ভাইরাল হওয়া দৃশ্যের পরে

এনাম হাসান জুনাইদ ।।

মায়ের সঙ্গে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পাড় হচ্ছিল বড়জোর ৫বছর বয়সী এক শিশু। আর এ সময় দ্রুতগতির একটি গাড়ি ঠিকসময়ে থামতে না পেরে সজোরে ধাক্কা দেয় শিশুটির মাকে। গাড়ির ধাক্কায় ছিটকে পড়ে যান শিশুটির মা। চোখের সামনে মায়ের এই আঘাত পাওয়ার দৃশ্যটি একেবারেই মেনে নিতে পারেনি শিশুটি। মুহূর্তেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে কোমলমতি শিশুটি। ধাক্কা মারা গাড়িটিকে লাথি মেরে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে সে। যদিও তার ছোট্ট পায়ের লাথি টেরই পায়নি গাড়ির ভেতরে বসা চালক।

গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে এমন একটি ভিডিও। চীনে চংকিং শহরের একটি রাস্তার ঘটেছে এই ঘটনা। ট্রাফিক পুলিশের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া ঘটনাটি নেটিজেনদের অনেককেই নাড়া দিয়েছে। কিন্তু যে দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে তা অত্যন্ত আশা ব্যঞ্জক হলেও এর পরের দৃশ্যগুলো কিন্তু তেমন আশা ব্যঞ্জক নয়।

সত্যি বলতে কি, মায়ের জন্য  শিশুর টান,আকুতি একটি স্বভাবজাত বিষয়। এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করল,মহানবী সল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লাম সত্য বলেছেন-

وْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ، أَوْ يُنَصِّرَانِهِ، أَوْ  يُمَجِّسَانِهِ

প্রত্যেক শিশু ফিতরাত (আল্লাহর প্রদত্ত উত্তম স্বভাবগুণ) এর উপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি বানায় কিংবা নাসারা বানায় কিংবা বানায় অগ্নিপূজক।-সহীহ বুখারী, হদীস নম্বর : ১৩৮৫

ঠিক একইভাবে প্রত্যেক শিশু জন্মগত উত্তম স্বভাবগুণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এরপর বাবা-মা ও চারপাশের পরিবেশ তাকে অমানবিক বানায়। আদব-আখলাকহীন বানায়। তার উত্তম গুণগুলো নষ্ট করে দেয়। কিংবা অন্তত গুণগুলোকে বাড়তে দেয় না।

খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এই শিশুটি যে সমাজে বেড়ে ওঠছে, বড়  হতে হতে সমাজ শিশুটির মায়ের প্রতি ভালোবাসার এই গুণটিকে নষ্ট করে ফেলবে।

পশ্চিমা সভ্যতা সংস্কৃতির সাধারণ বৈশিষ্ট্যই হল, তা মানুষের ভেতরের মানবিক গুণাবলিকে নষ্ট করে দেয়। সন্তানকে মা-বাবা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই সমাজে শিক্ষিত লোকদের মা-বাবা খোঁজ নেয়ার সময় হয় না। মা-বাবার চিকিৎসা ব্যয়কে অর্থহীন অপচয় মনে হয়। কিন্তু কুকুরের পেছনে সময় ও অর্থ ব্যয়ে তাদের কোনো কার্পণ্য হয় না।

যত দিন যাচ্ছে, পশ্চিমা সমাজের বিষাক্ত জিনিসগুলো আমাদের সমাজেও ছড়িয়ে পড়ছে। বৃদ্ধ মা-বাবাকে ওল্ডহোমে পাঠানোর ঘটনা আমাদের দেশে অত্যন্ত দু:খজনকভাবে দিন দিন বাড়ছে।

দেখা যায়, ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবা পেটের জন্য রিক্সা চালাচ্ছেন।  আর তার সন্তানরা বড় বড় কাজ করে, বাবার খোঁজখবর নেয় না। দশ দশটি সন্তানের মা ভিক্ষা করে খায়।

যে বাবা একসময়ে ভালো চাকরি করেছেন, সন্তানকে দিয়েছেন সবচেয়ে দামী জামা-কাপড়, পড়িয়েছেন সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সেই সন্তানই সমাজের একজন হয়ে আজ নিজের বাবার খোঁজ নেয় না। যে বাবা সন্তানের অসুস্থতার সময় চিকিৎসা খরচ জোগাড় করতে দিন রাত এক করে পরিশ্রম করেছেন, আজ তার চিকিৎসার সময় সন্তান নানা অজুহাত দেখায়। এমনকি  বৃদ্ধ বাবার মৃত্যু কামনা করে এমন সন্তানও আছে আমাদের সমাজে।

৫ বছরের শিশুদের মায়ের প্রতি ভালোবাসা – এটি কেবলই একটি চীনা শিশুর অন্তরেই নয়। এটি বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশের শিশুদের অন্তরেই আছে। দরকার যা তা হল, সেই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে একটি সুন্দর আদর্শ সমাজ।

 

 

পূর্ববর্তি সংবাদলিবিয়ায় হাফতারের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেবে তুরস্ক
পরবর্তি সংবাদরাজাকারদের উত্তরসূরিদের সঙ্গে কোনো আপস নেই : ওবায়দুল কাদের