লেখক হওয়ার সুখদুখ

মুনীরুল ইসলাম ।।

লেখালেখি একটি নান্দনিক শিল্প। এটি চর্চা করে যারা প্রতিষ্ঠা পান তারা লেখক, দেশের চিন্তক শিল্পী। দুনিয়ার সবাই-ই লেখক নন, ইচ্ছা করলেও হতে পারেন না। লেখকসত্তা আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ নেয়ামত। এটা তিনি সবাইকে দেন না। যারা লেখক হবেন জন্মগতভাবেই তাদের মধ্যে এই সত্তা লুকিয়ে থাকে। এরপর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে এটা বিকশিত হয়। চর্চা ও চেষ্টা অনুযায়ী সফলতা ধরা দেয়।

লেখকরা জাতির বিবেক। সমাজের আয়না। তাদের তৃতীয় চোখ থাকে। ওই চোখে তারা দেশের সঙ্গতি-অসঙ্গতি, ভালো-কালো দেখতে পান। ওই আলোকে কলমের আঁচড়ে কিংবা কীবোর্ডের চাপে তারা সমাজের চিত্র আঁকেন। অল্প সময়ে চিন্তার বিশ্বায়ন ঘটান। নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকেই তারা লেখালেখিটা চালিয়ে যান। তারা লিখেন মনের আনন্দে, প্রাণের তাগিদে এবং লেখালেখিকে ভালোবাসেন বলে। কারণ, এটাকেও বিশ্বাসী লেখকরা ইবাদত মনে করেন। ধ্যান-জ্ঞান ও সাধনা বলে চর্চা করেন। একটা বিষয় মাথায় ঢুকে গেল সেটা না লিখে শান্তি পান না। লেখাটি শেষ করার আগপর্যন্ত গর্ভবতী মায়েদের মতো ছটফট করতে থাকেন। লেখাটি শেষ করতে পারলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। আর লেখাটি কোথাও ছাপা হলে ওই স্বস্তিটা আরো টইটম্বুর হয়।

পৃথিবীর যেকোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য লেখালেখির গুরুত্ব অনেক। আদর্শকে পাঠকের কাছে নিপুণ করে ফুটিয়ে তোলাই দক্ষ লেখকের কাজ। একটি লেখা শুধু সমকালীন মানুষকেই লাভবান করে না, তা যুগ যুগ ধরে আদর্শ সমাজ গঠনে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। আদর্শ লেখকরা লিখনীর মাধ্যমে মানুষকে সত্য ও সুন্দরের দিকে ডাকেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের উপকরণ যোগান, প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরেন, সর্বোপরি সমাজ পরিবর্তনে অবদান রাখেন। এভাবে তারা অন্যান্য লেখক ও পাঠকের হৃদয়ে একটা জায়গা করে নেন। আত্মার আত্মীয়ে পরিণত হন।

লেখালেখির মাধ্যমে লেখক-লেখক এবং লেখক-পাঠকের মধ্যে একটা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কটা তৈরি হয় লেখক-প্রকাশক এবং লেখক-সম্পাদকের মধ্যেও। তবে এই চারটি সম্পর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলেন লেখক। একজন পাঠক পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেই কোনো লেখা পাঠ করুক, এর লেখকের সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠবেই। তখন পাঠক ওই লেখকের সাক্ষাৎ লাভের একটা টান অনুভব করে। কল্পনায় লেখকের ছবি আঁকে। লেখকের লেখায় প্রভাবিত হয়। শিহরিত ও আন্দোলিত হয়। লেখকের আদর্শ-আচরণে অনুপ্রাণিত হয়। হৃদয় ঠেলে দোয়া ও ভালোবাসা বেরিয়ে আসে লেখকের জন্য। লেখকের সঙ্গে ফোনে কিংবা ম্যাসেঞ্জারে কথা বলে আনন্দ পায়। লেখকের ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে থাকতে পারলে গৌরব বোধ করে। নিজের পোস্টে পছন্দের লেখকের লাইক-কমেন্ট পেলে ধন্য ধন্য লাগে। আর প্রিয় লেখকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে তো কথাই নেই। তখন যারপরনাই আবেগাপ্লুত হয় তারা। প্রিয় লেখকের গায়ে চিমটি কেটে দেখতে চায়- তিনিও কি আমাদের মতো রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ! তারা এতো চমৎকার করে লিখেন কিভাবে! কী কী বই পড়েছেন এবং কতটা জানেন তারা! এমন ভেবে একজন পাঠকের বিস্ময় যেন কাটে না। শিক্ষানবীস ও জুনিয়র লেখকদের বেলায়ও এমনটা হয়।

বিশিষ্ট লেখক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমাকে এই দুর্বল লেখালেখির মধ্যে এমন অনেক পুরস্কার দিয়েছেন, দোয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যার কৃতজ্ঞতা আদায় করে শেষ করতে পারবো না। আমি এমন কী লিখেছি! দশ বছর আগে কক্সবাজার গিয়েছি, একজন এসে বললেন আমি আপনার ‘সবুজ গম্বুজের ছায়া’ পড়েছি। আমি তখন থেকে আপনাকে খুঁজছি। আমি বগুড়ায় গিয়েছি, মুফতি মনোয়ার হোসেনের প্রথম অভিব্যক্তি ছিল, আমি ছাত্রজীবনে ‘সবুজ গম্বুজের ছায়া’ পড়েছি। আমার দেশ পত্রিকায় আমার কোনো একটা লেখা প্রকাশ হয়েছে, আবেগমিশ্রিত লেখা, যে লেখাটি লেখার সময় আমারও খুব আবেগ ছিল, আমি হঠাৎ করে ফোন পেয়েছি একজনের, বলেছেন গতকাল আপনার লেখাটি পড়ে আমি কেঁদেছি। এর মধ্যে বড় আলেম আছেন, ইংরেজি শিক্ষিত মানুষ আছেন, ব্যবসায়ী আছেন, দীনদার তাবলিগি আছেন। যারা কেউ কেউ বলেছেন, আপনার ওই লেখাটি পড়ে আমি কেঁদেছি, ওই লেখাটি পড়ে আমি খুব উদ্দীপ্ত হয়েছি, ওই লেখাটি পড়তে গিয়ে আপনাকে খুঁজছি। আমার মতো মানুষ লেখালেখি ছাড়া এমন আন্তরিক দোয়া ও বুকভরা ভালোবাসা আর কোথায় পেতাম! আমি যদি আজ শতকোটি টাকার মালিকও হয়ে যেতাম, মানুষের বুকের ভেতর থেকে আসা এই আবেগদীপ্ত ভালোবাসা অথবা দোয়া পাওয়া আমার পক্ষে কি সম্ভব ছিল! আমি এটা পেয়েছি। আমি এর জন্য আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করি।’

শুধু লেখক-পাঠক নয়, বই প্রকাশ করতে গিয়ে লেখক-প্রকাশকের মধ্যেও একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। লেখা প্রকাশের সূত্রে পত্রিকা সম্পাদকদের সঙ্গেও সম্পর্ক এবং ওঠাবসা হয়। এই ওঠাবসাটা পারস্পরিক লেখকদের মধ্যেই বেশি হয়। তাদের মধ্যে আড্ডা হয়, চা-পান হয়, সাহিত্যসভা হয়, ভাবনা-বিনিময় হয়, লেখালেখি নিয়ে পর্যালোচনা হয়, নিজেদের সাহিত্যকর্মের আদান-প্রদান হয়, ছোটরা বড়দের থেকে লেখা সম্পাদনা করিয়ে নেয়, পরামর্শ শোনে-এভাবে তাদের মধ্যে নিজস্ব কমিউনিটি ও ফোরাম গড়ে ওঠে। ফোরামের ব্যানারে লেখালেখি ও সাহিত্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। এতে করে তাদের মধ্যে নেতৃত্বগুণ সৃষ্টি হয়, বড়দের সম্মান এবং ছোটদের স্নেহ করার মানসিকতা তৈরি হয়। নেতার আনুগত্য এবং সদস্যদের প্রতি সহানুভূতি যোগ্যতা সৃষ্টি হয়। বড়দের ওপর ছোটদের ভালো-মন্দ দেখার একটা দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। সমমনা ও সমবয়সীদের মধ্যে বন্ধুত্বের সীমানা পেরিয়ে পারিবারিক খোঁজখবর বিনিময় হয়। তাদের মধ্যে হয় অনেক খুঁনসুটি এবং হাসি-কৌতুকও। এভাবে ধীরে ধীরে সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা লেখকদের মধ্যে একটা সম্পর্কের জাল বিস্তার করেছে। এখন ঢাকা থেকে কোনো লেখক অন্য জেলায় কাজে গেলে অথবা অন্য জেলা থেকে ঢাকায় কেউ এলে পরস্পরের সহযোগিতা ও আন্তরিকতা পাওয়া যায়। এসব কিছুর মূলেই কাজ করে তাদের মধ্যে গড়েওঠা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। যেটা শুধু লেখালেখির কারণে তৈরি হয়েছে। এর আগে তাদের মধ্যে কোনোরকম আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না এবং এখনো নেই। সম্পর্কটা শুধুই লেখালেখির।

এই সম্পর্কটা এতোই শক্তিশালী যে, একে অপরের বিপদাপদে সাধ্যানুযায়ী পাশে দাঁড়ান, সান্ত্বনা ও পরামর্শ দেন, আন্তরিকভাবে কথা বলেন, পারস্পরিক ধারদেনা চলে, কারো আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুতে সমবেদনা জানান, দোয়া-মুনাজাত করেন। অসুখ-বিসুখে প্রয়োজনে আর্থিক তহবিল গঠন করে সহযোগিতা করেন, দৌড়ঝাঁপ করেন। একসময় এই সম্পর্ক শুধু নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শ্রদ্ধার, স্নেহের বিশেষ করে বন্ধুবর লেখকদের নামধাম আলোচিত হয় তাদের পরিবারেও। যেমন আলোচিত হয় চাচাতো, ফুফাতে কিংবা খালাতো, মামাতো ভাইবোনদের কথা। কারণ লেখকরাও তাদের ভালোবাসার মানুষ আত্মার আত্মীয় ‘লেখাতো ভাই’। তবে বর্তমানের আঙুল সংস্কৃতি [মুঠোফোন] আর কানসুতা সংস্কৃতির [ইয়ারফোন] জয়জয়কারে মানুষের আন্তরিকতা বোধ হয় কমে আসছে।

পরিশেষে, লেখাতো ভাইদের পারস্পরিক সম্পর্কটা ‘শুধুই মধুর ও ভালাবাসাময়’ বলার সুযোগ নেই। এখানে তিক্ত অভিজ্ঞতাও থাকে। পৃথিবীর সব সম্পর্কেই অম্ল-মধুর স্মৃতি রয়েছে। সমাজের সবচেয়ে প্রিয় চারটি সম্পর্ক বাবা, মা, স্ত্রী ও সন্তানের সম্পর্কেও জোয়ার-ভাটা আসে। মনোমালিন্য, মতপার্থক্য এবং প্রতিহিংসার মতো বিষয়গুলো মানুষের মধ্যে বসবাস করে। তবে আমরা এই নিন্দনীয় কাজগুলো নিজেদের মধ্যে জিইয়ে রাখব না। এগুলোকে মানবিকতার বিষ দিয়ে মেরে ফেলব। প্রিয় সম্পর্কগুলোকে সবসময় মধুর করে রাখতে চাইব। কখনো ভাটা পড়লেও দীর্ঘ হতে দেব না, বরং ভালোবাসার জোয়ারে আবার নবায়ন করে নেব। তাছাড়া বৈচিত্র্যের মাঝেও তো ঐক্যের গান শুনতে পারি! জয় হোক প্রিয় লেখাতো ভাইদের।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম
নির্বাহী সম্পাদক, লেখকপত্র

পূর্ববর্তি সংবাদশিক্ষার্থীর মৃত্যুতে প্রথম আলোর কাছে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের আইনি নোটিশ
পরবর্তি সংবাদইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যানুষ্ঠান, কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সূচনা