ওয়ারিস রব্বানী ।।
রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবে অভিযান চালিয়ে জুয়ার বোর্ড পাওয়া গেছে। এসব যান্ত্রিক জুয়ার আয়োজনকে বলা হয় ক্যাসিনো। দুনিয়াজুড়ে ক্যাসিনোর জন্য কুখ্যাত শহর হচ্ছে আমেরিকার লাস ভেগাস। নানা রকম যান্ত্রিক চাকতি, গুটি ও বোর্ডের মাধ্যমে এ জাতীয় জুয়ার আয়োজন চলে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কয়েকটি ক্লাবে পাওয়া গেছে এই যান্ত্রিক জুয়া বা ক্যাসিনোর আয়োজন। খবর এসেছে, এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগের নেতাদের পরিচালনা ও পৃষ্ঠপোষকতা। যুবলীগের একজন ডাকসাইটের নেতাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে সেদিন। দুদিন পর শুক্রবার গ্রেফতার করা হয়েছে আরও একজন তুখোড় ‘বিত্তবান’ নেতাকে।
একদিনে (১৮ সেপ্টেম্বর) র্যাব প্রায় চারটি ক্লাবে অভিযান চালিয়ে শতাধিক লোককে গ্রেফতার করেছে। মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে এ অভিযানের খবর প্রচার হয়েছে। জুয়ার সঙ্গে মদ, কথাটা শব্দের পর শব্দ সাজানোর মতো চলে আসে। বাস্তবেও দেখা গেছে, এইসব জুয়ার আসর থেকে সারি সারি বিদেশী মদের বোতল উদ্ধার হয়েছে। জুয়া আর মদের এই আয়োজনের পেছনে যেহেতু যুবলীগের বড় নেতাদের পরিচালনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেছে, তাই যুবলীগের চেয়ারম্যান অভিযানের রাতেই তীব্র ভাষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। হুমকি-ধমকিও দিয়েছেন। আগে থেকে না ফিরিয়ে হঠাৎ কেন জুয়ার এসব আসরের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলো- এনিয়ে প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ক্ষমতার রাজনীতিতে জুয়া, মদ, মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি কয়দিন ধরে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এখন এগুলোই টক অব দ্যা কান্ট্রি। ছাত্রলীগের বিদায়ী সভাপতি- সাধারণ সম্পাদকের দুর্নীতি -চাঁদাবাজির খবর ও তাদের বরখাস্ত করার পর যুবলীগের এইসব ক্যাসিনো কাণ্ড রাজনীতির তরুণ অঙ্গনে ছড়িয়ে দিয়েছে বিষাক্ত দুর্গন্ধ। তোলপাড় চারদিকে। কীভাবে এগুলো শুরু হলো, কেন এতদিন চলতে পারলো, কেনই বা তাদের এখন ধরা-ধাওয়া চলছে-এসব প্রশ্ন ঘুরছে বাতাসে।
ফকিরাপুলের একটি ক্লাব- ক্যাসিনোতে আবার চেয়ারম্যান হিসেবে ছবি ও নাম এসেছে বাংলাদেশের পরিচিত বাম রাজনীতিক সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপির। নীতি- নৈতিকতা নিয়ে বামেরা গলার স্বর সবসময় উঁচু রাখেন। ত্যাগ, বৈরাগ্য, ভোগ বিরোধিতা ও আর্থিক সততার কথা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলতেও পছন্দ করেন। সেইরকম রাজনীতির পুরোধা হচ্ছেন এই মেনন। ক্যাসিনোর সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে যাওয়ায় রাজনীতির উপর-নিচে চলছে নানারকম মুখরোচক জল্পনা।
প্রথমে বলা হয়েছিল, ঢাকায় প্রায় ৬০ টির মতো ক্যাসিনো রয়েছে। সবগুলোতেই অভিযান চলবে। কিন্তু বুধবার রাতের পর এজাতীয় অভিযান আর চলতে দেখা যায়নি। এর মধ্যেই খবর পাওয়া গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যার পর আবার রাজধানীর কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের চারপাশে ভিড় করেছে র্যাব। কেউ বলছেন ক্যাসিনোর অন্য কারিগরেরা সতর্ক হয়ে সরে পড়েছে। কেউ বলছেন, যুবলীগ চেয়ারম্যানের ক্ষুব্ধতা প্রকাশের পর এজাতীয় অভিযান বড় আকারে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বৃহস্পতিবার বলেছেন, সব অবৈধ ব্যবসা- বাণিজ্যের বিরুদ্ধেই অভিযান চলবে। তিনি অবশ্য এ-ও বলেছেন, মদের বার চালাতে ও জুয়ার ব্যবসা করতে সরকারের অনুমতি লাগে। এই অনুমতি ছাড়া এ জাতীয় ব্যবসা চলতে দেওয়া হবে না। এ কথার একটা অর্থ এটা দাঁড়ায় যে, অনুমোদনের নামে প্রশাসনকে জানিয়ে ট্যাক্স- ভ্যাট আদায় করে যুবলীগের নেতাই হোক, কিংবা প্রভাবশালী অন্য কেউ হোক, এমন ব্যবসা করলে কোনো অসুবিধা নেই।
দুইদিন পর ২০ সেপ্টেম্বর সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং অ-মন্ত্রী একজন মুখপাত্র নেতা বলেছেন, এজাতীয় জুয়াবাজির আয়োজন আসলে শুরু হয়েছে বিএনপি’র আমলে। যুবলীগের নেতাদের চালানো ক্যাসিনো তোলপাড়ের পর মন্ত্রী ও নেতার এমন বক্তব্যে গণমাধ্যমগুলোর কমেন্ট বক্সে হাস্যরসাত্মক মন্তব্যের জোয়ার বইছে। দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন, গণতন্ত্র, উন্নয়ন, দুর্নীতি ইত্যাদি শব্দ ও ইস্যুর পর নতুন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গসংগঠনের কোটিপতি তরুণদের ক্যাসিনো কাণ্ড। রাজনীতিতে জুয়া ও মদ নতুন এক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
কেউ কেউ ঢাকাকে লাসভেগাসের সাথে তুলনা করে এখন রসিকতাও করছেন। কেউ কেউ বলছেন, গত কয়েক বছরে যুবক রাজনীতিকদের হাতে নানাভাবে এত টাকা পয়সা এসেছে যে অন্য ব্যবসা বাদ দিয়ে এখন জুয়া খেলার টেবিলে বাতাসে টাকা উড়িয়ে দেওয়ার জন্য শত শত যান্ত্রিক টেবিল সক্রিয় করে তোলা হয়েছে। মান্ধাতার আমলের তাস পিটিয়ে জুয়া খেলার দিন শেষ! অনেক টাকা, অনেক খেলা তো, এসব সামলাতেই মেশিন বসানো হয়েছে।
দেশের রাজনীতির গায়ে সুখ- অসুখের আলামত নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন। কিন্তু রাজনীতি ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনার অর্থনীতি থেকে গড়ে ওঠা এই জুয়ার টেবিল নিয়ে আগে কোনো কথা উঠেনি। গণমাধ্যম ও প্রশাসনের করিৎকর্মা লোকেরাও কোনো কথা উঠায়নি। একবার শুধু প্রবীণ মরহুম এক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, রাজনীতি এখন বাজিকরদের হাতে আটকে পড়েছে। এ কথা নিয়ে তখন বেশ তোলপাড়ও হয়েছিল। তিনি তখনও ক্যাসিনোর কথা জানতেন না। বাজিকর শব্দটি অন্য অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। এখন তো বাজিকর, জুয়াবাজ ও ক্যাসিনো পরিচালনা একটি জ্বলজ্যান্ত ঘটনা।
নানামাত্রিক সুখ- অসুখের সঙ্গে এই জুয়া ও ক্যাসিনো কান্ড রাজনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। নীতি-নৈতিকতা, বৈধতা-অবৈধতা এখন বিভিন্ন রকম সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত হয়। আপেক্ষিকতায় ঢাকা পড়ে যায় সততা- অসততার অনেক আপ্তবাক্য। এর মধ্যে মেশিনে চলা এই জুয়ার টেবিল বিনোদন পাগলদের মধ্যে নতুন কোনো হজমশক্তি তৈরি করবে কিনা, নতুন কোনো ভোগের সংস্কৃতি দাঁড় করাবে কি না, এটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
















