পটিয়ার মুফতি আযীযুল হক রহ: ইলম ও আধ্যাত্মিকতার উজ্জ্বল নক্ষত্র

মুহাম্মদ মামুনুর রশীদ।।

আল্লাহ তা’য়ালার একান্ত অনুগ্রহ ও দয়ায় সবুজ শ্যামল বাংলার বুকে যুগে যুগে ক্ষণজন্মা কিছু ফেরেশতাতুল্য মহামনীষীদের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের স্বর্ণশিকলের একটি কড়ি হল কাঁটাবিহীন ফুল স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আধ্যাত্নিক সাধক, কুতুবে যামান আল্লামা মুফতি আযীযুল হক রহ.। আল্লাহ প্রেম, খোদাভীতি, দুনিয়া বিমুখতা, সহজ সরল পাঠদান পদ্ধতি, দায়িত্বের প্রতি আন্তরিকতা, শ্রুতিমধুর তিলাওয়াত প্রভৃতি মহৎ ও উন্নত গুনাবলির কারণে ছাত্র ও ভক্তদের অন্তরে চিরভাস্বর হয়ে আছেন তিনি।

প্রচার বিমুখ এই মহান সাধক ১৩৩২ হিজরীতে পটিয়া থানার অন্তর্গত চরকানাই গ্রামে মুন্সি বাড়ির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রা: এর বংশধর মরহুম মাওলানা নুর আহমদ সাহেব হলেন তার সম্মানিত পিতা। এগারো মাস বয়সে তিনি পিতৃহারা হন আর এগারো বছর বয়সে মাতৃহারা হন।

তার দাদা মুন্সি সূরত আলী সাহেব ছিলেন একজন বড় মাপের বুযুর্গ। বালক আযীযুল হকের প্রখর ধীশক্তি ও গুনগত মেধা দেখে কোন কোন আত্মীয় তার দাদাকে এ বলে পরামর্শ দেন যে, ছেলেটা অত্যন্ত মেধাবী। তাকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষিত করলে একজন সফল ‘জজ’ হয়ে গোষ্ঠির সুনাম অর্জন করবে। জবাবে মুন্সি সাহেব বললেন, “আমার আখেরাতের ‘জজ’ দরকার, দুনিয়ার ‘জজ’ নয়।”

১৩৩৩ হিজরী। দাদা তাকে প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল জামিয়া আরাবিয়া জিরি মাদরায় ভর্তি করান। তার মাঝে খোদাপ্রদত্ত বিস্ময়কর মেধা দেখে মাদরাসার মোহতামিম ও শায়খুল হাদীস আল্লামা আহমদ হাসান রহ. অত্যন্ত স্নেহ ও যত্ন সহকারে তার শিক্ষা-দীক্ষার বিশেষ তত্ত্বাবধান করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বালক আযীযুল হক অসাধারণ মেধাবী হিসাবে মাদরাসায় পরিচিতি লাভ করেন।

বর্তমানে আল জামিয়া আরবিয়া জিরি মাদরাসা।

মুফতি সাহেব হুজুর ছাত্রজীবন থেকেই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সময়ানুবর্তি ছিলেন। অধ্যয়ন, অধ্যাবসায় ও জ্ঞানচর্চায় ছিলেন ব্যতিক্রমী। বিগত ও পরদিনের সবক মুতালাআ ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। মাদরাসা থেকে বাড়ি বা অন্য কোন স্থানে যাওয়ার সময় বই-পস্তুক অথবা কোন নোটবই সাথেই রাখতেন। তা পড়তে পড়তে পথ চলতেন। সুযোগ পেলেই কিতাব পড়তে বসে যেতেন। কিতাব পড়ায় এমন নিমগ্ন থাকতেন যে, কখনো কখনো পথও ভুলে যেতেন। অন্যান্য সাথীরা যখন অলসতায় সময় নষ্ট করতো তখনও তাকে কিতাব অধ্যয়নে মগ্ন দেখা যেত।

একবারের ঘটনা। মুফতি সাহেব রহ. দিনের বেলায় জিরি মাদরাসার মোহতামিম ও শায়খুল হাদীস আহমদ হাসান রহ.-এর কামরায় বসে কিতাব মুতালাআ করছিলেন। এমন সময় আকাশ দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে যাচ্ছিল। আর এটাই ছিল বাংলাদেশের আকাশে সর্বপ্রথম হেলিকপ্টারের আসা। ছাত্র-শিক্ষক সবাই হেলিকপ্টার দেখতে চলে যায়। কিন্তু মুফতি সাহেব যাননি। আহমদ হাসান রহ. এসে তাকে কিতাব অধ্যয়নে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি হেলিকাপ্টার দেখতে যাওনি? মুফতি সাহেব উত্তর দিলেন “আমি এখানে হেলিকাপ্টার দেখতে আসিনি।” এটা শুনে আহমদ হাসান রহ. আনন্দে চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। এর পর থেকে মুফতি সাহেবের প্রতি তার মুগ্ধতা আরো বাড়তে থাকে।

উস্তাদদের প্রতি মুফতি সাহেবের আনুগত্য ছিল নজিরবিহীন। মুফতি সাহেব রহ. যে বছর জিরি মাদরাসায় মেশকাত পড়েন সে বছর মাদরাসার মোহতামিম আহমদ হাসান রহ. এক ঐতিহাসিক ঘোষণা করলেন যে, আগামী বছর দাওরায়ে হাদীস শুরু হবে। সুতরাং মেশকাতের ছাত্রদের এখানেই পড়তে হবে।

সাধারণত ছাত্রদের আগ্রহ থাকে দাওরায়ে হাদীস প্রাচীনতম কোন প্রতিষ্ঠানে সমাপ্ত করার। তাই একে একে সবাই হিন্দুস্তান চলে যেতে লাগল। কিন্তু মুফতি সাহেব রহ. সকল আবেগ-অনুভূতি ও উদ্যোম স্বীয় উস্তাদের ইচ্ছার সামনে জলাঞ্জলি দিলেন। আনুগত্যের মূর্তপ্রতিক বনে মাদরে ইলমি জিরি মাদরাসায় দাওরায়ে হাদীস পড়েন।

মুফতি সাহেব বলতেন, “আমি কিতাব পড়ে এবং বুঝে কী করব। ‍যদি শিক্ষকের মন জয় করতে পারি তাহলেই বেশি উপকৃত হব। শিক্ষকদের মনক্ষুণ্ন করে কোন কাজেই স্বার্থকাতা অর্জন করতে পারবো না।” আনুগত্যের এই অতুল দৃষ্টান্তের কারণেই হয়তো তিনি এত বড় হয়েছিলেন।

১৩৪৩ হিজরি। দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করে আরো উচ্চ শিক্ষার জন্য ভারত যান। উপমহাদেশের অন্যতম দ্বীনী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ এবং মাযাহেরুল উলুম সাহারানপুর মাদরাসায় হাদীস, দর্শন, ফিকহ ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করেন। ১৩৪৪ হিজরিতে বিংশ শতাব্দীর মুজাদ্দীদ হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. এর সাহচর্যে প্রায় নয় মাস আধ্যাত্মিকতার চর্চা করে দেশে ফিরে আসেন।

পটিয়া মাদরাসার মসজিদ।

১৩৪৫-১৩৫৯ হিজরি পর্যন্ত মাদরে ইলমি জিরি মাদরাসায় মুফতি ও মুফাসসিরের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ইতিমধ্যে ১৩৫৭ হিজরিতে স্বীয় মুর্শিদ শায়খুল মাশায়েখ আল্লামা জমিরুদ্দীন রহ. (হাটহাজারীর বড় মাওলানা সাহেব রহ.) এর পৃষ্ঠপোষকতায় পটিয়ায় ‘জমিরিয়া কাসেমুল উলুম’ নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যা পরবর্তি সময়ে আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ায় (ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়) রূপ ধারণ করে। বর্তমানে এই নামেই মাদরাসাটি সারা বিশ্বে পরিচিত। তিনি আজীবন মাদরাসাটি পরিচালনা করেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে।

খোদায়ী ইশারায় পটিয়া মাদরাসায় দারুল হাদীসের উদ্বোধন: মুফতি সাহেব রহ. বলেন, বন্ধু-বান্ধব দাওরায়ে হাদীস চালু করার অনুরোধ করে বলেন, প্রতি বছর যথেষ্ঠ ছাত্র মেশকাত পাঠ শেষ করছে। তাদের দাওরায়ে হাদীস ক্লাশ চালু করা উচিত। কিন্তু আমি নিজের অযোগ্যতা ও হাদীস শাস্ত্রের বিশুদ্ধ গ্রন্থ এবং সহায়ক ব্যাখ্যা গ্রন্থের অভাব দেখিয়ে তাদের অনুরোধ আমি প্রত্যেখ্যান করে চলেছি।

একরাত আমি স্বপ্ন দেখলাম যে, অযু করতে বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে। যার কারণে নামাজে শরিক হতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। আল্লামা ইবরাহীম বলিয়াভী রহ. সে সময় হাটহাজারী মাদরাসার শায়খুল হাদীস ছিলেন। আমি তার নিকট স্বপ্ন বর্ননা করলে উত্তরে তিনি বলেন, “দাওরায়ে হাদীসের ক্লাশ চালু করে দেওয়া চাই।” এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমার ও মনে হয়েছে যে, নাহু-ছরফসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়াবলির পাঠদানে সময় বেশি ব্যয় হচ্ছে। আর হাদীসের খেদমত শুরু করতে বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাই আল্লাহর তরফ থেকে হুঁশিয়ারি এসেছে।

কিন্তু আমি নিজের অযোগ্যতা প্রসূত দূর্বলতার অনুযোগ করলে, বলিয়াভী রহ. বলেন, “সাহসহীনতার কোন কারণ নেই। আমি নিজে গিয়ে উপস্থিত হয়ে দাওরায়ে হাদীসের ক্লাশ শুরু করবো।” অবশেষে তাই হলো। দশ-বারো জন ছাত্রকে নিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল মাকুল ওয়াল মানকুল আল্লামা ইবরাহীম বলিয়াভী রহ. দাওরায়ে হাদীসের ক্লাশ শুরু করে দিলেন।

মুফতি সাহেব রহ. একাধারে ফিকাহবিদ, আরবি, উর্দূ ও ফার্সি ভাষার সুদক্ষ লেখক ও কবি, ইলমে দ্বীনের মহীরুহ এবং আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ‍ছিলেন। তিনি বক্তৃতার ময়দানে ছিলেন আলোড়ন সৃষ্টিকারী বক্তা, লেখালেখির ময়দানে ছিলেন সফল লেখক, পরিচালনার ক্ষেত্রে ছিলেন অভূতপূর্ব দক্ষ কারিগর।

মাকবারায়ে আযীযী।

আধ্যাত্নিক জগতের এ মহান ব্যক্তিত্ব ১৩৮০ হিজরি মোতাবেক ১৯৬১ ইং সনের ১৫ রমজান ইহধাম ত্যাগ করেন। তাকে মাকবারায়ে আযীযীতে দাফন করা হয়।

তার রেখে যাওয়া শিক্ষা-দীক্ষা ও অনুসারিত পথ অবলম্বন করে এবং তার রুহানী তাওজ্জুহকে সম্বল বানিয়ে এদেশের মুসলিম সমাজ পেতে পারে পার্থিব বিকাশ ও মুক্তির পথ, পরকালীন শান্তির পাথেয়।