আল্লামা আশরাফ আলী রহ.: পরিবারের সদস্যদের স্মরণে

ওলিউর রহমান ।।

দৈনন্দিন জীবনের বড় বড় সুন্নতগুলোর উপর আমল তো আমাদের অনেকের হয়ে যায়। কিন্তু কিছু সুন্নত এমন আছে খুব খেয়াল না করলে যেগুলোর উপর আমল করা কঠিন। আব্বা ছোট-বড় সব সুন্নত খুব পাবন্দির সাথে পালন করার চেষ্টা করতেন। ইন্তিকালের আগে যখন দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন তখন খাবার খেতে আব্বার প্রায় ঘন্টার উপরে সময় লেগে যেত। খুব কষ্টও হত। খাবারে অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ায় দেখা যেত থালা শুকিয়ে গেছে। বাসন পরিস্কার করে খাওয়ার যে সুন্নত সেটি আদায় করা তখন কষ্ট হয়ে যেত। তাই শেষ সময়ে তিনি খাওয়া শেষ হলে প্লেটে পানি ঢেলে পরিস্কার করে তা পান করে ফেলতেন। যাতে খাদ্যকণার অপচয় না হয় এবং আহার সামগ্রী পরিস্কার করে খাওয়ার সুন্নত আদায় হয়।

সম্প্রতি ইন্তিকাল হওয়া বাংলাদেশের বর্ষীয়ান আলেমেদ্বীন আল্লামা আশরাফ আলী রহ.-এর সাহেবযাদা মুফতি শুয়াইব আহমদ নিজের বাবার ব্যাপারে এ তথ্য জানান।

মহীরুহ আলেমেদ্বীন আল্লামা আশরাফ আলী রহ.-এর জন্ম হয় ১৯৪০ সালে মার্চের ১ তারিখে। কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। পিতা আলহাজ্ব মফিজুদ্দীন ছিলেন এলাকার সম্মানিত সম্ভ্রান্ত একজন ব্যক্তি।

আল্লামা আশরাফ আলী রহ.-এর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সূচনা হয় মাজাহেরে উলূম যশপুর মাদরাসায়। কিছুদিন পর তিনি কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী কাসিমুল উলূম মাদরাসায় ভর্তি হন। এখানে শরহে জামি কিতাব পড়ে তিনি চলে আসেন রাজধানীর বড় কাটারা মাদরাসায়। বড় কাটারায় পাঁচ বছর পড়ে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন। এ সময় তিনি পিরজী হুজুর রহ.সহ অন্যান্য মুরুব্বীদের বিশেষ সোহবত লাভ করেন। অতপর দুই বছরের জন্য তিনি পাকিস্তানের জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে ভর্তি হন। সেখানে প্রথম পুনরায় দাওরা পড়েন এবং দ্বিতীয় বছর ফুনুনাতের কোর্স সম্পন্ন করেন। তবে এবছরও বুখারী সহ একাধিক কিতাব তিনি পুনরায় ‘সামাআত’ করেন।

পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়ায় অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। এখানেই তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমুদুল হাসান এবং আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহসহ দেশের অপর কয়েকজন বিখ্যাত আলেম।

কিশোরগঞ্জে ৯ বছর থাকার পর তিনি রাজধানীর ফরিদাবাদ, বড় কাটরা মাদরাসায় কিছুদিন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরে স্থানীয় আলেমদের সুপারিশে নিজ এলাকার মাদরাসা কাসিমুল উলুমের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আমৃত্যু এই মাদরাসার পরিচালনা করেন। শেষ জীবনে অবশ্য তিনি রাজধানীর মালিবাগ জামিয়া, রাহমানিয়া, ময়মনসিংহের জামিয়া ইসলামিয়াসহ দেশের অনেক জায়গায় বুখারী শরীফের দরস প্রদান করতেন।

আত্মশুদ্ধি এবং আত্মগঠনের নিমিত্তে আল্লামা আশরাফ আলী রহ. ছাত্র থাকাকালেই নিজেকে সপে দিয়েছিলেন হাকিমুল উম্মতের বিশিষ্ট খলিফা আল্লামা রসূল খান রহ.-এর হাতে। তার থেকে খেলাফতও লাভ করেন। তার ইন্তিকালের পর হাকিমুল ইসলাম মাওলানা ক্বারী তয়ৈব রহ.-এর সাথে ইসলাহি সম্পর্ক গড়েন। তার ইন্তিকালের পর পাকিস্তানের হাকীম মুহাম্মদ আখতার রহ.-এর দরবারে নিজেকে সপে দেন এবং খেলাফত লাভ করেন। শেষ জীবনে তিনি হাটহাজারীর আল্লামা আহমদ শফি সাহেবের সাথে ইসলাহি সম্পর্ক রাখতেন।

এসব তথ্য জানা যায় আল্লামা আশরাফ আলী রহ.-এর ছেলে মুফতি শুয়াইব এবং ভাগনে মুফতি মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা আশরাফীর সাথে কথা বলে।

মামার স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে মুফতি শামছুদ্দোহা ইসলাম টাইমসকে জানান, আমাদের উপর মামার ইহসান অনেক বেশি। নানা ব্যস্ততার মাঝেও আমরা কখন কী করছি তার সব খোঁজই মামা রাখতেন। বোনদের যাবতীয় হক তিনি খুব দায়িত্বের সাথে আদায় করে দিয়েছেন। মামা থেকে আমরা শুধু ইহসান আর ইহসানই পেয়েছি।

মুফতি শামছোদ্দোহা আরও বলেন, আমি নিজে ওয়াজ মাহফিলে আলোচনা করা সহ বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত মামাই ঠিক করে দিতেন, কোন কোন প্রোগ্রামে যাওয়া যাবে। কোন কোন প্রোগ্রামে যাওয়া যাবে না।

নিজের উপর বাবার তরবিয়তের কথা স্মরণ করে মুফতি শুয়াইব আহমদ বলেন, আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে তো বাবা খোঁজ নিতেনই পাশাপাশি আমরা কাদের সাথে মিশছি, তারা কেমন সে বিষয়েই বাবা ছিলেন সদা সতর্ক। অসৎ সঙ্গ বাবা একদম সহ্য করতে পারতেন না। এছাড়া বেআদবি, বেউসুলি,(অনিয়ম) এবং বেআকলি (নির্বুদ্ধিতা) ছিল বাবার সহ্যের বাইরে। এই তিনটি ব্যাপারে বাবা খুব কঠোর ছিলেন। আমাদেরও এ ব্যাপারে সবসময় সতর্ক করতেন।

মুফতি শুয়াইব আরও বলেন, সুন্নতের পূর্ণ অনুসরণের চেষ্টার পাশাপাশি যে কোনো ধরনের গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারেও বাবা ছিলেন পূর্ণ মনযোগী। একবারের ঘটনা শোনা যায়, তখন বাবার বয়স পয়তাল্লিশ পেরিয়ে গেছে। নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে তখন হাঁটতে বেরুতেন কাসিমুল উলূম মাদরাসা থেকে। একদিন সকালে কয়েকজন নারী রাস্তায় বাবাকে সালাম দিলে তিনি নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করে বাইরে হাঁটতে যাওয়ার আমলই ছেড়ে দিলেন। এরপর থেকে মাদরাসার ভেতরেই বাবা সকালের হাঁটার আমল সম্পন্ন করে নিতেন।

আল্লামা আশরাফ আলী রহ.-এর একাধিক ছাত্র, শিষ্য এবং মুরিদ থেকে শোনা গেছে তিনি তিনটি বিষয়ে সবসময় নসিহত করতেন। ১. গোনাহ যত ছোটই করব না। ২. সুন্নত যত সামান্যই হোক ছাড়ব না। ৩. এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করব না।

আল্লামা আশরাফ আলী রহ. ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের মহিরুহ আলেম। তিনি ছিলেন একাধারে বেফাকুল মাদারিসের সিনিয়র সহ সভাপতি, হাইআতুল উলয়ার কো চেয়াম্যান এবং অনেক মাদরাসার পৃষ্ঠপোষক এবং শায়খুল হাদিস।

গত ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর আসগর আলী হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় তার ইন্তিকাল হয়। পরে নিজ এলাকা কুমিল্লা জেলা সদর দক্ষিণ উপজেলার আলিবাজার মাঠে তার জানাযাহ অনুষ্ঠিত। জানাযার ইমামতি করেন আল্লামা শাহ আহমদ শফি সাহেব। জানাযা শেষে অসিয়ত অনুযায়ী নিজ বাবার কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়।

পূর্ববর্তি সংবাদইন্দোনেশিয়ার বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৩
পরবর্তি সংবাদবিয়ের কথা বলে নারীকে ‘ধর্ষণ’, পুলিশের এসআই আটক