মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ।।
বিভিন্ন রকম নিন্দনীয় রীতিনীতির পাশপাশি ইংরেজী নববর্ষ বরণে নতুন একটি রীতি কয়েকবছর ধরে খুবই প্রকট ও মারাত্মক হয়ে উঠেছে। সেই রীতি হচ্ছে, আতশবাজি। ৩১ ডিসেম্বর রাতে ইংরেজী বা ঈসায়ী নববর্ষের সূচনা মুহূর্তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় বড় আতশবাজি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নববর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। রাত ১২টার সময় বিশ্বের পূর্বপ্রান্তের দেশ নিউজিল্যাণ্ড থেকে এ আতশবাজি শুরু হয়। সময়ের হিসাবে একে একে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আমেরিকায় গিয়ে এ আতশবাজি শেষ হয়। কোনো কোনো দেশে এ আতশবাজির আয়োজন প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে ব্যাপক সাড়ম্বরে করা হয়।
৩১ ডিসেম্বর রাতে নানারকম নিষিদ্ধ আনন্দ-ফূর্তি, অশ্লীলতা, মদ্যপান, নাচগান ও খোলামেলা বেশভূষার উগ্রতা প্রকাশের রেওয়াজ তো বেশ কয়েক বছর থেকেই চলে আসছে। উন্মত্ততাপূর্ণ এসব আনুষ্ঠানিকতার কারণে অনেক রকম অপ্রীতিকর ঘটনাও ইতিমধ্যে ঘটেছে। যে কারণে অতি সম্প্রতি আমাদের দেশসহ কোথাও কোথাও ওই রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ করে কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাও নিতে হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এসবের সঙ্গেই যোগ হয়েছে নতুন একটি উপসর্গ। সে উপসর্গটি হচ্ছে, আতশবাজি। দীর্ঘ সময় নিয়ে বড় ধরনের আতশবাজি করার এক ভয়ংকর আনুষ্ঠানিকতা। এই আনুষ্ঠানিকতার ধারাবাহিকতায় গত ২০১৫ সালের সূচনালগ্নে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অঙ্গরাজ্য-দুবাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় আতশবাজির আয়োজন করে গিনেজবুকে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে।
এ সংস্কৃতি দিন দিন ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হতে চলেছে। নববর্ষের উৎসবেই এটি থেমে নেই। বরং বিভিন্ন খেলা, টুর্নামেন্ট ও উৎসবে সম্প্রতি আতশবাজির প্রয়োগ বাড়ছে। এটা বিভিন্ন দেশেই ঘটে চলেছে। এমনকি আমাদের দেশও এক্ষেত্রে একদম পিছিয়ে নেই। আতশবাজি বা কোটি কোটি টাকার আগুন-পটকা ফোটানোর উৎসব এখন আর ধনী দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
ধনী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি উপরের কথাগুলো স্বাভাবিক যুক্তি ও বিবেচনা বোধেরই দাবি। এটা তাদের করা উচিত ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসন ও চরম দারিদ্র্যের অসহায়ত্ব দূর করার দায়িত্ব থেকে। কিন্তু এ বিষয়টিতে অনুন্নত কিংবা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব তো অনেক বেশি। আতশবাজির পেছনে কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে দেয়ার মতো হঠকারিতা তাদের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। একে তো বহু গরিব মুসলিম দেশে দারিদ্র্য নিরসন এবং স্বাভাবিক রাষ্ট্রিয় চাহিদা পূরণেই অনেক অর্থের প্রয়োজন। যে প্রয়োজনীয়তা পূরণে যথাযথ অর্থের সংস্থান করা নিজেদের উৎস থেকে তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। সে ক্ষেত্রে অপচয় না করে তাদের সহযোগিতা দিয়ে যাওয়া বিত্তবান মুসলিম দেশগুলোর দায়িত্ব। অপরদিকে বর্তমানে কিছু মুসলিম দেশে চলছে যুদ্ধাবস্থা। ইরাক-ইয়েমেন-সিরিয়া, লিবিয়া; সৌদি আরব এ পরিস্থিতির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতও সৌদি সামরিক জোটের অংশ। এর জের চলছে আরো কিছু কিছু দেশে। কোনো কোনো দেশে মুসলমানরা চরম নির্যাতিত ও সংখ্যালঘু। এ কারণে দেশে দেশে মুসলিম উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের ভিড় বাড়ছে। নদী-সমুদ্রে অসহায় মুসলিম নারী-শিশুর সলিল সমাধি ঘটার খবর আসছে প্রায়ই। মানবিক সংকট চরমে। সে সময়ে কোনো মুসলিম দেশের জন্য এ ধরনের আতশবাজির উৎসবে টাকা পোড়ানো চরম দায়িত্বহীনতা ও অমানবিক নিষ্ঠুরতা। কারণ, লক্ষ করলেই দেখা যাবে, আতশবাজির বিষয়টি কোন পর্যায়ের এবং কত জঘন্য রকম একটি বিলাসিতা। বিত্তবানেরা অনেক রকম বিলাসী আয়োজনে টাকা নষ্ট করে থাকে। সেখানে পেটের কিংবা মনের কিছু সময়ের ভোগ তাদের হয়। নিন্দিত সেই ভোগ-উপভোগেরও একটি স্তর ও মেয়াদ থাকে। কিন্তু আতশবাজি একটি চরম ও অকল্পনীয় বিলাসী খাত। এ যেন বস্তা বস্তা টাকা আগুনে পুড়িয়ে কয়েক মিনিটের ফূর্তি করা। যে ফূর্তি মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। হারিয়ে যায়। অথচ এ টাকাগুলো বাঁচানো গেলে লাখ লাখ দরিদ্র লোকের কাজে লাগতো। তাদের ক্ষুধা নিবারণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, আশ্রয়ন ও আবাসনের আয়োজন করা যেত।
এ তো গেল আতশবাজির ভয়াবহতার একটি অর্থনৈতিক দিকের আলোচনা। যদি এ বিষয়টিকে তাহযীব-তামাদ্দুন ও সংস্কৃতির দিক থেকে বিবেচনা করা হয় তাহলে ও এ-জাতীয় আগুনের উৎসব মুসলমানদের জন্য চেতনাগত ও সাংস্কৃতিকভাবেও বর্জনীয়। কারণ, আগুন নিয়ে উৎসব করার সংস্কৃতিটি এসেছে অগ্নিপূজারিদের থেকে। ধীরে ধীরে অন্য অনেক শিরিক-নিমজ্জিত জাতি এটা গ্রহণ করেছে। এ কারণে সেসব জাতির লোকেরা মোমবাতি প্রজ্বালন, মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানোসহ আগুন-কেন্দ্রিক বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালন করে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এসবের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসের দিকটি বিবেচনায় না নিয়েই আমাদের দেশসহ বিভিন্ন দেশে মোমবাতি ও মঙ্গলপ্রদীপের মতো আগুন-কেন্দ্রিক বিভিন্ন রসম-রেওয়াজ ও অনুষ্ঠান পালন করা হয়। অথচ মুসলমানদের জন্য সব অনুষ্ঠান ও আচরণে ইসলামের সভ্যতা -সংস্কৃতির ক্ষেত্রে স্বকীয়তা বজায় রাখার গুরুত্ব অনেক বেশি। বিজাতি-বিধর্মীদের সভ্যতা-সংস্কৃতি পালন করলে তাদের গোত্রভুক্ত হয়ে যাওয়ার ধমকিও হাদীস শরীফে দেওয়া হয়েছে।
( من تشبه بقوم فهو منهم)
এছাড়া আযানের ইতিহাসটি দেখলেও এ বিষয়ে কিছু নির্দেশনা পাওয়া যায়। নামাযের জন্য ঘোষণার কাজটি কীভাবে করা হবে, মুসল্লিদেরকে নামাযের দিকে কীভাবে আহ্বান জানানো হবে- সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে এ সংক্রান্ত একটি পরামর্শ সভা বসেছিল। তখন কেউ ঘণ্টা বাজানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কেউ বলেছিলেন আগুন জ্বালিয়ে নামাযিদের দৃষ্টি আকর্ষণের কথা। কিন্তু বিজাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যের কারণ উল্লেখ করেই আগুন প্রজ্বালন করে নামাযীদের আহ্বানের প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। এ থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আগুনের এ-জাতীয় ব্যবহার বিজাতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিচায়ক। এবং সেটি পরিহার ও বর্জনযোগ্য। সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে এ বিষয়ক ঘটনাটির বিবরণ রয়েছে।
সেজন্যেই আমরা জোর দিয়ে বলবো- ফূর্তি ও অনুষ্ঠান সবকিছুতেই আতশবাজির মহামারি কিংবা আগুনের ব্যবহার থেকে মুসলমানদের মুক্ত হওয়া উচিত। এই ভয়ংকর অপচয় ও অনুচিত সংস্কৃতি মুসলমানদের জন্য কিছুতেই অনুসরণযোগ্য ও পালনযোগ্য হতে পারে না। হতে পারে না তাদের প্রতিযোগিতা ও মর্যাদা রক্ষার কোনো ইস্যু। ধ্বংসাত্মক অপচয়ের মধ্যে মুসলিম কোনো সমাজের কোনো গৌরব ফুটে ওঠার কোনো অবকাশ নেই। একইসঙ্গে অন্য ধর্মের অনুসারীদের জন্যও আতশবাজির মতো অনুষ্ঠানে, যেটি কোটি কোটি ‘টাকা’ আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো অপচয়ে না যাওয়ার পরামর্শ আমরা দেব। কারণ শাশ্বত মানবিক ক্ষেত্রগুলোর ক্ষয় ও ক্ষতি সবার জন্যই সমান বিনাশ নিয়ে আসে। আমাদের দেশের জনগণ এবং সরকারের প্রতিও আমাদের একই আহ্বান থাকবে।
আমরা দেখি শবে বরাতসহ বিভিন্ন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পটকা ফুটানোতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে থাকে। (যা অবশ্যই প্রশংসিত উদ্যোগ) কিন্তু আবার সরকারি আয়োজনেই বিভিন্ন টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ও সমাপনীতে ব্যাপক আতশবাজির আয়োজন করা হয়ে থাকে। যা অবশ্যই পরিহারযোগ্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
















