্য পাঠান। তখন তাকে ‘শেখ অব দ্য মুজাহিদীন’ উপাধি দেয়া হয়।
১৯১২ সালে রোম লিবিয়াকে ইতালির উপনিবেশ বলে ঘোষণা দেয়। পরবর্তী ২০ বছর আল মুখতার ইতালির ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। ওমর আল মুখতারের গেরিলা হামলার মুখে ইতালি অনেক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯১৩ সালে লিবিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দার্নাতে দুই দিনব্যাপী যুদ্ধে ৭০ জন ইতালীয় সেনা নিহত ও শতাধিক সেনা আহত হয়েছিল।
১৯৩১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইতালিয়ান বাহিনীর সাথে লড়াইয়ের সময় এক ব্যক্তি তাকে সিদি ওমর বলে সম্বোধন করে ওঠলে শত্রুরা তাকে চিনে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তিন দিন পর ১৪ সেপ্টেম্বর গ্রাজিয়ানি বেনগাজিতে পৌঁছেন এবং ওমর মুখতারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০ হাজার মানুষের সামনে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়।

বিচার চলাকালে ইতালির কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, তিনি যদি তার মুজাহিদদের অস্ত্র পরিত্যাগের আহ্বান জানান, তাহলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। সে সময় মুখতার তার বিখ্যাত উক্তিটি করেন, ‘আমার শাহাদাত আঙুল যেটি প্রতিদিন সাক্ষ্য দেয়- আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রভু নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রাসূল, সেই হাত দিয়ে কোনো মিথ্যে কথা বা শব্দ লেখা সম্ভব নয়। আমরা আত্মসমর্পণ করব না। আমরা জয়ী হবো, নচেৎ আমরা শহীদ হবো।’
১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বেনগাজি থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে এক ফাঁসির মঞ্চে হাতবাঁধা অবস্থায় তাকে আনা হয়। তিনি তখন নির্বিকার ও অবিচল চিত্তে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করছিলেন। ২০ হাজার মানুষকে সেখানে জোরপূর্বক উপস্থিত করা হয়।
ওমরকে ফাঁসি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইতালিয়ানরা সেনুসি আন্দোলন এবং লিবিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম দমন করতে সক্ষম হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ওমরের নামই শ্রদ্ধা সহকারে স্বর্ণের অক্ষরে লিখে রেখেছে। গ্র্যাজিয়ানি সহ ইতালিয়ান জেনারেলদের নামই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গ্র্যাজিয়ানি সহ অনেকেরই যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার এবং শাস্তি হয়েছে। অন্যদিকে ওমর আল-মুখতার পরিণত হয়েছেন শুধু লিবিয়া না, পুরো আরব এবং মুসলিম বিশ্বের সংগ্রামের প্রতীকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫১ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় লিবিয়া যখন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন লিবিয়া যুক্তরাজ্যের রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন ইদ্রিস আল-সেনুসি। কিন্তু ইদ্রিসের শাসনামলে ওমর আল-মুখতারের অবদানকে যথেষ্ট সম্মান করা হয়নি। ১৯৬৯ সালে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন তরুণ ক্যাপ্টেন মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফী ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি পুনরায় ওমর আল-মুখতারকে জাতীয় বীর হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরেন।
গাদ্দাফী ক্ষমতা দখল করেন ১ সেপ্টেম্বর। কিন্তু তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ দেন ১৬ সেপ্টেম্বর, ওমর আল-মুখতারের শাহাদাত দিবসে। এবং ভাষণটি তিনি দিয়েছিলেন বেনগাজীতে ওমর আল-মুখতারের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে। গাদ্দাফী ওমর আল-মুখতারের ইতালি বিরোধী যুদ্ধের নেতৃত্বকে জনগণের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে নিজের পশ্চিমাবিশ্ব বিরোধী অবস্থানকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন।
ওমর আল-মুখতারের নাম লিবিয়ার প্রতিটি জায়গায় ছড়িয়ে আছে। লিবিয়ার ১০ দিনারের নোটে তার ছবি আছে। আল-বেইদাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার নামে। এছাড়াও ত্রিপলী সহ বিভিন্ন স্থানে তার নামে বিভিন্ন রাস্তা, গ্রাম এবং মসজিদের নাম আছে। শুধু লিবিয়া না, ওমর আল-মুখতারের নামে রাস্তা আছে মিসর, তিউনিসিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, জর্ডান, ফিলিস্তিন সহ আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাতেও ওমর আল-মুখতারের নামে একটি মসজিদ আছে।

২০১১ সালে গাদ্দাফী বিরোধী বিদ্রোহ শুরু হলে বিদ্রোহীরা ওমর আল-মুখতারের ছবি ব্যাপকভাবে তাদের প্রচারণায় ব্যবহার করে। ওমর আল-মুখতারের বিখ্যাত উক্তি “আমরা আত্মসমর্পণ করব না, আমরা বিজয় লাভ করব, অথবা মৃত্যুবরণ করব।” বিদ্রোহীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই উক্তি সহ ওমর আল-মুখতারের ছবি সম্বলিত ব্যানার এবং বিলবোর্ডে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো ছেয়ে যায়। এ সময় ওমর আল-মুখতারের একমাত্র জীবিত বংশধর, তার ছেলে মোহাম্মদ আল-মুখতারও বিদ্রোহীদের পক্ষে তার সমর্থন ব্যক্ত করেন।
গাদ্দাফীর মৃত্যুর পর লিবিয়ার পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত সহ সবকিছু আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেলেও ওমর আল-মুখতারের প্রতি লিবিয়ানদের শ্রদ্ধা আগের মতোই আছে। তিনি সকল প্রকার রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে। যতদিন লিবিয়া থাকবে, যতদিন আরব বিশ্ব থাকবে, যতদিন বহিঃশক্তির আগ্রাসন এবং তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থাকবে, ততদিন পর্যন্ত ওমরের স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে অটুট থাকবে।
















