সিলেট সফরে রাতের ডিনার

মুহাম্মাদ আদম আলী ।।

‎সোনার তরী। আবাসিক হোটেল। হবিগঞ্জ শহরে খুব বিখ্যাত। এশার পর ‎ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। হযরত এখানে এক রাত থাকবেন। ‎তিনটি এসি রুম আগেই ঠিক করা ছিল। সফরসঙ্গীদের আরামের দিকে ‎‎খেয়াল রেখে মেজবান সবরকমের আয়োজনই করেছেন। মাগরিবের পর ‎চুনারুঘাটে প্রোগ্রাম ছিল। হযরত কোথাও দ্বীনি মজলিস করে খাওয়া ‎পছন্দ করেন না। এজন্য ডিনার এখনো করা হয়নি। আমি হযরতের জন্য ‎একটা বড় রুম ঠিক করে দিলাম। কিন্তু সে রুমে আমার থাকা হয়নি। ‎একজন বয়স্ক মুরব্বী থাকাতে আমি আর সুযোগ পাইনি। এখন খাবারের ‎ব্যবস্থা করতে হবে। এখানকার মেজবান দুজন। ইঞ্জিনিয়ার শাহনেওয়ায ‎সাহেব এবং ইঞ্জিনিয়ার রফিক সাহেব। আমি তাদের নিয়ে বের হলাম। ‎

হবিগঞ্জ ছোট শহর। খুব বেশি ভালো হোটেল এখনো গড়ে ওঠেনি। আর ‎এখন রাত বেড়ে যাওয়াতে ক্লান্তিও বেড়েছে। বাইরে কোথাও যেতে ইচ্ছে ‎করছে না। এই হোটেলে একটা রেস্টুরেন্ট আছে। গ্লাস ঘেরা এন্ট্রি। মনে ‎হয় চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। ভেতরে আলোআঁধারি পরিবেশ। হযরত এ ‎পরিবেশ পছন্দ করেন না। আলোর সাথে আঁধার থাকা সম্ভব না। এখানে ‎আছে। ডিম তালে আলো জ্বলে। আর ক্যাসেট প্লেয়ারে গান বাজতে ‎‎থাকে। এই হলো আলো আর আঁধার। খাবার খাওয়া একটি ইবাদত। ‎এখানে সেটাতে ভেজাল মিশিয়ে আমল করা হয়। আমাদের সব কাজই ‎এমন ভেজালে ভরে গেছে। পণ্যে যেরকম ভেজাল, আমাদের ‎মানসিকতায়ও ভেজালে সয়লাব। এগুলো খেয়ালও করা হয় না। আমরা ‎‎রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। খাবারের মেন্যু ঠিক হলো। ভাত আর মুরগী। সাথে ‎ডাল-ভাজি। প্রায় দশজনের খাবার । বানাতে সময় লাগবে। অর্ডার দেওয়া ‎হলো। একটু পর হযরত এলেন।‎

হযরত প্রতিটি কাজ হিসেব করেই করেন। আমল বানিয়ে করেন। যারা ‎কাছে থাকেন, তাদেরও একই ধারায় চলতে হয়। ইচ্ছেমতো কিছু করার ‎সুযোগ থাকে না। পুরোপুরি মানতে পারলে বরকত চোখে দেখা যায়। ‎আমার এখনো সে সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি। হযরতকে কত যে কষ্ট দিয়েছি! ‎খাবার খাওয়া তখনো শেষ হয়নি। হঠাৎ এক ভদ্রলোক এলেন। সিলেটী। ‎কথায় পরিষ্কার আঞ্চলিক ছাপ। খুব বেশি আঞ্চলিক হলে কথা বোঝা যায় ‎না। তার কথা বোঝা গেল। তিনি হযরতের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু ‎বলবেন মনে হয়। প্রথমে সালাম দিলেন,‎

‘আসসালামু আলাইকুম’

হযরত জবাব দিলেন।, ‘ওয়াআলাইকুমুসসালাম।’

‘আমি এখানেই থাকি। আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি আজকে ‎আপনাদের খাবারের বিলটা পরিশোধ করতে চাচ্ছি।’ ‎

আমি খুব অবাক হলাম। অপরিচিত একজন খাবারের বিল দিতে চাচ্ছে। ‎ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত।‎ কোনো‎ গায়েবী সাহায্য কি না, ভাবতে লাগলাম। ‎কিন্তু যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে গায়েবী সাহায্য কেউ আশা করে ‎না। এমনিতে হযরত পরিচিতদেরই খাবারের বিল দিতে দেন না। ‎‎সেখানে একজন অপরিচিতকে হযরত কী বলবেন! নিশ্চয়ই খুব ‎কড়াভাবে তাকে না করে দিবেন। হযরত এমন কিছু বললেন না। খুব ‎‎স্বাভাবিকভাবে তিনি বললেন, ‎

‘আজকে তো বিল দেওয়ার অনুমতি দিতে পারব না।’ ‎

‘কেন?’

‘আমি আরেকজনকে ইতিমধ্যে বিল দেওয়ার অনুমতি দিয়ে দিয়েছি।’

‘আমি বিলটা দিতে পারলে খুব খুশী হতাম। হযরত, একটু সুযোগ ‎দিবেন?’

‘আমি যাকে বিল দিতে বলেছি, তাকে এখন না করব কীভাবে? তাকে ‎আর না করা সম্ভব না।’

অগত্যা ভদ্রলোক আর অনুমতি পেলেন না। আবার এলে কখনো বিল ‎দিবেন, এই আশায় বিদায় নিলেন। এখন আমরা একে অপরের দিকে ‎তাকাচ্ছি, হযরত কাকে বিল দেওয়ার অনুমতি দিলেন? কেউ কিছু ‎বলতে পারল না। ‎

খাবার খাওয়া শেষ হয়েছে। টেবিলে টুথপিক আর ভাজা ধনিয়া দেওয়া ‎হয়েছে। সাধারণত ধনিয়ার সাথে বিলটাও আসে। আসেনি। বিল এখনো ‎তৈরি হয়নি। হযরত চুপচাপ বসে আছেন। আমি সবাইকে দেখছি। যে ‎বিল দিবে, সে তো একটু দৌড়ঝাঁপ করবে। কারও মধ্যে ওঠার‎ কোনো‎ ‎তাড়া নেই। হযরত এবার বললেন, ‘আজকের বিল হামীদুর রহমান দিবে। ‎আমি নিজেকে বিল দেওয়ার জন্য বলে রেখেছিলাম। তাকে আর না করা ‎সম্ভব হয়নি।’

আমাদের বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেল। অপার্থিব প্রেমের ছায়ায় যার ‎জীবন, তার প্রেমে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। রেস্টুরেন্টের আলো ‎আঁধারে খুশির ঝিলিক ওঠে। হযরতের দ্যুতিতে আমরাও আলোকিত হয়ে ‎উঠি।‎

লেখক : লেখক, প্রকাশক

খলিফা, প্রফেসর হযরত হামিদুর রহমান

পূর্ববর্তি সংবাদকাশ্মিরে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে আন্দোলনে শতাধিক সাংবাদিক
পরবর্তি সংবাদমসজিদে একাকী নামায পড়া অবস্থায় জামাত শুরু হয়ে গেলে কী করণীয়?