হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রাহ. : ভারতবর্ষের এক ছায়াদার বৃক্ষ

সাইফ নূর ।।

২৫ শে ডিসেম্বর ১৩৬৩ ঈ.। ইতিহাসের এই দিনে ইন্তেকাল করেন ভারত-উপমহাদেশের বিখ্যাত বুযুর্গ, তাকওয়া ও আধ্যাত্মিকতা, যুহদ ও দুনিয়াবিমুখতার অনন্য উপমা, হাকীকত ও মারেফাত, হেদায়েত ও ইরশাদের প্রোজ্জ্বল নক্ষত্র, সুলতানুল আওলিয়া, সুলতানুল মাশায়েখ- হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রাহ.।

হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রাহ. -এর নাম মুহাম্মাদ। পিতার নাম আহমদ। জন্ম: ৬৩৪ মতান্তরে ৬৩৬ হিজরীতে ভারতের বাদায়ূন অঞ্চলের এক সম্ভ্রান্ত সাইয়েদ পরিবারে। পিতা-মাতা উভয় ধারায় তিনি ছিলেন নবী বংশের সন্তান।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর পিতার ইন্তেকাল হলে মায়ের নিকট প্রতিপালিত হন। প্রাথমিক শিক্ষা জন্মস্থান বাদায়ূনে। ইসলামি ফিকহসহ প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি মাওলানা আলাউদ্দীন উসূলীর নিকট। ষোল বছর বয়সে দিল্লিতে মাওলানা শামসুদ্দীন খাওয়ারেযমী রাহ.-এর দরসে অংশগ্রহণ। হাদীসের ইজাযত গ্রহণ করেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ কামালুদ্দীন যাহেদ রাহ. (ইন্তেকাল: ৬৮৪ হি.)-এর নিকট। যিনি মাশারিকুল আনওয়ার গ্রন্থের লেখক আল্লামা হাসান ইবনে মুহাম্মাদ সানআনী রাহ.-এর সরাসরি শাগরিদ ছিলেন। এছাড়া স্বীয় মুরশিদ শায়খ ফরিদুদ্দীন গাঞ্জশেকর রাহ.-এর নিকট আওয়ারিফুল মাআরিফ, তামজিদে আবু শাকূর সালেমী প্রভৃতি তাসাওউফের উচ্চমার্গের কিতাবের সবক লাভ করেন।

ছোটবেলা থেকেই হযরত নিযামুদ্দীন রাহ. আধ্যাত্মিক পরিবেশে তরবিয়ত প্রাপ্ত হন। বাল্যকালে যখন কোনো দিন ঘরে অনাহার দেখা দিত তখন তার মা বলতেন, ‘আজ হাম লোগ আল্লাহ কে মেহমান হ্যাঁয়।’-আজকে আমরা আল্লাহর মেহমান। হযরত বলেন, একথা থেকে আমি বড়ই রূহানী স্বাদ লাভ করতাম।’

ছাত্র বয়সেই তিনি তাসাওউফের প্রতি প্রবল আকর্ষণবোধ করেন। বিশ বছর বয়সে অযোধ্যা গিয়ে শায়খে কাবীর হযরত ফরুদীদ্দুন রাহ.-এর নিকট বাইআত হন। আওয়ারিফুল মাআরিফ -এর সবক গ্রহণকালেই তিনি শায়খের খেলাফত লাভ করেন। শায়খ তাঁকে দিল্লিতে গিয়ে মানুষের হেদায়াতের কাজ করার হুকুম করেন। শায়খ তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি একটি ছায়াদার বৃক্ষ হবে- যার ছায়ায় আল্লাহর মাখলুক প্রশান্তি লাভ করবে।’

বস্তুত হয়েছিলও তাই। এক সময় গোটা উপমহাদেশ ও উপমহাদেশের বাইরে থেকে মানুষ তার নিকট আসতে শুরু করে। তার সান্নিধ্যে খোদাপ্রেমিক মানুষদের ভীড় এমন হারে বাড়তে থাকে- যার সামনে দিল্লির সালতানাতও ম্লান হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন তার সাহচর্যে আত্মশুদ্ধি পেত। তার দস্তরখানে আহার করত। কিন্তু তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ, আমীর-ওমারাদের সঙ্গে সম্পর্কহীন, মাখলুকের হেদায়াতে নিবেদিতপ্রাণ এবং সর্বক্ষণ আল্লাহর প্রতি ধ্যানমগ্ন এক সাধক স¤্রাট।

ইন্তেকালের চল্লিশ দিন পূর্ব থেকে আল্লাহর রসূলের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহে তিনি খানাপিনা ত্যাগ করেছিলেন। তাকওয়া ও ইবাদতের ব্যস্ততায় এ মনীষী আজীবন কুমার ছিলেন। তাঁর মুবারক নামেই দিল্লির বসতি নিযামুদ্দীনের নামকরণ হয়। তবে আজমির শরীফের শিরকি কর্মকাণ্ডের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

১৮ রবিউল আউয়াল ৭৬৫হি./২৫ ডিসেম্বর ১৩৬৩ খ্রিস্টাব্দে যুহ্দ, ইবাদত, হাকীকত, মারেফাত এবং হেদায়াতের মশালধারী এ মহান সাধক দুনিয়াত্যাগ করেন।

[সূত্র: তারীখে দাওয়াত ও আযীমত ৩/৫২-১০১; ফুকাহায়ে হিন্দ ১/২১০-২১৫]

পূর্ববর্তি সংবাদডাকসু হামলা: ভারত বিরোধিতা ‘স্পর্শকাতর’ হয়ে উঠছে বাংলাদেশে
পরবর্তি সংবাদক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক উৎপাদন চালাচ্ছে উত্তর কোরিয়া