তুরস্কে জুমআর খুতবা: সন্তানকে চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলাই বাবার প্রধান কর্তব্য

তুরস্কের অধিকাংশ মসজিদে জুমার খুতবা রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত খুতবা একযোগে সকল মসজিদে পাঠ করা হয়। আজ শুক্রবার ২৪ জানুয়ারি সন্তান পালনে পরিবারের বাবাদের কর্তব্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়। তুরস্কের এরজিয়েস ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজে অধ্যয়নরত মাওলানা আহমদ আমীন আজকের খুতবা অনুবাদ করেন। ইসলাম টাইমস-এর পাঠকদের জন্য সে খুতবার অনুবাদ তুলে দেওয়া হল।


 

মানবসন্তানকে আল্লাহর দেয়া শ্রেষ্ঠ একটি নেয়ামত হলো পারিবারিক জীবন। কেননা পরিবারের আরেক নাম শান্তি, নিরাপত্তা ও আশ্রয়। পরিবার মানে শত সমস্যার শেষ ঠাঁই। পরিবার মানুষকে ভালো কাজে পরস্পরের সহযোগিতা ও হাতে হাত রেখে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সুযোগ করে দেয়। একই সাথে পরিবার আগামী দিনের যোগ্য উত্তরসূরী গঠনের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। শিশু প্রথমে পরিবার নামের প্রতিষ্ঠান থেকে শিখতে শুরু করে। তার চরিত্র পরিবারের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে। প্রতিটি শিশু অপরকে ভালোবাসা, সম্মান করা ও সততার শিক্ষা সবার আগে পিতা মাতা থেকে গ্রহন করে।

আদর্শ পরিবার গঠনে মায়ের পাশাপাশি বাবার উপরও গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব বর্তায়। পরিবারের কেবল অর্থিক প্রয়োজন মেটানোর দ্বারাই আদর্শ একজন বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সুহৃদ, চরিত্রবান, আত্মমর্যাদার অধিকারী হিসেবে সন্তানদের গড়ে তোলা তাঁর অন্যতম কর্তব্য। আলোচ্য বিষয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘সন্তানের জন্য পিতার রেখে যাওয়া উত্তম চরিত্র থেকে শ্রেষ্ঠ কোনো মিরাসী সম্পত্তি হতে পারে না।’ (তিরমিযি- হাদিস-৩৩)

বাবা হওয়া মানে হযরত নূহ আলাহিস সালামের মতো সন্তানকে ঈমানের ছায়ায় আশ্রয় করে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা। সন্তানের দুনিয়া আখেরাতের সফলতার চিন্তায় মগ্ন থাকা। পয়গম্বর নূহ আলাইহিস সালাম মুমিনদের সাথে নৌকায় উঠতে অস্বীকারকারী সন্তানকে সম্বোধন করে শেষ বারের মতো বাবাসুলভ আহ্বান করে বলেছিলেন, ‘…কলিজার টুকরা আমার, এসো। তুমিও আমাদের সাথে নৌকায় ওঠো। কাফেরদের সাথে জোট বেঁধো না।’ (সূরা হুদ, ১১/৪২)

বাবা হওয়া মানে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের মতো সর্বদা সন্তানের কল্যাণে দোআ করা। আল্লাহর অনুগত নেককার বান্দা হওয়ার চেষ্টা করা। সৎ ও যোগ্য উত্তরসূরীর জন্য আল্লাহর দরবারে হাত পাতা। কারণ ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে এভাবে দু’আ করেছিলেন, ‘ওগো আমাদের রব্, আমাদেরকে তোমার অনুগত বান্দাদের অর্ন্তভূক্ত করো। আমাদের বংশধরদের থেকে এক দলকে তোমার অনুগত বানাও। আমাদেরকে ইবাদতের নিয়ম কানুন শেখাও আর আমাদের তওবা কবুল করো। কারণ তুমিই শুধু তওবা কবুলকারীর পাশাপাশি অত্যাধিক দয়ালু।’ (সূরা বাকারা, ২/১২৮) ‘হে আমার পালনকারী, আমাকে ও আমার উত্তরসূরীকে পাক্কা নামাযি বানাও। হে আমাদের রব্, আমার দু’আ কবুল করো।’ (সূরা ইবরাহিম, ১৪/৪০)

বাবাকে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের মতো অটল অবিচল হতে হয়। বাবা হওয়া মানে যতো বড় বিপদ পরীক্ষার মুখোমুখি হোক না কেন ইয়াকুব আলাইহিস সালামের মতো ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের পরিচয় দেয়া। সন্তানের সামনে সর্বাবস্থায় সন্তোষ, প্রীতি, দয়া অনুগ্রহ, ন্যায় ও ভালোবাসার শিক্ষা তুলে ধরা। সন্তান ভুল করলে তাদেরকে সতর্ক করা কিন্তু তাদের ব্যাপারে নিরাশ না হওয়া। ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সন্তানেরা তাঁদের ভাই ইউসুফের প্রতি হিংসার বশীভূত হয়ে তাঁকে কুয়ায় ফেলে দিলে পিতা হিসেবে আল্লাহর এই পয়গম্বর বলেছিলেন, ‘…না, না। কুপ্রবৃত্তি তোমাদেরকে মন্দ কাজটি করতে উৎসাহিত করেছে। আমার কাজ হলো, সবর করা। তোমরা যা বলছো তার বিপরীতে কেবল আল্লাহ আমার সাহায্যস্থল।’ (সূরা ইউসুফ, ১২/১৮)

বাবা হওয়া মানে হযরত লুকমানের মতো সদয়ভাবে সন্তানকে উপদেশ দেয়া। তাকে সঠিক ভুল ও হালাল হারামগুলোর শিক্ষা দেয়া। তিনি আপন সন্তানকে উত্তম কিছু উপদেশ করেছিলেন। কুরআনের ভাষায় সেগুলো ছিলো, ‘প্রিয় সন্তান, আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না। কারণ শিরক মারাত্মক ধরণের গুনাহ।’ ‘প্রিয় সন্তান, গুরুত্বের সাথে নামায পড়ো, সৎ কাজে আদেশ দাও, মন্দ থেকে বারণ করো, মুসিবতে সবর করো।’ ‘অহংকারের বশে লোকদের হেয় মনে করো না। এবং এই দুনিয়ায় গর্ব করে হেঁটো না। ভুলে যেও না, দাম্ভিক অহংকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না।’ ‘চলাফেরায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো আর কণ্ঠস্বর নীচু রাখো।’ (সূরা লুকমান, ৩১/১৩, ১৭-১৯ )

বাবা হওয়া মানে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে সুন্নত মোতাবেক চলা। কেননা তিনি আদর্শ একটি পরিবারের পিতা ছিলেন। সন্তানদের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের কোনো পার্থক্য তিনি করতেন না। মেয়ে ফাতিমাকে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন। হাত ধরতেন। ভালোবাসায় চুমো খেতেন। নিজের স্থানে তাঁকে বসাতেন। (আবু দাউদ, অধ্যায়- আদব, হাদিস নং- ১৪৩, ১৪৪) আপন সন্তানদের নয় শুধু; তিনি সব শিশুদের সাথেই সদাচরণ করতেন। রাসূলের হাতে বড় হওয়া আনাস রাদি. বলেন, “দশ বছর আমি তাঁর খেদমত করেছি। শপথ আল্লাহর! দশ বছরে একবার আমাকে ‘উফ’ শব্দটি পর্যন্ত বলেন নি।” (মুসলিম, অধ্যায়- ফাযায়িল, হাদিস নং- ৫১)

আমাদের সন্তানেরা আমাদের থেকে উষ্ণ স্পর্শ ও সদব্যবহার আশা করে। তারা চায় আমরা যেনো তাদেরকে মূল্য দেই। জীবনপথে আমরা যেনো তাদের সঠিক পথের দিশা দেই। সংকীর্ণতা দেখা দিলে তাদের আশ্রয়স্থল হই। সুতরাং আসুন আজ থেকে আমরা দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্থতা ও রুজিরোজগারের পেছনে তাদের হকগুলো নষ্ট না করার বিষয়ে যত্নবান হই। তাদেরকে ইসলাম, দেশ ও জাতির জন্য সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বপ্রকারের চেষ্টা করি। প্রিয় সন্তানদের আমরা ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও দু’আ থেকে মাহরুম না করি।

পূর্ববর্তি সংবাদদশম শ্রেণির ছাত্রকে বলাৎকার, কুতুবদিয়ায় আ. লীগ নেতা ও তার সহযোগী আটক
পরবর্তি সংবাদতুরস্কে ভয়াবহ ভূমিকম্প, নিহত ১৮