কালের চক্রে যেভাবে হারিয়ে গেছে মুসলিম লীগ

সাইফুল ইসলাম ।।

পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা, ব্রিটিশ সরকারের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা, ভারতীয় অন্যান্য সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের সুন্দর সম্পর্ক রক্ষা করা- এসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ৩০ তারিখে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যার অন্যতম মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা।

একটি মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য নওয়াব সলিমুল্লাহর পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য হিন্দুদের শক্তিশালী বিক্ষোভের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পটভূমি ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় হতে চিহ্নত করা যেতে পারে। সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব এবং ভারতে প্রতিনিধিত্বমুলক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দু সম্ভ্রান্ত শ্রেণি কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিল।

এদিকে মুসলিম নেতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থে ভারতীয় মুসলমানদের কংগ্রেসে যোগ না দিতে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন। তিনি আলীগড়ে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে তাঁর আন্দোলন শুরু করেন। স্যার সৈয়দ আহমদ এবং তাঁর মতো অন্যান্য মুসলমান নেতারাও বিশ্বাস করতেন যে, একটি পশ্চাৎপদ জাতি হিসেবে মুসলমানগণ ব্রিটিশদের প্রতি বিরোধিতার পরিবর্তে আনুগত্যের মাধ্যমেই অধিকতর সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে। মুসলমান জনগোষ্ঠীর মাঝে ইংরেজি শিক্ষা জনপ্রিয় করে তোলার জন্য তিনি তাঁর অনুসারীদের সর্বশক্তি নিয়োগের নির্দেশ দেন। এ উপলব্ধি এবং অনুবর্তী সক্রিয়তা ‘আলীগড় আন্দোলন’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

এ চিন্তার অনুসরণে নওয়াব আব্দুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী এবং অন্যান্য সম্ভ্রান্ত মুসলমানগণ মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের জন্য সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবে মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি (১৮৬৩), সেন্ট্রাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৭৭), ইউনাইটেড ইন্ডিয়ান পেট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন (১৮৮৮) এবং অন্যান্য অনেক স্থানীয় আঞ্জুমান গড়ে ওঠে। এগুলি রাজনীতির চেয়েও সামাজিক পুনর্জাগরণমূলক কাজে অধিকতর সক্রিয় ছিল।

ভারতের মুসলিম নেতৃবৃন্দ মুসলমান সম্প্রদায়ের শিক্ষাসংক্রান্ত সমস্যাসমূহ আলোচনা এবং সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রচার করার জন্য বছরে একবার অনানুষ্ঠানিকভাবে সভায় মিলিত হতো। কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গভঙ্গের (১৯০৫) বিরুদ্ধে পরিচালিত বিক্ষোভ এবং স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এমনি এক সভা (সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন) ১৯০৬ সালে ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত হয়।

ইতিপূর্বে মুসলমান নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল মুসলমান সম্প্রদায়ের বিশেষ সমস্যাবলি তুলে ধরার জন্য সিমলায় গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গভঙ্গের সমর্থক ঢাকার নওয়াব  খাজা সলিমুল্লাহ কংগ্রেস সমর্থকদের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী বিক্ষোভ মোকাবিলা করার জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তিনি এ সভায় একটি রাজনৈতিক মঞ্চ গঠনের প্রস্তাব করেন। সভার সভাপতি নওয়াব ভিকার-উল-মুলক প্রস্তাবটি সমর্থন করেন এবং এভাবে সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগ সৃষ্টি হয়।

তবে স্বাধীনতা অর্জনের দুবছরের মধ্যে লীগ জনসমর্থন হারাতে শুরু করে। ১৯৪৯ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ঢাকায় আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন। ক্রমাগত শ্রমিক ধর্মঘট, সম্প্রদায়িক দাঙ্গা, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি, কোন কোন জেলায় কৃষক বিদ্রোহ, পুলিশ বিদ্রোহ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্যবৃদ্ধি, ভাষা সমস্যা এবং নতুন রাষ্ট্রের অন্যান্য অসংখ্য সমস্যাসমূহ  জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। তারা বিকল্প নেতৃত্বের প্রত্যাশী হয়ে ওঠে এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং এ.কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি এই প্রত্যাশা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করে। এ দলগুলি অন্য কতিপয় ক্ষুদ্র দলের সঙ্গে একত্রিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট নামে একটি নির্বাচনী আঁতাত গঠন করে, যা ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২২৩টি আসন লাভ করে। মুসলিম লীগ লাভ করে মাত্র ৮টি আসন।

শাসকদলের এ ধরনের  পরাজয় খুব অস্বাভাবিক নয়। তবে যা অস্বাভাবিক ছিল তা হচ্ছে, গণভিত্তিক এবং সবচেয়ে পুরাতন দল হয়েও মুসলিম লীগ পূর্ব-পাকিস্তানে আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। কখনও কখনও দু-চারটি আসন জয় করে লীগ তার অস্তিত্ব প্রমাণ করত, তবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় আমলেই যখন দেশে সামরিক শাসন জারি হয়েছে তখনই এই দলের অস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি বোঝা গেছে।

সূত্র : বাংলাপিডিয়া

পূর্ববর্তি সংবাদটেক্সাসে গির্জায় বন্দুকধারীর গুলি, নিহত ২
পরবর্তি সংবাদনববর্ষের ‘শুভেচ্ছা’ মেসেজ থেকে সাবধান