শৈশবের সেই মুয়াজ্জিন

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

আমাদের গ্রামের বাড়িটি এখন শহুরে হয়ে গেছে। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন সেটি গ্রামই ছিলো। বাংলার গ্রাম বলতে যেমনটা বুঝায় ঠিক তেমন।

ঘন গাছগাছালিতে ঘেরা দাদার ভিটা এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে। সন্ধ্যারাতেই সেটা হয়ে যেত এক নিঝুমপুরী। বড়রা হাট-বাজার থেকে ফিরতেন। দেশের হালচাল কিংবা সাংসারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্পগুজব করতেন। এরপর এশার নামায পড়ে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমুতে যেতেন। আমরা ছোটরা সন্ধ্যা হলে একটু বই নিয়ে বসতাম। একটু পড়া একটু দুষ্টুমি, এই যা। এরপর কখন ঘুমকাতর চোখ পর্দা ফেলে দিত টের পেতাম না। রাতের খাবার নাকি আম্মুর কোলে বসে ঘুমের ভেতরেই সারা হতো।

মাঝরাতে তখন প্রায়ই ঘুম ভাঙতো। আবার কখনো একটানা ঘুম সমাপ্ত হতো প্রভাতে। দূরের মিনারে যখন আযান দিতেন মুয়াজ্জিন। কয়েকদিন সে আযান শোনার পর ঘুম ভাঙলেই আমি আযানের অপেক্ষা করতাম। কান পেতে অধীর আগ্রহ নিয়ে আবার ঘুমিয়ে যেতাম। মাঝরাতের ঘুম। আবার কখনো ঘুমের ভেতরেই শুনতে পেতাম সেই আযান। স্বপ্নে কিংবা কল্পনায়। এভাবে একটি আযান যখন আমার শিশুমনকে ব্যাকুল করে তুলল, তখন মনে হতো আমি ঘুমুতাম শুধু জাগার জন্যে। নিঝুম রাতে জেগে জেগে একটি আযান শোনার জন্যে। কী কোমল! কী করুণ! কী আবেদনময় সেই আযান!

নিজের অজান্তেই একদিন সেই আযান আমার মুখস্থ হয়ে গেল। তখন সন্ধ্যা হলেই বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে আযান দিতাম। আম্মা হয়তো মুখ লুকিয়ে হাসতেন। তবে কাছে এসে ভক্তশ্রোতার মতো শুনতেন আমার আযান। সাবাশি দিতেন। খুব ভালো লাগত।

দিনে কয়বার আযান হয় তখনও বোধ হয় জানতাম না। যতটুকু মনে পড়ে, প্রভাতে আর সন্ধ্যায় দু’বেলায়ই আমার শোনা হতো। পরে যখন জেনেছি, তখন আর সেই শৈশব ছিল না। ছিল না সেই অবুঝ আগ্রহ। সীমাহীন ব্যাকুলতা।

একদিন মসজিদে গেলাম শুধু মুয়াজ্জিন সাহেবকে দেখার জন্যে। কিন্তু সাহস করে কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। ফিরে এলাম। এভাবে আরো কয়েকদিন গেলাম। একদিন গেলাম ঠিক আযানের আগ মুহূর্তে। তখন আমার বয়স সাত-আট বছর হয়ে গেছে। আমি নামাজের কাতারে বসে আছি। বসে আছেন আরো অনেকে। শুধু তিনি একা দাঁড়িয়ে। মাইকের সামনে। হাত দু’টো দুই কানে রেখে বলছেন আযান-বাক্য। ভাঙা ভাঙা সুরে কী দ্যোতনা! শত বছর আগের পুরনো মসজিদটি যেন গুনগুন করছে। শব্দের পর শব্দ, বাক্যের পর বাক্য ফিরে ফিরে আসছে। এদিক ওদিক থেকে। এ দেয়াল ও দেয়াল থেকে। কী আবেশ! কী আন্দোলন! আমি অভিভূত হলাম। পুলকে ভেতরটা ভরে উঠলো।

এ ঘটনা আজ থেকে কম হলেও বিশ বছর আগের। কিন্তু  ঘটনার আবহ আনন্দ এখনো আমি অনুভব করি একেবারে নতুনের মতো। যেন সেদিন মাত্র ঘটলো।

আমার শৈশবের সেই মুয়াজ্জিন এখনো জীবিত আছেন। সুবহে সাদিকের অনেক আগে এখনো তিনি মসজিদে আসেন। ধীর কদমে, শান্ত ভঙ্গিতে। তাহাজ্জুদ পড়েন। গভীর মোনাজাতে মগ্ন থাকেন দীর্ঘ সময়। একদিন আমি গিয়ে দেখি পুরো মসজিদে তিনি একা। তসবিহ জপছেন। শত বছরের পুরনো মসজিদ। হাত দুয়েক প্রশস্ত একেকটা দেয়াল। সবকিছু শান্ত। নীরব। আমি পা টিপে টিপে তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম। সম্বোধনহীন বাক্যে বললাম—আপনার আযান শোনলে আমি যেন কেমন হয়ে যাই। এত সুন্দর সুকরুণ আযান আর হয় না। তিনি আলতো করে হাসলেন। বললেন, আপনারা বড় মানুষ। কত বড় আলেম! আমরা মূর্খ-সুর্খ মানুষ। আল্লাহর কাছে আমগোর লিগা শুধু একটু দোয়া করবেন।

তাঁর কথা শোনে আমার চোখদু’টো ছলছল করে উঠল। ছোট বাচ্চার সামনে এই অকৃত্রিম বিনয় দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এলো।

পূর্ববর্তি সংবাদখালেদা জিয়াকে সরকার মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে: মির্জা ফখরুল
পরবর্তি সংবাদসরকারের বছরপূর্তি : সন্ধ্যায় ভাষণ দিবেন প্রধানমন্ত্রী