মহিউদ্দীন ফারুকী ।।
আমাদের সামনে কেউ যদি কোনো ভুল করে তাহলে আমরা তাকে গালমন্দ ও বকা-ঝকা করতে বিন্দু মাত্র অপেক্ষা করি না। কখনো এমন পর্যায় পৌছে যাই যে, ভুলের মাত্রার তুলনায় ধমক, বকা-ঝকা ও ভর্ৎসনার পরিমান এক কাঠি বেশী হয়ে যায়। সমালোচনা এবং অপরের দোষত্রুটির পর্যালোচনা যেন আমাদের মজলিসের একমাত্র বিষয় হয়ে যায়। অনেকসময় আমরা অন্যের ভুলগুলোকে বিচার-বিশ্লেষণ বা যাচাই না করে ঢালাওভাবে প্রচার করতে থাকি। ছড়িয়ে দেই বিভিন্ন মাধ্যমে।
ওয়াজের মজলিসও হয়ে ওঠে কখনো কখনো অন্যের সমালোচনার মজলিস। কিন্তু আমরা নিজেরা যখন ভুল করি, (ভুল তো সারাক্ষণ করতেই থাকি) চাই সে ভুল নিজের ক্ষেত্রে হোক কিংবা অপরের ক্ষেত্রে তখন আত্মোসমালোচনার কথা বেমালুম ভুলে যাই। এবং ভুলেই থাকি। একদিন, একমাস, এমন কি বছরের পর বছর। কেমন যেন নিজেকে সমালোচনার উর্ধ্বে মনে করে থাকি। অনেকটা বুলেট প্রুফ এর মতো “ভুল প্রুফ”। নিজেকে অন্যের চেয়ে একটু আলাদা মনে করি।
আমাদের সমাজের এটাই স্বাভাবিক চিত্র। যোগাযোগ মাধ্যমে, অনলাইনে, অফলাইনে সবখানে। তবে তুলনামূলক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এর পরিমাণ অনেক বেশি। বিশেষত কেউ যখন নিজে ছোট হয়ে বড়দের বা শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিবর্গের ভুল বের করা বা চর্চা করা শুরু করে তখন বিষয়টি আরও ভয়ংকর মনে হয়। কিন্তু এ অবস্থাটার পরিবর্তন চাই। চাই এই দুরাবস্থা থেকে উত্তরণ। প্রয়োজন নিজের দোষ স্বীকার করা এবং সাধারণ মানুষ যেভাবে ভুল করতে পারে আমিও তদ্রুপ ভুল করতে পারি, এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হওয়া। অন্যের সমালোচনার পূর্বে আত্মোসমালোচনার প্রতি যত্নবান হওয়া। নিজের দোষগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে বের করে সংশোধনের চেষ্টা করা।
কতই না সুন্দর হয় যদি দিনের শেষভাগে একটা সময় নির্দিষ্ট করি আত্মোসমালোচনার জন্য। সময়টা হতে পারে ঘুমের পূর্বে। যাতে করে সে দিনের ঘটে যাওয়া বিষয়গুলোর প্রতি একটু সূক্ষ দৃষ্টি দিতে পারি। খুটিয়ে খুটিয়ে চিহ্নিত করতে পারি নিজের অযাচিত ও ভুল কাজগুলোকে। বিশেষ করে অন্যের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে আমি কী কী সমস্যায় পড়েছি কিংবা যে আচরণ করা উচিৎ ছিলো না, এমন কী আচরণ করেছি। সাথে যদি তা একটু লিখে রাখতে পারি এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে পারি যে আগামীকাল থেকে আর এ আচরণ এবং এ ধরনের অযাচিত কাজ আমার দ্বারা হবে না। অন্যের কষ্ট হয় এ জাতীয় কোনো আচরণ আমি করবো না, তাহলে আমি, আপনি, আমরা সকলেই সফল হবো ইনশাল্লাহ।
নিজের উত্তরণের জন্য এ কাজটি আজ থেকেই করা উচিত। কারণ অন্যের দোষ চর্চায় তো আমরা এক পলক বিলম্ব করি না। যা কিনা শুধুই শত্রুতা আর হিংসা ও সমাজে বিশৃংঙ্খলা সৃষ্টি করে। তাহলে যে কাজ আমার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করবে, আমাকে সমাজে মাথা উঁচু করে দাড়াতে সাহায্য করবে সে কাজ আমি বাস্তবায়ন করতে কেন বিলম্ব করবো?
অন্যদিকে আত্মপর্যালোচনা করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য। এর গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষকে এব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য উচিত আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করেছে তা চিন্তা করা।” (হাশর:১৮) ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনাকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। হযরত ওমর (রা.) বলেছেন: “তোমার হিসাব নেয়ার পূর্বে নিজেই নিজের হিসাব গ্রহণ কর।” আবু হাতিম ইবনে হিব্বান রহ. বলেন, ‘‘সবচেয়ে উচ্চ বিবেকবান সে যে ধারাবাহিকভাবে আত্মসমালোচনা করে।”
আত্মসমালোচনা ও আত্মপর্যালোচনার অনেক উপকারিতা রয়েছে। আত্মসমালোচনাকে নিজের অভ্যাস বানিয়ে নিতে পারলে সমাজে আপন সম্মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। হৃদয় ভালো কাজের দিকে আগ্রহী হয়। অন্যের হিংসা, ক্রোধ ও বিদ্বেষ থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়। দ্বীন ও ঈমানের উপর অবিচল থাকতে সাহায্য করে। আত্মসমালোচনার মাধ্যমে একজন পরিশীলিত মানুষ হওয়া যায়। এর বদৌলতে কোনো খারাপ কাজ দ্বিতীয়বার করা থেকে বাঁচা যায়।
আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আত্মসমালোচনা থাকলে পরকালে লাঞ্চিত ও বঞ্চিত হওয়া থেকে বাঁচা যায়।
লেখক: পরিচালক, মারকাযুল লুগাতিল আরাবিয়্যাহ বাংলাদেশ
















