এনাম হাসান জুনাইদ ।।
ইতিহাসবিদদের মতে, হিজরী অষ্টম শতাব্দির পর হিন্দুস্তানের শায়খ আহমদ সরহিন্দীর (মুজাদ্দিদে আলফে সানীর ) চেয়ে সফল ও প্রভাব বিস্তারকারী দাঈ আর অতিবাহিত হননি।
ইতিহাসবিদদের নিকট এখনো একটি বিস্ময় হিসাবেই রয়েছে গেছে যে, সহায় সম্বলহীন একজন মানুষ, যার না কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিল, না কোনো সৈন্যসামন্ত ছিল, তিনি কিভাবে প্রতাপশালী মোঘল রাজবংশের গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন!
শায়খ আহমদ সারহিন্দী (র.) ৯৭৫ হিজরীতে (১৫৬৩ খ্রি.) পাঞ্জাবের তৎকালীন পাতিয়ালা রাজ্যের বিখ্যাত সারহিন্দ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (র.)-এর ২৮তম অধঃস্তন বংশধর। মৃত্যু কালে তাঁর বয়সকাল ছিল ৬৩ বছর।
প্রখ্যাত দাঈ ও ইতিহাসবিদ আল্লামা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. মনে করেন, যে পদ্ধতিতে হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানীর দাওয়াতী কাজ পরিচালনা করেছিলেন সেই পদ্ধতি ও কৌশল বর্তমান যুগে সবচেয়ে বেশী অনুসরণ করার দাবি রাখে।
কারণ হিসাবে এই ইতিহাসবিদ বলেন, এ যুগে দেখা যায় কোনো একটা দাওয়াতী কাজ শুরু করার আগেই অথবা দাওয়াতী কাজের একেবারে সূচনা লগ্নেই সরকার ও ক্ষমতাশীল ব্যক্তিবর্গকে নিজদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলে। ফলশ্রুতিতে কাজের পথে অনর্থক অনেক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
শেখ আহমদ সারহিন্দীর সংস্কারমূলক দাওয়াতী কর্মসূচি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি শাসক পরিবর্তনের চাইতে শাসকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনকেই অগ্রাধিকার দিতেন বেশী। এ প্রসঙ্গে এক পত্রে তিনি লেখেন, ‘সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাদশাহর সম্পর্ক ঠিক তেমন- যেমন সম্পর্ক দেহের সাথে মনের। মন যদি ঠিক থাকে তবে দেহও ঠিক থাকে। যদি মন বিগড়ে যায় তবে দেহ বিপথগামী হয়। সুতরাং বাদশাহর সংশোধন সাম্রাজ্যেরই সংশোধন। বাদশাহর বিপর্যয় সমগ্র সাম্রাজ্যের ধ্বংসের নামান্তর।’
বাদশাহ ও ক্ষমতাশীল ব্যক্তিবর্গকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে তিনি চিঠিপত্রকেই দাওয়াতের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তার চিঠিপত্রগুলো দায়ীদের জন্যে এখনো অমূল্য সম্পদ বিবেচনা করা হয়।
ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের নিকট তার দাওয়াতী চিঠিপত্রের মূল কথা ছিল, ‘তোমরা সংশোধন হয়ে যাও। তোমরা যদি সংশোধন হয়ে যাও, তাহলে তোমরা রাজত্ব পরিচালনা বেশী হকদার। আমি তোমাদের সাথে ক্ষমতা দখলের জন্যে কোনো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে চাই না। তোমাদের রাজ্যের জন্যে আমি কোনো হুমকিও নই। আমি বরং তোমাদের মঙ্গল ও সফলতার জন্যে দোয়া করি। তোমরা রাজ্যের কাণ্ডারী। তোমরা ইসলামী বিধিবিধান দেশে বাস্তবায়ন কর। এবং দেশকে ইসলামের দিকে নিয়ে আস।’
ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, মুজাদ্দিদে আলফে সানির দাওয়াতী পত্রাবলীর সফলতার পেছনে এই মনোভাব সবচেয়ে বেশী প্রভাব বিস্তার করেছিল। রাজা-বাদশাহদের পদ-পদবি থেকে মুজাদ্দিদ সাহেবের নির্মোহতা ও বিমুখতা রাজা বাদশাহ ও ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদেরকে তার প্রতি আরও বেশী আকৃষ্ট করেছিল।
















