আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী ।।
১২০৩ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৭৫৭ ।প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছর।সবুজ বাংলার ইথারে ইথারে বাজে শান্তি-সমৃদ্ধির জয়গান।ন্যায়- ইনসাফের আদলে গড়া সমাজে সর্বত্রই বইছিলো উন্নতি-অগ্রগতির ফল্গুধারা।এই দীর্ঘ সময় রাজদণ্ড ছিলো মুসলমানদের হাতে।মুসলিম ন্যায়পরায়ন শাসককুল হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার জন্য সার্বিক নাগরিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চত করার প্রয়াস চালান।
কিন্তু কালের আবর্তে ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে পলাশীর আম্রকাননে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। কতিপয় উচ্চাভিলাষী দেশদ্রোহী গাদ্দারের ভয়াল ষড়যন্ত্রে সবুজ বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়ে পড়ে। সাত সমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে আসা ইংরেজ বনিকদল বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে।হিন্দুরা তাদের স্বাগত জানায়।মুসলমানরা স্বদেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে হয়ে ওঠে বিদ্রোহী।
দেশপ্রেমিক স্বাধীনতাপাগল মুসলমানদের দমাতে হেন অপচেষ্টা নেই যা ইংরেজরা করেনি।তাদের উপর্যুপরি রোষানলে মুসলমানরা হয়ে ওঠে নিঃস্ব, একেবারে পর্যদুস্ত। অন্যদিকে জমিদার ও বর্ণ হিন্দুরা ইংরেজদের সহযোগী হিসেবে বাগিয়ে নেয় নানা রকম সুযোগ সুবিধা, হয়ে ওঠে স্বাবলম্বী। ফলে ইংরেজ-হিন্দু যৌথভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুসলমানদের উপর চালাতে থাকে অত্যাচার -নির্যাতনের স্টিমরোলার।কালক্রমে ইংরেজরা উপমহাদেশের মানচিত্র গ্রাস করে ফেলে। অনেক হয়েছে। এবার প্রতিরোধের পালা।শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ।স্বাধীনতা আন্দোলন। নেতৃত্বে স্বাধীনতাপাগল আজন্ম সংগ্রামী আলেমসমাজ।
বিদ্রোহ চলতে থাকে। উপমহাদেশজুড়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে থাকে।কখনো নিভু নিভু, কখনো দাও দাও করে। কখনো ফকীর মজনু শাহের নেতৃত্বে, কখনো একজন সৈয়দ আহমদ শহীদের নেতৃত্বে।মিছিল চলতেই থাকে।অধিকার আদায়ের মিছিল। স্বাধীনতার মিছিল।সেই মিছিলে একসময় শরীক হন এক সাহসী আজন্ম সংগ্রামী বীর পুরুষ, কালের মহানায়ক, জাগরণের নকীব।ইতিহাস যাকে চিনে “হাজী শরীয়তুল্লাহ” নামে।
১৭৮১ সাল। তখন রাত কি দিন,সন্ধা না হয় সুবহে সাদিক, ঠিক কোন প্রহর আমরা জানি না।তবে আমরা এটা জানি শত বছরের স্তব্ধতায় সবুজ বাংলায় বিকশিত হচ্ছে এক প্রাণ, মাদারীপুর জেলায়,বাহাদুরপুর নামক এক নিভৃত পল্লীগাঁয়।জন্ম গ্রহন করেন আগামীর ইতিহাস নির্মাতা হাজী শরীয়তুল্লাহ। পিতা হাজী আব্দুল জলীল সাহেব ছিলেন এলাকার সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্ব।বেশীদিন পিতার স্নেহ কপালে জুটলো না।শরীয়তুল্লাহ শৈশবেই পিতাকে হারান।
পিতৃহীন শিশু তার চাচার তত্বাবধানে বেড়ে ওঠতে থাকে।একসময় তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়।শিক্ষালাভের জন্যে।সেখানে তিনি মাওলানা বারাশাত আলীর তত্বাবধানে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে থাকেন।কিছুদিন পর তিনি তার উসতাদের সাথে মক্কায় গমন করেন।সেখানকার প্রসিদ্ধ আলেমদের স্বান্নিধ্যে কুরআন সুন্নাহ তথা ইসলামী শরীয়ার উপর ব্যাপক পান্ডিত্ব অর্জন করেন।বর্ণাঢ্য ছাত্রজীবন শেষে যুবক শরীয়তুল্লাহ সেখানেই শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন।কিছুকাল শিক্ষকতা করে ১৮১৮ সালে তিনি দীর্ঘ প্রবাস জীবনের সমাপ্তি টেনে ফিরে আসেন জন্মভূমিতে।
দেশে ফিরে স্বজাতি মুসলমানদের ভয়াবহ অধঃপতন দেখে যুবক শরীয়তুল্লাহর হৃদয়টা হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। কুসংস্কার, অশিক্ষা, কুশিক্ষা,দারিদ্র্য আর শোষণ নির্যাতনে মুষড়ে পড়া মুসলমানদের দুরাবস্থা তাঁকে দারুণভাবে ব্যথিত করে। ইংরেজ আর হিন্দু জমিদাররা একতাবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের দমিয়ে রাখছে। ফলে মুসলমানরা ডুবে যাচ্ছে হীনমন্যতার অতল সাগরে।
শরীয়তুল্লাহ দেখলেন ইসলামের মূলনীতি বিসর্জন দিয়ে মুসলমানরা শিরক-বিদআতে আকন্ঠ নিমজ্জিত। না,জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আর বসে থাকা যায় না।যুবক শরীয়তুল্লাহ শুরু করলেন দাওয়াতী তৎপরতা। বেগবান করলেন তাঁর সংস্কার আন্দোলন। যাবতীয় কুসংস্কার পরিহার করে ইসলামের খাঁটি অনুসারী হওয়ার জন্য তিনি সর্বস্তরের মুসলমানদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। সাধারণ মুসলমানদের তিনি নৈতিকতায় উদ্বুদ্ধ করেন।এভাবে তিনি দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যান পুরোদমে।ধীরে ধীরে চারদিকে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হতে তাকে।
ইতিহাসে হাজী শরীয়তুল্লাহর এই সংগ্রাম “ফারায়েজী আন্দোলন” নামে অভিহিত। ফরজ শব্দের বহুবচন ফারায়েজ।সেখান থেকেই ফারায়েজী।যারা আল্লাহর নির্ধারিত অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ(ফরজ) পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতেন তাদেরকে ফারায়েজী বলা হতো।খুব অল্প সময়েই এই আন্দোলন ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। ফারায়েজী আন্দোলন সম্পর্কে ঐতিহাসিক জেমস টেইলর বলেন,”কুরআনকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করাই ছিলো ফারায়েজী আন্দোলনের মূল লক্ষ”। গবেষক জেমস ওয়াইজের মতে,”শিরক-বিদআত আর কুসংস্কার থেকে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের রক্ষার ক্ষেত্রে হাজী শরীয়তুল্লাহর ভূমিকা অপরিসীম”।
হাজী শরীয়তুল্লাহ রাজনৈতিকভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হন।অন্যদিকে তিনি অত্যাচারী হিন্দু জমিদার ও নীল কুঠিয়ালদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।অবহেলিত ও বঞ্চিত মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করে তুলেন।সারা পূর্ব বাংলা এবং আসামে তাঁর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।১৮৩৭ সালে হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে ছিলো সাড়ে বার হাজার সক্রিয় কর্মী। বিশাল জনশক্তি তাঁকে সমর্থন ও সহযোগিতা করতো।
তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হন।তাঁর কর্মীদের নানাভাবে পুলিশ ও জমিদার বাহিনী হয়রানি করত।হাজী শরীয়তুল্লাহর কর্মস্থল ছিলো ঢাকা জেলার নয়াবাড়িতে।হিন্দু জমিদারদের বাড়াবাড়ির কারণে তাঁকে নয়াবাড়ি ছাড়তে হয়।পরবর্তীতে তিনি চলে যান নিজ গ্রাম মাদারীপুরের শামাইলে।সেখান থেকেই তিনি তাঁর সংস্কারকাজ চালাতে থাকেন পূর্ণগতিতে। হাজী শরীয়তুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত উন্নত চরিত্রের অধিকারী।মানুষ সহজেই তাঁর আচরণে মুগ্ধ হয়ে যেত।আদর্শ ও চরিত্রগুনেই তিনি জয় করেছিলেন সাধারণ ভাগ্যাহত মানুষের মন।
এদেশের মুসলমানদের চরম দুর্দিনে তিনি যোগ্য অভিভাবকের মত তাদের কাছে টেনে নেন।আমৃত্যু লড়ে যান সত্যের পক্ষে আর মিথ্যার বিপক্ষে। হাজী শরীয়তুল্লাহ তার সূচিত আন্দোলনের পূর্ণ সাফল্য দেখে যেতে পারেন নি। ১৮৪০ সালের ২৮ জানুয়ারি ৫৯ বছর বয়সে এই বীরপুরুষ,কৃষকবন্ধু,স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক এবং দারুল ইসলামের স্বপ্নদ্রষ্টা ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর ফারায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তার সুযোগ্য পুত্র মুহসিন উদ্দীন দুদু মিয়া।১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব পর্যন্ত এ আন্দোলন অব্যাহত থাকে প্রবলভাবে। পরবর্তীতে সে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
হাজী শরীয়তুল্লাহ আমৃত্যু মানবতার মুক্তির লক্ষে সংগ্রাম করে গেছেন। আমাদের সংগ্রামে,আমাদের জাগরণে,আমাদের অনুভবে এবং আমাদের চলার পথে আছেন সাহসের মশাল হয়ে।
















