ইসলাম টাইমস: স্বকীয়তার পথে পথচলার কিছু কথা

মাওলানা আমীর হামযা ।।

২০১৮ অক্টোবরের এই সময়টিতে যেদিন ইসলাম টাইমস নিউজ পোর্টালের শুভ উদ্বোধন হয়, সেদিন ইসলাম টাইমসের মিরপুরস্থ অফিসে মুহতারাম শরীফ মুহাম্মদ সাহেবের সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলাম। শুভ উদ্বোধন কিংবা অফিস শব্দ থেকে যেমন জমকালো কিছু চিন্তায় ভেসে উঠে, তেমন কিছুই সেখানে ছিল না। উদ্বোধন বলতে সেদিন রাত বারোটায় এই নিউজ পোর্টালটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, এই প্রস্তুতি চলছিল। আর অফিসের অবস্থা ছিল এমন, যে গলিটিতে ইসলাম টাইমসের অফিস অবস্থিত, সে গলিটি আমার পূর্ব পরিচিত হওয়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে আমি অফিস খুঁজে পাইনি। অবশেষে সম্পাদক সাহেবকে ফোন দিলে তিনি জানালেন, অমুক ভবনের এত তলায় আমি আছি, চলে আসুন।

এমনই সাদামাটাভাবে ইসলাম টাইমসের পথচলা শুরু। তারপরের কাজগুলো তো পাঠকদের সামনেই রয়েছে। আসলে কাজ এমনই হওয়া উচিত। আমাদের কাজগুলো জমকালো অনুষ্ঠান, গতানুগতিকতা আর প্রচার সর্বস্ব না হয়ে কর্ম ও কীর্তি নির্ভর হওয়া কাম্য। বর্তমানে এই গুণটির বড় অভাব। ইসলাম টাইমস এর ব্যতিক্রম। শুধু শব্দের ‘ব্যতিক্রম’ নয় বাস্তবেই ব্যতিক্রম। যারা নিয়মিত ইসলাম টাইমসে চোখ রাখেন, তারা জানেন যে ইসলাম টাইমস কখনও সাংবাদিকতায় তার নিজস্ব নীতি থেকে সরে আসেনি। ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থের বিরূদ্ধে যায়, এমন কোন নিউজ জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে তারা করেনি। নিউজে কখনো কোনো সমস্য ধরা পড়লে জানিয়ে দেওয়ার পরই সংশোধনী চলে এসেছে। আরেকটু অগ্রসর হয়ে বললে ছোট্ট পরিসরে হলেও ইসলাম টাইমস বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি শুভ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। যার বিস্তারিত বিবরণ সময় সাপেক্ষ। তার মধ্যে থেকে কয়েকটি পয়েন্ট সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি।

১. বিজ্ঞাপন নীতিমালা

বিজ্ঞাপনকে সংবাদপত্রগুলোর ব্যায় নির্বাহের সবচে বড় উৎস গণ্য করা হয়। তাই অন্তত এই ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা হয়েই যায়। এজন্য ইসলাম বান্ধব মনে করা হয়, এমন মিডিয়াগুলোতেও ইসলামী শরীয়া পরিপন্থী অনেক বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। কিন্তু ইসলাম টাইমস শুরু থেকেই এই ব্যাপারে আদর্শের পরিচয় দিয়েছে। কখনো গাযরে শরয়ী কোন বিজ্ঞাপন অনুমোদন করেনি। এই ধরণের বিজ্ঞাপন অনুমোদন করলে হয়ত তারা আর্থিক দিক থেকে কম ক্ষতিগ্রস্ত হত। কিন্তু তারা সমাজের রেওয়াজের বিপরীতে থেকে আর্থিক লাভের বিষয়টি গৌণ করে দেখেছে। আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে হলেও আদর্শ সমুন্নত রেখেছে।

২. ছবি প্রসঙ্গ

আধুনিক সাংবাদিকতায় ছবিকে অপরিহার্য মনে করা হয়ে থাকে। বাস্তবেও দেখা যায় যে, দুই কলাম লিখে একটি সংবাদকে যতটা চিত্রায়িত করা না যায়, একটি ছবি দিয়ে তার চেয়ে বেশি ফুটিয়ে তোলা যায়। ছবির এই গুরুত্ব নিজ স্থানে স্বীকৃত। কিন্তু তাই বলে ছবির যথেচ্ছা ব্যবহার কখনোই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। ইসলাম টাইমস এজন্যও মোবারকবাদ পাওয়ার যোগ্য যে তারা ছবির ব্যবহারে সংযমের পরিচয় দিচ্ছে।  একান্তই কোন নিউজে নারীর ছবি এসে গেলে তাকে উন্মুক্তভাবে নয়, বরং আবরণযুক্ত বা সংযত পন্থায় উপস্থাপন করেছে। বাংলাদেশে সাংবাদপত্রের জগতে এটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

৩. বরেণ্য আলেমদের সাক্ষাতকার গ্রহণ

এদেশের বহুল পঠিত সংবাদত্রগুলোতে সমকালীন বিভিন্ন ইস্যুতে সাক্ষাৎকার গ্রহণের রেওয়াজ আছে। তবে সেসব সংবাদপত্র এমন ব্যক্তিদের থেকেই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে থাকে, যারা তাদের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একাত্মতা পোষণ করে। এজন্য এতকাল সমাকালীন বিভিন্ন ইস্যুতে সেকুলারচিন্তার লোকদের কথাগুলোই পাঠকদের সামনে উঠে আসত। ইসলাম টাইমস এক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সমকালীন বিভিন্ন ইস্যুতে গুরুত্বের সাথে ইসলামিক স্কলারদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে পাঠকদের কাছে তাদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক বিশ্লেষণ পৌছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতে সমকালীন সংকটগুলোতে পাঠকরা কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক মন্তব্য ও বিশ্লষণ জানার সুযোগ পাচ্ছে।  অন্যান্য কিছু ইসলামি ধারার অনলাইন সংবাদপত্রেও এ ধারাটির চর্চা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ।

৪. ইসলামী মনীষীদের জীবন বৃত্তান্ত

আমরা এতদিন দেখে এসেছি যে, সেকুলার ঘরানার লেখক, চিন্তক বা আদর্শ পুরুষদের কেউ মৃত্যুবরণ করলে কিংবা তাদের মৃত্যুবার্ষিকী হাজির হলে বহুল পঠিত সংবাদপত্রগুলো ফলাও করে তাদের জীবনী ও আদর্শ প্রচার করে থাকে। তাদের জন্য বিশেষ আয়োজন করা হয়। পক্ষান্তরে কোনো ইসলামী মনীষীর ইন্তেকাল হলে তার মৃত্যুসংবাদটিও নিতান্ত অবহেলার সাথে ছাপা হয়ে থাকে। কিন্তু এমন মহান মনীষীর প্রস্থানে এমন গুরুত্বহীন সংবাদে আফসোস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

ইসলাম টাইমসের কীর্তি হচ্ছে, ইসলামের খেদমতে নিবেদিত সমকালীন বড় কোনো ব্যক্তিত্ব ইন্তেকাল করলে গুরুত্ব দিয়ে তাদের পরিচিতিমূলক সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠকদের সামনে তুলে ধরা। পাশাপাশি যেসব মহামনীষী গত হয়ে গিয়েছেন, সময় ও সুযোগ করে তাদের জীবনের উপর পৃথকভাবে আলোকপাত করা।

৫. বাছাই করে সংবাদ পরিবেশন

ইসলাম টাইমস শুরু থেকে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সতর্ক। বাছাই ছাড়া তারা সংবাদ পরিবেশন করে না। একটি সংবাদপত্রকে তার সূচনালগ্নে বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে হবে, এটিই স্বাভাবিক। আমাদের দেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র অন্তত বিদেশী নিউজের ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীল। এই ক্ষেত্রে তারা শুধু সংক্ষেপন ও অনুবাদকের ভূমিকা রাখে। তাছাড়া দেশী নিউজেও অনেক সংবাদের ক্ষেত্রে তারা অন্যের উপর নির্ভর করে থাকে। সুতরাং প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র যদি এসব ক্ষেত্রে অন্যের উপর নির্ভর করে চলতে পারে, তাহলে সদ্য পথচলা শুরু করেছে যারা, তাদেরকে অন্যের উপর নির্ভর করতে হবে এটিই স্বাভাবিক।  কিন্তু এক্ষেত্রেও কিছু স্বকীয়তার ব্যাপার আছে, যা ইসলাম টাইমস ধরে রাখতে পেরেছে। অর্থাৎ দেশীয় ও আন্তর্জাতি বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল থেকে সংবাদ বাছাই করতে পারা এবং তা হুবহু কপিপেস্ট না করে এমন ভাষা ও উপস্থাপনায় পবিবেশন করা, যাতে সংবাদটি যথাযথভাবে পরিবেশিত হয়, আবার ইসলাম ও মুসলামানদের স্বার্থে আঘাত না লাগে। এই জায়গাটিতেই বেশিরভাগ ইসলামী নিউজ পোর্টাল পিছিয়ে থাকে।

৬. মুসলিম জাহানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংবাদ

আমরা বরাবরই লক্ষ্য করে এসেছি যে প্রচলিত সংবাদপত্রগুলো মুসলিম জাহানের সংবাদকে বিশেষ একটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে না। বরং বিশ্ব সংবাদে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, মুসলিম-অমুসলিম সকল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংবাদ সমহারে প্রচার করা হয়। ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিও থাকে তাদের পশ্চিমাঘেঁষা। ইসলাম টাইমস এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তারা বিগত এক বছর যাবত বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মুসলিম জাহানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংবাদগুলো প্রচার করে এসেছে নিজস্ব ভাষায়।

এই ছিল ইসলাম টাইমসের স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্যের উপর কিছু সংক্ষিপ্ত আলেকপাত। এসব তুলে ধরার উদ্দেশ্য হলো সাংবাদিকতার এই ধারাটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করা। আমরা যদ্দুর জানি, এখনো এই নিউজ পোর্টালটি অনেক সীমাদ্ধতার মধ্যে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতার ভিতর থেকে ছোট্ট পরিসরে হলেও স্বকীয়তা বজায় রেখেছে এবং এদেশের সাংবাদিকতায় একটি শুভ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এর গন্তব্য বহুদূর। এজন্য সকলের সমর্থন, সহযোগিতা ও একান্তভাবে দুআ কাম্য। আল্লাহ তায়ালা যেন তার পথচলা সুগম করেন। তার ভবিষ্যত উজ্জ্বল করেন। সমস্ত উপায় উপকরণের ব্যবস্থা করেন। স্বকীয়তা বজায় রেখে দূর্বার গতিতে লক্ষপানে এগিয়ে যাওয়ার তাওফীক দান করেন। আমীন।

লেখক: মুহাদ্দিস, দারুল উলূম টঙ্গী

পূর্ববর্তি সংবাদপাহাড়ের শৃংঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ ও বিজিবির সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পরবর্তি সংবাদইসলাম টাইমসের বছরপূর্তি ঘরোয়া মজলিস:  সব দ্বীনী অঙ্গনের ইতিবাচক খবর ছড়িয়ে দিতে হবে