ইসলাম টাইমস: বছর শুরুর গল্প

শরীফ মুহাম্মদ ।।

মাসিক ইসলামী ম্যাগাজিনের ধীরস্থির প্রশান্ত উপস্থাপনার বাইরে এসে প্রতিদিনের ঘটনার উপস্থাপন ও ঘটনার মূল্যায়ন নিয়ে একটি প্রকাশনা-আয়োজন থাকা দরকার। কিংবা কমপক্ষে তিন দিন অথবা সপ্তাহজুড়ে চলমান দেশ, জাতি, দ্বীন অথবা উম্মাহ সংশ্লিষ্ট কোনো ইস্যু নিয়ে একটি মিডিয়া দরকার। এরকম আলোচনা প্রায়ই হতো। নিজস্ব পরিমণ্ডলে বন্ধু-সহকর্মীদের মধ্যেও হতো। হঠাৎ হঠাৎ হতো মাসিক আলকাউসার-সম্পাদক মারকাযুদ্দাওয়ার সম্মানিত রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে।

পরিকল্পনায় সাহসী ও স্থিরবুদ্ধির অধিকারী প্রাজ্ঞ এই এলমি ব্যক্তিত্বের সঙ্গে অনেকবার কথা হয় নিত্যদিনকার মিডিয়ার আয়োজন নিয়ে। আট-নয় বছর আগে থেকেই সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন, এফএম রেডিও, আটপাতার দৈনিক পত্রিকা, বেসরকারি টেলিভিশনের স্লট কেনা-ইত্যাদির সম্ভাব্যতা ও কাগুজে বাজেট নিয়েও আলোচনা হয়।

প্রতিদিন কিংবা সময়ের স্রোত ধরে প্রতি তিন-চার দিনেই জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের এমন কিছু ইস্যু সামনে চলে আসে যে,  সেটি নিয়ে ‍একটু খোলাসা ভঙ্গিতে কথাবার্তা বলা দরকার। দরকার একটু তাৎক্ষণিক উপস্থাপনার। এবং এজাতীয় প্রয়োজনকে সামনে নিয়ে ছোট্ট পরিসরে হলেও কিছু চলমান অথবা নিত্যদিনকার গণমাধ্যমের আয়োজন প্রয়োজন। এই অনুভুতি আমাদের অনেকের মধ্যেই কাজ করতো। কিন্তু নেতৃত্বশীল মধ্যবয়সী কোনো আলেমের মাথায় সক্রিয়তার সাথে এ জাতীয় চিন্তার লালন আমি বিশেষভাবে লক্ষ করি মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সাহেবের মাঝে।

দৈনিক আমার দেশ-এর ইসলাম পাতার সাথে আমার সংযোগ  এবং ২০১১ সালে বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটনেটে কিছুদিন কাজের সুযোগে এ জাতীয় চিন্তার আরো নাড়াচাড়া হতে থাকে। ২০১৮ সালে ফাতেহ টোয়েন্টিফোরে কিছু উড়ন্ত সময়দানের পর ভাবনাটা পাকিয়ে ওঠে পুরোপুরি। অপরদিকে গত তিন-চার বছরে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, অনলাইন পোর্টালের সহজসাধ্য চর্চা আর চারপাশের নানামাত্রিক উদ্যোগ এ চিন্তাকে আরও জোরালো করার সুযোগ সামনে এনে দেয়।

তবে আমার জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে এসব ভাবনা ও চিন্তার পুরোটাই ছিল কল্পনা বিলাসের মতো। আলকাউসার থেকে ছুটি নিয়ে অন্য দুটি কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি মাঝে। শুরু হয় সাংবাদিকতা ও দাওয়াহ নিয়ে একটু-আধটু ভাবনা-চর্চা। কিন্তু এসময়টার মধ্যে আমার বহু ব্যক্তিগত, সামাজিক ও নানামাত্রিক ভাবনা যেমন মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সাহেবের সাথে বিনিময় করতে অকুন্ঠ থাকি, মিডিয়া ভাবনার এ-ব্যাপারগুলোও তার সামনে তুলে ধরে যাই সেভাবেই। ভাবনা তাঁর মাঝেও ছিল নীরবে সক্রিয়। দেশ-বিদেশের সংবাদ পোর্টালগুলো আরও কয়েক বছর আগে থেকেই তাঁর চোখের সামনে থাকে। গণমাধ্যমের এই প্রভাব ও চিন্তাসংক্রমনের যুগে তিনিও একটা কিছু উদ্যোগের কথা জোর ‍দিয়ে ভাবছিলেন গত কয়েকবছর ধরে। একটি দৈনিক পত্রিকার উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, আরও আগে এ নিয়েও পরামর্শ হয়েছে। এজাতীয় কিছু পরামর্শে বিশেষ অংশগ্রহণ থাকে দেশবরেণ্য প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব হজরত মাওলানা আবদুল মালেক সাহেবেরও।

সময় এভাবেই চলছিল। হঠাৎ একান্ত মতবিনিময়ের একটি মজলিসে ২০১৮’র মাঝামাঝি সময়ে  একটি নিউজ পোর্টাল খোলার ব্যাপারে আবারও কথাবার্তা হয় মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে। এবং এক মজলিসেই তিনি আমাকে বললেন, খোজঁ খবর নিন, গোছগাছ করুন। একটা চেষ্টা শুরু করা যাক। অবিন্যস্ত আলোচনার সূচনা-সময়টা আট-নয় বছরের হলেও সিদ্ধান্তমূলক একটি আলোচনা শেষ হয় আধাঘন্টায়। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়া, প্রস্তুতি আলোচনা ছাড়া। এবং আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় হঠাৎ করেই। এরপর দুই-তিন মাসের একটা দৌড়। এবং ২০১৮’র অক্টোবরের ১০ তারিখে এভাবেই ইসলাম টাইমস-এর আত্মপ্রকাশ।

সাধারণ নিউজ পোর্টালের মধ্যেই খবরের মূল দৃষ্টিভঙ্গিটাকে সামনে নিয়ে আসা, জাতির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও চিন্তার সেবা উপহার দেওয়া, ইসলামের বিধান ও জীবনচর্চার দরকারী প্রসঙ্গগুলো তুলে ধরা এবং দেশ-বিদেশের ‍প্রাসঙ্গিক ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করার একটি লক্ষ্য সামনে নিয়ে পোর্টালটি পথচলা শুরু করে। বৈরি গণমাধ্যমের ধূর্ত প্যাকেজকে অতিক্রম করে এবং ইতিবাচক ও প্রতিরোধমূলক একটি মেজাজ নিয়ে কাজ করে যাওয়াই এর আপাতত চরিত্র ঠিক করা হয়। মূলে রাখা হয় এ অঙ্গনের শূণ্যতা ও দরকার পূরণে গণমাধ্যম-অনুশীলনের প্রয়াসের বিষয়টি।

গড়ে ওঠে ফেইথ মিডিয়া কর্পোরেশন। ডোমেইন নেওয়া, সাইট নির্মাণ, সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন- সবকিছুই খুব দ্রুততার সাথে চলে। বটবৃক্ষের মতো শুরুরও শুরু থেকে প্রধান অভিভাবক হিসেবে সব অর্থে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন ফেইথ মিডিয়ার চেয়ারম্যান হিসেবে মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সাহেব। এবং পোর্টালটির প্রকাশক হিসেবে থাকতেও সম্মতি দেন। আমাদের দীর্ঘ কল্পনাবিলাস একটি বাস্তব স্বপ্ন হিসেবে তখন পাখা মেলতে সক্ষম হয়।

একদিকে আমাদের এই অভিভাবক এবং অভিভাবকবৃন্দ এবং সহযোগী লেখকদের আন্তরিক সহযোগিতায় এ পথচলা শুরু হয়, অপরদিকে পাঠক-দর্শক শুভার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ও ভালোবাসা আমাদের হাত ধরে এগিয়ে নিতে থাকে। এ পথচলার আজ এক বছর পার হলো। শুরুর দিন থেকে পাঠক-দর্শকদের যে আন্তরিক ও হৃদয়ছোঁয়া সহযোগিতা সমর্থন আমরা পেয়েছি- তা ভাষায় বলে শেষ করতে পারব না। অন্যতম উদ্যোক্তা আলহাজ্ব মাসউদ হাসান ভাইসহ দেশ-বিদেশের প্রেরণাদায়ক আরো কজন সুহৃদের কথা এ পর্যায়ে বারবার স্বরণে আসছে। এই এক বছরের পথচলা মসৃণ তো ছিলই না, নানারকম দুর্বলতা, বাধা আমাদের পথে এসে দাঁড়িয়েছে। ডোমেইন ব্লক, ফেসবুক পেজের রিচ স্থগিত করাসহ বিভিন্নরকম হোঁচটের ঘটনা আমাদের পথচলায় ঘটেছে। আল্লাহ তাআলা তার অসীম দয়ায় আমাদের পার করে দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ। আমরা সবাইকেই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

ইসলাম টাইমস-এর অন্যতম শ্লোগান- সত্যের সঙ্গে সময়। আমরা চেষ্টা করছি, মিথ্যার মিশেল থেকে বেঁচে চলতে। দেশের গণমাধ্যমের পরিস্থিতি কারো কাছেই অস্পষ্ট নয়। সব কঠিন সত্য একসঙ্গে বলে থেমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মধ্যে আমরা যেতে চাই না। এভাবেই চেষ্টা চলে, ভুল হলে মনোযোগী প্রিয় পাঠকদের পক্ষ থেকে সংশোধনী আসে, আমরা আবার শুধরে যাই, কৃতজ্ঞ হই। ইসলামী অনুশাসন, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ ভিত্তিক আমাদের এই অনলাইন প্রয়াসকে ভালো গন্তব্যের দিকে ধাবমান একটি পরিকল্পিত অনুশীলন হিসেবে বিবেচনা করে আমাদের পাশে, আমাদের সঙ্গে সব সময় লেখক-পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের উপস্থিতি আমরা আকাঙ্খা করি।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য এবং দুনিয়াব্যাপি বাংলাভাষী মানুষের জন্য ইসলাম টাইমস একটি উপকারী, কল্যাণকর ও প্রয়োজনপূরনকারী গণমাধ্যম সেবক হিসেবে উত্তীর্ণ হয়ে উঠুক- সবার কাছে দোয়া চাই।

 

পূর্ববর্তি সংবাদবরগুনায় প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ, ইউপি সদস্য কারাগারে
পরবর্তি সংবাদসংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন সাদ এরশাদ