‘মুসলিম উম্মাহর চিন্তাধারা সংস্কারঃ আলিম ও প্রগতিবাদী’

আশরাফ খান ।।

আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায়, গত ২৭, ২৮ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হল ‘ইসলামী চিন্তাধারা সংস্কার শীর্ষক আল-আযহার আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সম্মেলনের এক পর্বে শাইখুল আযহার ও কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বক্তব্য ও মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই এখানে শিরোনামটি নির্রাধারণ করা হয়েছে।

কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুহাম্মাদ আল-খিশত তাজদিদ বা সংস্কারের উপর একটি বক্তব্য পেশ করেন। সেখানে তিনি -বড় অন্যায় ভাবে- অনেক কিছুর দাবী করার চেষ্ঠা করেন। এক পর্যায়ে তিনি দাবী করেন যে, ‘আমাদের উচিত দ্বীনি উলুমের সংস্কার ও উন্নয়ন করা, তাকে জীবিত করা নয়। এর অর্থ দ্বীনি উলুমকে যদি আমরা ‘ইহইয়া’ জীবিত করি তাহলে এর অর্থ হবে সেই উলুম যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থাতেই টিকিয়ে রাখা, আর যদি সেটাকে সংস্কার করি তাহলে এর অর্থ হবে সেটাকে নতুন করে রচনা বা বিশ্লেষণ করা।

উদাহরণ হিসাবে তিনি ইমাম শাফেয়ি রাঃ এর কথা উল্লেখ করে বলেন যে, আজকে যদি ইমাম শাফেয়ি বেঁচে থাকতেন তাহলে তাঁর ফিকাহ কিতাবে যেমন লিপিবদ্ধ আছে, অবশ্যই তার থেকে ভিন্ন হত। একই কথা ইমাম আবু হানিফা রাঃ এর ব্যাপারেও তিনি দাবী করেন। ইমাম শাফেয়ী রাঃ যখন মক্কায় ছিলেন সেই সময়ের তাঁর ফাতওয়া তাঁর ইরাক ও মিশরে থাকার সময়ের ফাতওয়া থেকে আলাদা।

তাঁর লেখা একটি কিতাবের নাম দিয়েছেন ‘নাহওয়া তা’সিস আসরি দিনিন জাদিদ’ অনুবাদ সম্ভবত এমন হতে পারে ‘দ্বীনের নতুন যুগ নির্মাণের দিকে’

তাঁর আলোচনাতে আরো অনেক বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তবে তাঁর বেশীর ভাগ দিকই ছিল সত্য থেকে দূরে, হাকিকত ও ইনসাফের বিপরীত ।

সম্মেলনে শাইখুল আযহার উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্যের শেষে সম্মেলনের রীতি অনুযায়ী তিনি কিছু মন্তব্য করেন। মন্তব্যটি যেমন জরুরী ছিল ঠিক তেমনি অনেক অর্থপুর্ণও ছিল। তাঁর মন্তব্যের কিছু অংশ ছিল নিম্মরুপঃ

“তুরাসের ব্যাপারে সর্বোচ্ছ সমালোচনা করে যা বলা হয়ে থাকে তা মোটামুটি এই ‘তুরাসকে গ্রহণ করা যাবে না, তুরাস অনুযায়ী আমল করা যাবে না, তুরাস এই যুগের জন্যে উপযুক্ত নয়’ এই জাতীয় কিছু মন্তব্য করা হয়ে থাকে।
এই তুরাসই সেই তুরাস যা আরব জাতি যারা একে অপরের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিল, তাদেরকে মাত্র ৮০ বছরের মধ্যে এমন ভাবে তৈরি করেছে যে তারা এই অল্প সময়ের মধ্যে একটি দিকে স্পেন আরেক দিকে চীনের মধ্যে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। এই তুরাস একটি পরিপুর্ণ জাতি তৈরি করেছে”।

আলোচককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেনঃ “ফরাসি উপনিবেশের আগে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে নিজেদেরকে পরিচালতি করছে? তারা তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা সবকিছু এই তুরাসের মাধ্যমেই পরিচালিত করেছে। মুসলিম সভ্যতা এই তুরাসের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে। তুরাসকে এই ভাবে কল্পনা করা যে, এই তুরাস আমাদের অগ্রগতির জন্য বাঁধা বা প্রতিবন্ধক এই কল্পনা নিঃসন্দেহে তুরাসের প্রতি চরম অবিচার ছাড়া আর কিছু না”।

“আমরা তুরাস থেকেই এই বক্তব্য পায় যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাঃ বলেন ‘আমার তাকলিদ করো না, (ইমাম শাফেয়ি বা মালিক রাঃ এর তাকলিদ করো না, বরং তারা যেখান থেকে গ্রহণ করেছেন তোমারাও সেখান থেকে (সেই মূল উৎস থেকে) গ্রহণ করো’। সুতরাং এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, তাজদিদ বা সংস্কারের যে দাবী আজ তোলা হচ্ছে তা প্রগতিবাদের কোন দাবী নয় বরং এটা তুরাসেরই একটি দাবী। প্রগতিবাদীরা যখন ‘সংস্কারের’ দাবী করে থাকে তখন তারা তুরাসের প্রতি অবিচারই করে থাকে।

এটাও বাস্তবতা যে, তুরাসের মধ্যে অন্ধ অনুকরণ বা ‘তাকদিস’ নেই, এটা আমরা প্রগতিবাদীদের থেকে শিখিনি, বরং এটা আমরা তুরাস থেকেই, আমাদের আকাবির ও ইমামদের বক্তব্য ও আমল থেকেই শিখেছি। (আমাদের তুরাসই আমাদেরকে সংস্কার ও আধুনিকতা ও প্রগতিবাদের দিকে আহবান করেছে, তবে সেটা শর্ত, মানদণ্ড ও মূলনীতির অধীনে)।

ইনসাফের সাথে চিন্তা করে দেখি ও বলিঃ তুরাস কি বর্তমানে আমাদের জীবনে বিদ্যমান আছে? আমি দেখি আমাদের জীবনে তুরাস বলতে কিছুই নেই। আমাদের খাওয়া-দাওয়া, উঠা-বসা, অর্থ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা সবকিছুতে আমরা আজ পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুসরণ করছি। যদি তুরাস আমাদের জীবনের কোন অংশে থাকে তাহলে তা শুধুমাত্র আমাদের বিবাহ, তালাক, মিরাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। এর বাইরে আমাদের জীবনে তুরাস বলতে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না।

তুরাস ও প্রগতিবাদের মাঝে সংঘাত একটি কৃত্রিম সংঘাত। এই সংঘাত সৃষ্টি করার কোন দরকার ছিল না। এই কৃত্রিম সংঘাত সৃষ্টির কারণে আজ আমাদের সামনে আরো যে অনেক সুযোগ ছিল সেই সুযোগ অর্জনে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের সম্ভাবনাকে নষ্ট করার জন্যেই এই বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে।

ইনসাফতো বলে যে, আজকে আমাদের দাবী ও আহবান হওয়া দরকার যে, তুরাসের প্রতি আমরা ফিরে আসি। আজকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরণের জ্ঞান-বিজ্ঞান বিদ্যমান আছে, যার শিক্ষা ও চর্চা আমরা করছি। কিন্তু আমরা আমাদের নিজেদের প্রযুক্তি সৃষ্টি করতে পারিনি। এমনকি আমরা যে অস্ত্র একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছি তাও আমরা অন্যের থেকে অর্থ দিয়ে ক্রয় করছি। অর্থাৎ আমরা অর্থ দিয়ে আমাদের মৃত্যু খরিদ করছি।

আমারতো ইচ্ছা হয় যে আজকে বা এই ধরণের সম্মেলন থেকে আমাদের তুরাসের প্রতি যুদ্ধ ঘোষণা না করে, এই ধরণের আধুনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার, আমাদেরকে তুরাসের প্রতি ফিরে আসার আহবান করা দরকার।

লেখকের ফেইসবুক থেকে নেয়া 

পূর্ববর্তি সংবাদবাংলার ইলমের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ঝরে পড়েছে
পরবর্তি সংবাদনির্বাচনি এলাকার উন্নয়নে ২০ কোটি করে বরাদ্দ দিবে সরকার