ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী রহ.: ইলমে হাদীসের কিংবদন্তি ‍

আবদুর রহমান তাশরীফ ।।

হিজরি প্রথম শতাব্দীর কিংবদন্তি পথিকৃত তাবেয়ী ইমাম যুহরী রহ.। ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী হাদীস সংকলনের অগ্রপথিক, অন্যতম পথিকৃত তাবেয়ী ফকীহ। অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফেজে হাদীস। হাদীস, ফিকহ, সুন্নাহ ও মাগাযীর বরিত ইমাম। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সর্ব প্রথম হাদীস সংকলন করেন তিনি। তাকে বলা হতো ‘আ’লামুল হুফ্ফাজ’।

তিনি সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা., সাহল ইবনে সাদ রা., সায়্যিদুত তাবেয়ী সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ.-সহ শীর্ষস্থানীয় অনেক তাবেয়ীর শিষ্য। আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ, আমর ইবনে দীনার রহ, ইমাম আযম আবু হানীফা রহ, ইমাম মালেক রহ, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ.-সহ অনেক মহান মনীষী তার ছাত্র।

খলিফা উমর বিন আব্দুল আযীযের শাসনামলে হাদীস সংকলনের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গৃহীত হয়। হাদীস বিশেষজ্ঞ বড় তাবেয়ীদের এই মহান প্রয়াসে আহবান জানানো হয়। খলীফার আদেশে এগিয়ে আসেন ইমাম যুহরী। তিনি হয়ে উঠেন এই উদ্যোগের কেন্দ্রীয় ব্যাক্তিত্ব। এভাবে হিজরী প্রথম শতাব্দীর গোড়াতেই সর্ব প্রথম রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে হাদীস সংকলন করেন ইমাম যুহরী।

ইমাম মালেক র. বলেন, সর্ব প্রথম ইলমের সংকলন করেন, লিপিবদ্ধ করেন ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীতে উল্লেখ করেন, খলীফ উমর ইবনে আব্দুল আযীযের নির্দেশে যিনি সর্ব প্রথম ইলম সংকলন করেন তিনি হলেন ইমাম যুহরী। এভাবে হিজরী প্রথম শতাব্দীতেই হাদীস সংকলনের মহান কার্যক্রমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সূচনা হয় একসাথে।

দুই.

আ’লামুল হুফ্ফাজ ইমাম যুহরী বিভিন্ন শাস্ত্রে ও শাখার ইলমে নানামাত্রিক অবদান রেখেছেন। হাদীস ও সুন্নাহর সংরক্ষণ ও প্রচার-প্রসারে প্রায় পুরো জীবন ব্যায় করেছেন তিনি। হাদীসের সনদের প্রতি গুরুত্বারোপ, সুন্নাহর সংরক্ষণসহ হাদীস ও সুন্নাহর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খেদমতের জন্য চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবেন তিনি।

মাগাযী বিষয়ক সর্বপ্রথম গ্রন্থ- বলা হয়, তিনিই রচনা করেন। তবে মাগাযী শাস্ত্র তাঁর হাত ধরে গড়ে উঠে। ইমামুল মাগাযী মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ও মাগাযী শাস্ত্রের অন্যতম পথিকৃত মূসা ইবনে উকবা তাঁর বিশিষ্ট শিষ্যদের অন্যতম। আরব ঘটনা-গল্প, কবিতা-বাগধারা, সাহিত্য-সমালোচনাসহ জ্ঞানের নানাধারায় তাঁর বিচিত্র অবদান।

তার কৃর্তিত্ব, গুণ ও বৈশিষ্ট্য এবং স্মৃতিশক্তির প্রখরতা এত বেশি যা গণনার বাইরে। ‘তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত’ কিতাবে ইমাম নববী রহ. এমনটিই লিখেছেন তাঁর সম্পর্কে। এভাবেই তাঁর মূল্যায়ন করেছেন রিয়াযুস সালিহীনের লেখকও।

সাহাবা পরশে দ্বীপ্ত ৫১ হিজরীর মদীনায় জন্ম ইমাম যুহরীর। বাবা মুসলিম কুরাইশ বংশের বনু যোহরা ধারার। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা:-এর সাথী ও সহযোদ্ধা ছিলেন। পিতামহ ইবনে শিহাব বনু যুহরা ধারার সন্তান হওয়ায় ইমাম যুহরী বিখ্যাত হয়ে উঠেন ইবনে শিহাব যুহরী নামে। শৈশবেই পিতৃহারা হন ইমাম যুহরী।

আজন্ম মেধাবী ইমাম যুহরীর জানার আগ্রহ, ইলমের স্পৃহা ও শিক্ষা অর্জনের স্বভাবজাত যোগ্যতা তাঁর শৈশব থেকে আয়ত্বাধীন। অল্প বয়স থেকেই ইলমের সন্ধানে সাধনার জীবনে পথ চলেন তিনি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে অসাধরণ ধীশক্তি দান করেছিলেন। আপন স্মৃতি শক্তির প্রখরতার ব্যাপারে তিনি নিজেই বলেন, ‘হৃদয়ের সিন্দুকে আমি এমন কিছুই গচ্ছিত রাখিনি, যা পরে ভুলে গেছি।’

এ শানিত মেধার বলেই তিনি আয়ত্বে রেখেছিলেন হাদীস ও সুন্নাহর বিশাল ভান্ডার। বিভিন্ন সাহাবীর সান্নিধ্য, শীর্ষস্থানীয় তাবেয়ীদের শিষ্যত্বের সৌভাগ্য শৈশবেই অর্জিত হয় তাঁর।

তিন.

সাধনামুখর জীবনের কিংবদন্তি ইমাম যুহরী হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব রহ.-এর সান্নিধ্যে ছিলেন প্রায় সাত-আট বছর বা আরো বেশি সময়। তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন ইলম, আখলাক ও দ্বীন। সাঈদ ইবনে মুসায়্যিবের সান্নিধ্যে থাকাকালে ইলমের মনি-মানিক্য কুড়িয়ে কুড়িয়ে সংগ্রহের গল্প তার জীবনের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

সাহাবা-তাবেয়ীদের পদচারণায় দীপ্ত মদীনার প্রায় প্রতিটি অলি-গলি কোনো না কোনো শাস্ত্র অথবা শাখার ইলমের কেন্দ্র ছিল। সাঈদ ইবনে মুসায়্যিবের কাছে দরসের আগে-পরে ইলম-শিক্ষার্থী যুহরী মদীনার ঘরে ঘরে ঘুরে সংগ্রহ করতেন ইলম। কোনো বিদুষি মহীয়সীর সন্ধান পেলে ছুটে যেতেন তাঁর বাড়িতেও। নিঃসঙ্কোচে শিখতেন মদীনার শিশুদের কাছ থেকেও। মদীনার দ্বীনি আবহ থেকে সবসময় উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। শেখার এই মানসিকতা তিনি ধরে রেখেছিলেন আমৃত্যু। ইলমের প্রতি তাঁর এই নিবেদন তাঁকে উপহার দিয়েছে ইলমের বিশাল পাণ্ডিত্য ও জীবনভর নানা ইলমি অবদান রাখার সৌভাগ্য। নিবেদিত প্রাণ এই ইলমি মনীষী মধ্য যৌবনে হয়ে ওঠেন সুন্নাহ বিষয়ে সময়ের সবচে বিজ্ঞ মনীষী। খলিফা উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. বলেন, বিগত সুন্নাহর ব্যাপারে যুহরীর চেয়ে বিজ্ঞ কেউ বেঁচে নেই।

এ মহান মনীষীর ইলমি জীবনের সঙ্গী আবুয যান্দ বলেন, যুহরীর সাথে আমরা মদীনার আলেমদের বাড়ি বাড়ি ঘুরতাম। তার সাথে থাকতো লেখার উপকরণ। যা কিছু শুনতেন লিখে ফেলতেন তিনি। তার ব্যাপাক আগ্রহের কথা উল্লেখ করে আবুয যান্দ আরো বলেন, আমরা শুধু হালাল-হারামের ইলম লিখতাম, তিনি যা কিছু শুনতেন লিখেনিতেন। পরবর্তি সময়ে যখন প্রয়োজন অনুভব করেছি, তখন বুঝেছি তিনি আমাদের মধ্যে সবচে বড় আলেম।

আসলেই সাধনাময় জীবন ইমাম যুহরীকে উপহার দিয়েছিল বিশাল বিশাল কীর্তি। তিনি বলতেন, ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে আমার মত এতকষ্ট আর কেউ করেনি। ঠিক তিমনি ইলমের প্রচার-প্রসারেও।

চার.

এ মহান মনীষী অত্যন্ত বিনয়ী, দানশীল ও মহানুভব ছিলেন। পথঘাটে মানুষের জন্য পানি পানের ব্যবস্থা করা, মানুষের প্রয়োজন পুরা করা ও অভাব-অনাথ মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইত্যাদি সেবামূলক কাজের জন্য তাঁর খ্যাতি ছিল। ছিলেন সময়ের একজন বিশুদ্ধভাষী ভাষক।

মহান ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী রহ. ১২৪ হিজরিতে শাম ও ফিলিস্তিনের মাঝামাঝি সীমান্তবর্তি এক গ্রামে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মিশরের ড. মুস্তফা সিবায়ী রহ. ‘আস সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা ফিত তাশরিয়ীল ইসলামী’ নামক কিতাব। এতে তিনি যুহরীর জীবনের ওপর প্রাচ্যবিদদের আরোপিত বিভিন্ন অপপ্রচার ও মিথ্যা অভিযোগের অসারতা তুলে ধরেছেন।

[তথ্যসূত্র: তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ ১/১১১, আস সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা ফিত তাশরিয়ীল ইসলামী, ইসলামী বিশ্বকোষ ২১ তাম খন্ড]

 

পূর্ববর্তি সংবাদনির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে আতিকুলের সভায় এমপি সাদেক
পরবর্তি সংবাদসরকার-রাষ্ট্রপতি দু’জায়গাতেই বেগম জিয়ার সাজা কমানোর সুযোগ আছে: আইনমন্ত্রী