একটি জানাযা ও আমাদের জন্য কিছু শিক্ষা

তারিক মুজিব ।।

মিরপুর ১৩-এর কেন্দ্রীয় মসজিদে যোহরের নাম্যের জন্য গেলাম। তিনমাস যাবত যোহরের নামায মাঝেমাঝেই এই মসজিদে পড়া হয়। তখন ১টা বেজে পাঁচ মিনিট। নামাযের আরও দশ মিনিট বাকি। সুন্নত পড়া হয়নি। তাই একটু আগে যাওয়া। কিন্তু দু’তলা মসজিদের নীচতলা, উপরতলা রীতিমত ভরে আছে। বারান্দায়ও জায়গা খালি নেই। পাশের দারুল উলূম মাদরাসার মাঠেও দেখলাম মুসুল্লিরা দাঁড়িয়ে আছে। মনে পড়লো ঘন্টাখানেক আগে মুআযযিন মাইকে ঘোষণা করেছিলেন নামাযের পর জানাযা আছে।

আলফাজ হোসেন শাওন। লোকজনের সাথে আলাপ করে জানলাম, মিরপুর ১৩- এর বাসিন্দা। ২১ বছরের যুবক। মধ্যবিত্ত ঘরের মেধাবী সন্তান। মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিকে ঈর্ষণীয় ফলাফল করে কোনো ভার্সিটিতে বিবিএ পড়ছিল। তাকে নিয়ে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল।

আমি একটা বিষয় খেয়াল করলাম যে, নিয়মিত মুসল্লিদের বাইরে আজ যারা নামায পড়তে এসেছে তাদের প্রায় সবাই যুবক। বন্ধুর জানাযা এবং দোয়ায়ে মাগফিরাতে শরিক হতে দূর-দূরান্ত থেকে এসেছে। জানাযার পর লাশ যখন দাফনের জন্য নেওয়া হচ্ছিল তখন দেখলাম প্রায় আড়াই থেকে তিনশত নওজোয়ান ছেলে। দুইজন জানাল, তারা ফার্মগেইট, শনির আখড়া থেকে এসেছে।

মধ্যবিত্ত ঘরের ২১ বছর বয়সী একটি ছেলের জানাযায় এত মানুষের উপস্থিতি বিশেষত বন্ধুর দোয়ায়ে মাগফিরাতের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে যুবক ছেলেদের আগমন আমাকে আপ্লুত করল। মরহুম শাওনের ব্যাপারে জানতে আগ্রহ হল।

এলাকার একজন জানাল, ছেলেটি ছিল সৎ, ভদ্র, মেধাবী। নিয়মিত নামায আদায় করত। বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক ছিল। তাদের বিপদে পাশে দাঁড়াত। তবে কখনোই অযথা আড্ডাবাজি করত না।

জানাযার আগে ঋণ পরিশোধ ও নিয়ম রক্ষার কিছু কথা বলার জন্য শাওনের বাবা দাঁড়ালেন। সন্তান হারানো পিতার স্বভাবতই যে কষ্ট সে কষ্ট থেকে তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। তার কণ্ঠ বারবার রুদ্ধ হয়ে আসছিল। কোমলপ্রাণ মুসুল্লিদের অনেককেও দেখলাম চোখের পানি মুছছেন। আমি মনে মনে বলছিলাম, যে ছেলের জানাযার দিন মসজিদ থাকে ভরপুর, বন্ধুদের মাঝে যে ছেলের এমন ইতিবাচক প্রভাব যে, তার জানাযায় শরিক হতে যাত্রাবাড়ি থেকে বন্ধুরা আসে সে ছেলের জন্য কান্না কেন!

শাওনের জানাযা উপলক্ষে আড়াইশো তিনশো যুবক ছেলের মসজিদে উপস্থিতি দেখে আমার বারবার রাসূলের একটি হাদিস মনে পড়ছিল, كل مولود يولد علي الفطرة প্রতিটি মানব শিশুই খোদাপ্রদত্ত ‘ফিতরাত’-এর জন্মগ্রহণ করে। এরপর পরিবেশ, প্রতিবেশ তাকে প্রভাবিত করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন, فطرة الله التي فطر الناس عليها

শাওনের জন্মও স্বভাবজাত ফিতরাতের উপরই হয়েছিল। তবে তার পরিবেশ পুরোটাই তার অনকূলে ছিল না। কিন্তু সে বন্ধুদের নেতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত হয়নি। বরং বন্ধুদের সে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে। হাবিব নামে তার এক বন্ধু বলল, ‘ওর সাথে থাকলে নামায পড়া লাগত’।

পূর্ববর্তি সংবাদসকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি আদায় করতে হবে: পীর সাহেব মধুপুর
পরবর্তি সংবাদকলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি কৃষক লীগ নেতা ফিরোজ ১০ দিনের রিমান্ডে