মুহাম্মদ আব্দুস সালাম ।। মিসর থেকে
মসজিদ আল্লাহর ঘর। আল্লাহ তাআলার নিকট পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা প্রিয় জায়গা। মসজিদের প্রধান আমল প্রাত্যহিক নামায আদায় করা। তবে তা-ই একমাত্র লক্ষ্য উদ্দেশ্য নয়। বরং মসজিদ হলো মুসলমানদের সকল ধর্মীয় কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র। ব্যক্তি ও সমাজের সংস্কার ও সংশোধনের প্রধান স্থান।
সমাজ সংশোধন ও সংস্কারের জন্য মসজিদভিত্তিক প্রচেষ্টা মসজিদের বাইরের প্রচেষ্টা থেকে অনেক বেশি সহজ, কার্যকর ও সফল বলে প্রমাণিত হয়েছে। অতীতের সংস্কার ও দাওয়াতি কর্মকান্ডগুলো বেশীর ভাগ মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মসজিদকে কেন্দ্র করে আমরা যে সব কর্মসূচি ও পরিকল্পনা হাতে নিতে পারি, তার একটি সংক্ষিপ্ত খসড়া তালিকা নীচে পেশ করা হল।
পরিকল্পনাসমূহ
১. নামায সংক্রান্ত কর্মসূচি
ক) মসজিদের প্রধান আমল নামায আদায়। তাই এই আমলটিকে তার যথাযথ হক অনুযায়ী সকল আহকাম ও আদাবের প্রতি লক্ষ রেখে পূর্ণাঙ্গরূপে জারি করা।
খ) তালীমুস সালাত বা নামায শিক্ষা। এই প্রশিক্ষণ শিশু কিশোর, যুবক বৃদ্ধ, নারী পুরুষ সকলের জন্য চালু করা। এই প্রশিক্ষণে নামায আদায়ের আবশ্যক সকল ইলম, বিধান, মাসায়েল, কোরআন, দোয়া ও আদাব ইত্যাদি শেখানো।
গ) নামাযের প্রতি দাওয়াত। মসজিদ এর পক্ষ থেকে কার্যকারী বিভিন্ন পন্থায় এই উদ্যোগ নেওয়া। যাতে এলাকার প্রতিটি মানুষ নামাযী ও মসজিদমুখী হয়ে যায়।
২. তালীমুল কুরআন প্রোগ্রাম
এই প্রোগ্রামটিও ছোট বড় সবার জন্য আলাদা আলাদা ভাবে চালু করা। এটা সকাল বিকাল বা বিশেষ কোন নামাযের পরে অথবা রাতে এভাবে দৈনিক সাপ্তাহিক পাক্ষিক বা মাসিক সুবিধা অনুপাতে বিভিন্ন শিফটে করা যায়। তালিমুল কোরআনের প্রশিক্ষণ কয়েক ভাবে হতে পারে। যেমন,
ক) নামাযের জন্য আবশ্যক পরিমান কোরআন সহিশুদ্ধ-করণ ও মুখস্ত-করণ প্রোগ্রাম।
খ) পুরো কোরআনের পাঠ ও সহিশুদ্ধ-করণ প্রশিক্ষণ।
গ) কোরআনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা পুরো কোরআন হেফযকরণ প্রোগ্রাম।
ঘ) কোরআনের হুকূক, আদাব, ফাযায়েল ও মাসায়েল শিক্ষাদান।
ঙ) সাধারণের উপযোগী করে কোরআন তরজমা ও সংক্ষিপ্ত তাফসীরের পাঠ দান।
চ) কোরআনে উল্লেখিত কাহিনী, নসিহত ও কোরআনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা মজলিস করা।
ছ) কোরআনের বিষয়ভিত্তিক তাফসীর ও সাম্প্রতিক নানান ইস্যু নিয়ে কোরআনের আলোকে আলোচনা সভা করা।
জ) কোরআনের প্রতি দাওয়াত। সমাজের একজন সদস্যও যেন কোরআন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না থাকে সেজন্য মসজিদের পক্ষ থেকে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। দাওয়াত দেওয়া।
ঝ) মাঝে মাঝে কোরআন সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞানের মজলিস করা এবং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।
ঞ) আলেম ওলামা ও ইসলামী শিক্ষার উচ্চ স্তরের ছাত্রদের জন্য কোরআনের গবেষণামূলক আলোচনা ও তাফসীরের দরস চালু করা।
৩. ফরযে আইন-ইলম প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম
এটাও সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য বিভিন্ন শিফটে হতে পারে। যেমনটা পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে। এ বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। এর রয়েছে অনেক শাখা প্রশাখা।
ফরযে আইন ইলম ও বিধান প্রধানত দু প্রকার। এক, যা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দুই, যা স্থান কাল পাত্র পেশা ও অবস্থা ভেদে ব্যক্তিবিশেষের সাথে প্রযোজ্য।
তো প্রথম প্রকারের ক্ষেত্রে আমরা মোটামুটি নিম্নোক্ত প্রধান প্রধান শিরোনাম ও অধ্যায়গুলো দিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে পারি।
ক) ঈমান আকিদা, তাওহীদ রিসালাত আখেরাত, শিরক কুফর বিদআত, আরকানে ইসলাম, ফারায়েযে ইসলাম, ওয়াজিবাতে ইসলাম, ইবাদাত আযকার, আখলাক, মোয়ামালাত, মোয়শারাত, আত্মশুদ্ধি, আদাবে ইসলাম, শাআয়ের ইসলাম, হালাল হারাম, গুনাহসমূহ, কুসংস্কার অপসংস্কৃতি, হুকুকুল্লাহ, হুকুকুল ইবাদ, হাদিস, সিরাত সুন্নাহ ও সিরাতে সাহাবা ইত্যাদি সর্বসাধারণকে শেখানোর ব্যবস্থা করা।
খ) হজ যাকাত ও রোযার ফাযায়েল মাসায়েল নিয়ে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করা।
গ) দ্বিতীয় প্রকারের ফরযে আইনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক শ্রেণীর মানুষকে আলাদা আলাদা ভাবে একত্র করে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সভা ও সেমিনার করা। যেমন, ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা সেমিনার। চাকরিজীবীদের জন্য আলাদা সেমিনার। এভাবে শিক্ষক ও পিতামাতাদের জন্য আলাদা আলাদা আলোচনা সভার আয়োজন করা।
ঘ) দৈনিক সাপ্তাহিক প্রশ্নোত্তর পর্বের আয়োজন করা। যেখানে উন্মুক্তভাবে যে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করে ইসলামের হেদায়েত ও নির্দেশনা জানার সুযোগ থাকবে।
৪. সামগ্রিক দীনি ইলম চর্চা প্রোগ্রাম
এই প্রোগ্রামটি ও অনেক ব্যাপক। তবে উল্লেখিত বিষয়গুলো দিয়ে কার্যক্রম শুরু হতে পারে। যেমন,
ক) সীরাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ,সিরাতে সাহাবা, ইসলামী শাসন ও ইতিহাসের দরস।
খ) আরবীতে অভিজ্ঞ উচ্চশিক্ষিতদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ কিছু কিতাবের দরসের আয়োজন করা। এটা হতে পারে তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, আখলাক ও আত্মশুদ্ধি বা অন্য কোন বিষয়ে।
গ) সাধারণের উপযোগী করে দরসে হাদীসের ব্যবস্থা করা।
ঘ) কোরআন সুন্নাহর ভাষা আরবি। তাই অন্ততপক্ষে যেন মানুষ কোরআন সুন্নাহকে সরাসরি তার নিজ ভাষা থেকে বুঝতে পারে, সে লক্ষ্যে সাধারণ শিক্ষিতদের জন্য তাদের উপযোগী করে আরবি ভাষা শেখানোর দরস চালু করা।
ঙ) ইমাম প্রশিক্ষণের আয়োজন করা।
চ) পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা। এটা কক্ষ বিশিষ্ট ও ভ্রাম্যমান দুরকমই হতে পারে।
ছ) মসজিদের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা।
৫. দাওয়াতি প্রোগ্রাম
এটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। বিভিন্ন রূপে তা আঞ্জাম দেওয়া যেতে পারে। যেমন,
ক) যে সকল মানুষ নামায পড়ে না বা মসজিদে আসে না তাদের নিকট দাওয়াতি সদস্য পাঠিয়ে তাদেরকে মসজিদে নিয়ে আসার চেষ্টা করা।
খ) যেসব শিশু মকতবে আসে না তাদের অভিভাবকদের বুঝিয়ে এবং শিশুদেরকে উৎসাহিত করে মকতবে নিয়ে আসা।
গ) সমাজের যেসব মানুষ তালিমুল কোরআন সহ অন্যান্য প্রোগ্রামে আসে না তাদেরকে সেগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য দাওয়াত দেওয়া।
ঘ) সমাজের যেসব যুবক বিভিন্ন অপরাধ প্রবনতার সাথে জড়িত তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে সেসব থেকে ফেরানোর চেষ্টা করা।
ঙ) মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর প্রতিষ্ঠিত দাওয়াতের মেহনতকে জোরদার করা।
৬. ওয়াজ ও বয়ান প্রোগ্রাম
ওয়াজ ও বয়ান দীন প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই প্রোগ্রামটি নানান ভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। যেমন,
ক) জুমার খুতবা। এই বিষয়ে এটিই সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। স্বয়ং শরীয়ত তা স্থির করে দিয়েছে। এই জুমার খুতবা যে কী বিস্ময়কর ও সাড়া জাগানো ভূমিকা রাখতে পারে তার সাক্ষী হলো আমাদের আলোকময় অতীত। কিন্তু আজ যেন তা অনেকটা প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। তাই আমাদেরকে লক্ষ্য স্থির করে যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে এই মহান দায়িত্বে ব্রতী হতে হবে।
খ) সাপ্তাহিক পাক্ষিক বা মাসিক ইসলাহী বয়ানের ব্যবস্থা করা।
গ) বিশেষ বিশেষ সময়, দিবস ও ইস্যু উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা।
ঘ) বাৎসরিক মাহফিল করা।
ঙ) শিশু কিশোর, শিক্ষার্থী, যুবক শ্রেণি ও মহিলাদের জন্য আলাদা আলাদা আলোচনার আয়োজন করা।
৭. মিডিয়া প্রোগ্রাম
বিশ্বায়ন ও আকাশ সংস্কৃতির এই সময়ে মিডিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই মসজিদ কর্তৃপক্ষ এই মাধ্যমেও দাওয়াত ও সমাজ সংস্কারের কাজ করতে পারে। এটা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন,
ক) গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে রচিত পরিচিতি, লিফলেট, বই পুস্তক বিতরণ করা এবং ব্যানারিং ও পোস্টারিং করা।
খ ) ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন অনলাইন চ্যানেল খোলা। যেগুলোতে দীনি আলোচনা ও লেখালেখি প্রচার করা হবে।
গ) বড় বড় বিশেষ মসজিদগুলোর পক্ষ থেকে দীনি পত্রপত্রিকার আয়োজন করা।
ঘ) শীর্ষস্থানীয় মসজিদগুলোর পক্ষ থেকে রেডিও বেতার ও রেডিও এফ এম চালু করা।
৮. সেবামূলক প্রোগ্রাম
এই অঙ্গটিকে ইসলাম অতি গুরুত্বের সাথে দেখে। তাই এর প্রতি নানানভাবে তাগিদ করেছে। খিদমতে খালক বা সমাজ কল্যাণমূলক কাজের পরিধি ও ধরণ অনেক অনেক বিস্তৃত। এখানে বিশেষ কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
ক) সমাজ কল্যাণ তহবিল গঠন করা।
খ) ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান করা।
গ) যাকাত ফান্ড গঠন করা।
ঘ) ফ্রি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা।
ঙ) এলাকার গরীব অসহায়দের সার্বিক সহায়তা করা।
চ) গরিব ও এতিমদের বিবাহ প্রকল্প চালু করা।
ছ) প্রাকৃতিক দুর্যোগের ত্রাণ বিতরণ করা।
জ) সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করা।
ঝ) মেধাবী গরীব ছাত্রদের বৃত্তি প্রদান করা।
ঞ) শিক্ষাদান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেকারদের কর্মসংস্থান করা।
ট) শিশুদের জন্য ধর্মীয় আঙ্গিকে বিনোদনমূলক প্রকল্প চালু করা।
ঠ) এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ভূমিকা রাখা।
উল্লিখিত প্রকল্পগুলো ছাড়াও রয়েছে সেবার আরো অনেক অনেক দিক। তো কখন কোন খাতটি বেশি প্রয়োজন মসজিদ কর্তৃপক্ষের তা স্থির করে সে ব্যাপারে ভূমিকা রাখা।
তবে এসব কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য আবশ্যক হল মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসীর ঈমানি চেতনা, ধর্মীয় জ্ঞান-বোধ, সুন্দর মননশীলতা, উন্নত রুচিশীলতা, অদম্য স্পৃহা ও নিরলস প্রচেষ্টা।
মসজিদ যেহেতু সকল ভালো ও নেক কাজের উৎস তাই শুধু নামাযের জন্য মসজিদকে সীমাবদ্ধ না করে বরং তাকে তার মূলধারা ও ভূমিকায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বমহিমায় আবারো মসজিদকে পুনরুজ্জীবিত করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই আমরা মসজিদের সকল লক্ষ্য উদ্দেশ্যে পৌঁছাতে পারবো এবং তার সমস্ত কল্যাণ নেয়ামত বরকত ও ফযিলত লাভে ধন্য হবো। আল্লাহই তাওফীক দাতা।
লেখক: জামিয়া আযহারে অধ্যয়নরত
















