অর্জন নয়, আস্থার সূচনা

মাহমুদ সিদ্দিকী ।।

একটা সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দায়বদ্ধতা। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দায়বদ্ধতার অনুপস্থিতিই বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি। একটা সময় ছিল, সংবাদমাধ্যমকে মনে করা হতো সত্য প্রচারের মাধ্যম। জনগণও সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত যেকোনো সংবাদ বিশ্বাস করত অনায়াসে। সংবাদমাধ্যম হলো জনগণের কথা বলার জায়গা। একজন সাংবাদিক জনগণের হয়ে কথা বলবেন। একারণেই সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় গণমাধ্যম। কিন্তু, গণমাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য গণমানুষের কথা বলার যে মাধ্যম হয়ে উঠতে হয়, জাতীয় গণমাধ্যমগুলো শতকরা পঁচানব্বই ভাগ ক্ষেত্রেই তা নয়। যেসব গণমাধ্যম প্রকৃতই গণমাধ্যম হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে নিকট অতীতে, বিভিন্ন কারণে তাদের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছে। এমন ঘনঘোর সময়ে সত্য ও নিষ্ঠা নিয়ে সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করা, অকপট সংবাদ প্রকাশ করা— নিঃসন্দেহে নির্ভীক সাহসিকতার প্রয়োজন।

ইসলামি ধারার সংবাদমাধ্যমগুলো গণমাধ্যম হয়ে ওঠার চেষ্টা বিভিন্ন সময় করেছে। কিন্তু, কখনো যোগ্য লোকবলের অভাব, কখনো অভিজ্ঞতার অভাব, কখনো মনোবলের অভাব এবং কখনো দলীয় প্রভাবের কারণে সেসব একটি নির্দিষ্ট সময় পরে মুখ থুবড়ে পড়েছে। সবকিছুর বাইরে গিয়ে নিরেট গণমানুষ ও ইসলামের কথা বলে— টিকে থাকা এমন গণমাধ্যমের সংখ্যা খুবই কম। সেই হাতেগোনা গণমাধ্যমের তালিকা যদি করা হয়, তাহলে ইসলাম টাইমস টুয়েন্টিফোর ডটকম প্রথম দিকে থাকবে। এর সবচেয়ে বড় কারণ, দীর্ঘদিন গণমাধ্যমে কাজ করা কিছু মানুষ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।

ক’দিন আগেই ইসলাম টাইমসের এক বছর পূর্তি গেছে। এক বছর একটা সংবাদমাধ্যমের জন্য খুব বড় কোনো সময় নয়। এক বছরের কার্যক্রম দিয়ে একটি গণমাধ্যমকে সামগ্রিকভাবে বিচার করা সম্ভব নয়। ইসলাম টাইমসের অর্জন কতটুকু, তাই সেই তালাশ খুব বেশি জরুরি নয়। বরং জরুরি হলো— এই এক বছরে ইসলাম টাইমস কতটুকু সম্ভাবনা জাগাতে পেরেছে, সত্যনিষ্ঠতা ও বস্তুনিষ্ঠতা কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছে, গণমানুষের কতটুকু প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছে এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কথা কতটুকু তুলে ধরতে পেরেছে— তা নির্ণয় করা। এগুলো অর্জন না, এগুলো হলো দায়বদ্ধতা। এই দায়বদ্ধতা ইসলাম টাইমস কতটুকু পালন করতে পেরেছে, সেটাই মুখ্য বিষয়।

এই এক বছরের দায়বদ্ধতা ইসলাম টাইমস অনেকাংশেই পালনের চেষ্টা করেছে। সকল গণমাধ্যম যখন বিভিন্ন আধিপত্যবাদের সমর্থন ও মদদ জোগাতে সাংবাদিকতার হলুদায়ন করে চলেছে, তখন এই দায়বদ্ধতা পালন খুব বেশি জরুরি। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। অতি সম্প্রতি বিজিবি ও বিএসএফের মাঝে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। ক’দিন আগেই বিএসএফ বাংলাদেশিদেরকে গুলি করে সীমান্তে হত্যা করেছে। দুঃখজনকভাবে দায়সারা ও নমনীয় মনোভাব দেখিয়ে প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো এড়িয়ে গেছে। এর পেক্ষিতে এক বিএসএফ কনস্টেবল বিজিবির গুলিতে নিহত হয়েছে। এই যখন পরিস্থিতি, তখন প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিবেদন লিখছে এভাবে— ‘পতাকা বৈঠক করে ফিরে যাওয়ার সময় বিএসএফ কনস্টেবলকে গুলি করে হত্যা করেছে বিজিবি’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন এভাবে— ‘পতাকা বৈঠকের জন্য এসে বৈঠক না করেই ফিরে যাওয়ার সময় বিএসএফ কনস্টেবলকে গুলি করেছে বিজিবি। এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি’। এগুলো হলো সাদা চোখের সংবাদ। এই সংবাদ প্রকাশ করেছে ভারতীয় মিডিয়া। আমাদের দাদাপ্রেমি সাংবাদিকেরা তাদের সেই সংবাদ লুফে নিয়ে ধ্রুব সত্যের মতো করে প্রচার করছে। অথচ সাংবাদিকতার নীতি অনুযায়ী প্রথমেই তাদের উচিত ছিল বিজিবির বক্তব্য তুলে আনা। কিন্তু মূল যে সংবাদটি, তা হলো— ‘পতাকা বৈঠকের জন্য নয়, বাংলাদেশি সীমান্তের ভেতরে মাছ ধরতে এসে আটক হওয়া জেলেকে ছিনিয়ে নিতেই নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রবেশ করেছিলেন বিএসএফ সদস্যরা। তাদের অতর্কিত গুলির জবাবে আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালিয়েছিলেন বিজিবি সদস্যরা’। সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন ১ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল ফেরদৌস জিয়াউদ্দিন মাহমুদ।

প্রথমোক্ত সংবাদটি প্রথম সারির একটি জাতীয় দৈনিকের। অপরটি ইসলাম টাইমস টুয়েন্টিফোর ডটকমের। বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ফারাকটা যে-কেউই বুঝতে পারবেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলুদ সাংবাদিকতাটিও পাঠক সহজেই ধরতে পারবেন। ইসলাম টাইমস ও অন্য পদলেহক গণমাধ্যমগুলোর মাঝে বস্তুনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে এটাই প্রধান পার্থক্য। এই পার্থক্য আশাজাগানিয়া বটে; তবে এখনই তা অর্জনের খাতায় ওঠবার মতো কিছু নয়। বরং আস্থার সূচনা কেবল।

এখন ইসলাম টাইমসের টার্গেট হওয়া উচিত আরও বিস্তৃত ও উন্মুক্ত। গণমানুষের কথা বলার যে চেষ্টা ইসলাম টাইমস করে যাচ্ছে, তা গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এতে আস্থার জায়গাটি আরও ব্যাপকতা লাভ করবে।

লেখক: আলেম-লেখক, প্রকাশক

পূর্ববর্তি সংবাদব্যাতিক্রমধর্মী সেমিনারের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হলো ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশনের
পরবর্তি সংবাদঅনুপ্রবেশকারী ৩ নাগরিককে ফেরত নিতে রাজি হয়নি ভারত