ডায়েরির পাতা থেকে : বাদশাহী মাদরাসায় ‘আল কাউসারে’র সহসম্পাদক

মাওলানা মাহমুদুল হাসান ।।

আমাদের মাদরাসায় হযরত মাওলানা যাকারিয়া আব্দুল্লাহ ছাহেব এসেছিলেন । তিনি আমাদেরকে অনেক নসিহত করেছেন । তিনি উস্তাযদের উদ্দেশ্যে মাদরাসার কুতুবখানায় যা বলেছেন তার সারসংক্ষেপ হল : প্রথমে আপনাদেরকে  তিনটি বিষয়ে কথা বলব । নিজের সংশোধন, ছাত্রদের সংশোধন এবং সমাজের সংশোধন ।

নিজের সংশোধন আমরা দুই ভাবে করতে পারি। ইলমি আমলি উন্নতির মাধ্যমে । আর এই সংশোধন আমরা মৃত্যু পর্যন্ত করতে থাকব । ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি বলেছেন, من ظن انه مستغن عن التعلم فليبك على نفسه যে ব্যক্তি মনে করে তার শিক্ষার প্রয়োজন নেই সে বড় বিপদে রয়েছে । সে যেন নিজের উপর কাঁদে । তবে শেখার মধ্যে স্তর আছে। এই স্তর শেষ হবে না। এটা শেষ হবে মৃত্যুর দ্বারা।

তিনি বলেন, আমাদেরকে হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম বারবার বলেছেন, মোতালার বিভিন্ন প্রকার রয়েছে । এক,  দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করার জন্য সাধারণ অধ্যয়ন। এজন্য কুরআনের তাফসীর পড়া। চিন্তা ফিকিরের সাথে প্রতিদিন কোরআন পাঠ করা । যেকোনো একটি তাফসির পরিপূর্ণ পড়া। যেমন تفسير ابن كثير  / معارف القران بيان القران ।

দ্বিতীয়, দৈনিক হাদিসের কিতাব থেকে কিছু পড়া । হাদিসের তালিমাত গ্রহণ করার জন্য এবং নিজের জীবনের সংশোধনের জন্য । এজন্য আমরা মাআরিফুল হাদীস অধ্যয়ন করতে পারি । এটা পাঠ করা জানার জন্যও হবে মানার জন্যও হবে । কারণ এখানে রয়েছে ইসলামী তালিমাত কিভাবে মানুষের সামনে পেশ করা হবে এবং কি ধরনের আলোচনা করতে হবে। এভাবে নিয়মিত যদি অধ্যায়ন করি তবে সেটার একটা রং আমাদের কথায় প্রকাশ পাবে। যেভাবে একজন তাবলীগওয়ালার কথা শুনলেই বোঝা যায়, তিনি তাবলিগওয়ালা।

তৃতীয়, বড়দের কিতাব অধ্যয়ন করা। বিশেষ করে মনজুর নোমানী রহ., থানবী রহমতুল্লাহি আলাইহি, মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, তাকি উসমানী দামাত বারাকাতুহুম, এবং সরফরায খান সফদর রহমতুল্লাহি আলাইহি এর কিতাব। এইগুলো অধ্যবসায়ের সাথে প্রতিদিন অল্প হলেও পড়া।

অল্প করে প্রতিদিন পড়লেও যে অনেক পড়া যায়, এর একটি দৃষ্টান্ত হল হযরত মাওলানা তাকি ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম। তিনি দুপুরের খানার পর কাইলুলার আগে ৫ থেকে ১০ মিনিট পড়ে থানবী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর সব কিতাব  শেষ করেছেন।

চতুর্থ, মৌসুমী অধ্যয়ন। যেমন রমজান হজ ঈদ কুরবানী ইত্যাদির সময় এসব বিষয়ে মোতলাআ করা। এ প্রকারের মধ্যে আরও আসতে পারে বিভিন্ন সমসমায়িক ভ্রান্ত আকীদা ও ফের্কা সম্পর্কে মোতালাআ।  বিভিন্ন বাতিল সম্পর্কে আপডেট থাকা চাই । বর্তমানে তাদের অবস্থা কী, কীভাবে তারা তাদের কার্যক্রম চালায় ইত্যাদি জানা থাকতে হবে।

হযরত আরও বলেন, কিছু কিতাব এমন আছে যেগুলোকে জীবনের জন্য অজিফা হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। এগুলো বারবার অধ্যয়ন করতে হয় । তাহলে নিজের আলোচনায়, লেখায় তাহকীকের রং পয়দা হবে। এজন্য বিশেষ করে হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম এর কিতাবাদি অধ্যায়ন করা । এবং তার উস্তায শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি এর কিতাবাদি অধ্যয়ন করা ।

এরপর তিনি ছাত্রদের সংশোধন নিয়ে কিছু কথা কথা বলেন, যার সারাংশ এরকম, ছাত্রদের পেছনে মেহনত করতে হবে । তারা যেন লেখাপড়ার প্রতি খুব মনোযোগী হয়, অধ্যয়নের প্রতি খুব মনোনিবেশ করে। উস্তাযগণকে চেষ্টায় থাকতে হবে, যাতে ছাত্রদের ভেতর মজবুত যোগ্যতা তৈরি হয় । কারণ ছাত্রদের যোগ্যতা তৈরি না হলে খেদমতের অঙ্গন তাদের জন্য সংকীর্ন হয়ে যায় । এবং তারা বিভিন্ন ফেতনার শিকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে । তাই তাদের জীবন রক্ষা করার জন্য ঈমান রক্ষা করার জন্য যোগ্যতা তৈরি করে দিতে হবে।

ক্লাসে যাওয়ার পূর্বে  মেহনত করে প্রস্তুতি নিতে হবে । হযরত থানবী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে ছাত্ররা বলতো, আমরা আপনার পড়া সহজে বুঝি। তিনি বলতেন, তোমাদের আরামের পেছনে আমার কি পরিমাণ আরাম ত্যাগ করতে হয়েছে, জান?

এরপর হযরত এলাকার সংশোধনের বিষয়ে বলেন, সর্বশ্রেণীর লোকের পিছনে তালিমুল কোরআন, কোরআন শিক্ষা দেওয়ার মেহনত করতে হবে। এজন্য শুধু কারী সাহেবদের পড়ানো যথেষ্ট নয়। আমরা যারা বড় আছি তাদেরকেও মেহনত করতে হবে।

আমাদের একজন সহকর্মী হযরতকে প্রশ্ন করেন – হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক ছাহেবের তরীকে মুতালা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা তো অনেক বড় কঠিন প্রশ্ন । তারপরও আমার যতটুকু বুঝে এসেছে যতটুকু দেখেছি তা বলব। তিনি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে যেমন আখখায, তেমনি নাক্কাদ । অর্থাৎ যে বিষয়টি গ্রহণ করার সেটি তার হাত থেকে ছুটে না । তিনি সেটি জেহেনে রাখেন। এবং যেখানে যেটা প্রয়োজন হয়  সেটা তার মনে হয়ে যায়। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি ডায়েরিতেও নোট করে রাখেন ।

আমি একবার তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমরা তো মুতালাআ করি। কিন্তু এই জিনিসটা  লিখে রাখতে হবে , ওটা  লিখে রাখতে হবে- তা তো বুঝি না? এই যোগ্যতা অর্জন কিভাবে হবে? তিনি বলেছিলেন, মোতালাআ করতে থাকো, আস্তে আস্তে হবে । এটা তার উস্তায আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.-এরও তরিকা ছিল । তিনি প্রতিটি বিষয়ের জন্য পৃথক ফাইল রাখতেন। আর অধ্য়য়নে যা পেতেন তা ওই ফাইল আটকে রাখতেন ।

হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক ছাহেব যখন তার সোহবতে ছিলেন সেখানে তিনি তার তার তত্ত্বাবধানে ২০-২৫ টি কিতাবের উপর কাজ করেছেন। তিনি বলেন, আমি এমন কাগজ পেতাম যা একেবারেই মরচে পড়ে হলুদ হয়ে গেছে। হয়তো দশ বছর আগের হবে । হযরত মাওলানা আবদুল মালেক ছাহেবের আরেকটি গুণ হল, তিনি একটি বিষয়ের জন্য দীর্ঘদিন পর্যন্ত মুতালা করতে থাকেন। তাড়াহুড়া করেন না । বিভিন্ন বিষয়ে আরব বড় বড় ফকিহদের সাথে মতবিনিময় করেন । বিভিন্ন মাধ্যমে রিসালাহ আদান প্রদান করেন।

(৬জানুয়ারি ২০২০ মোতাবেক ৯ জুমাদাল উলা ১৪৪০)

লেখক : বিক্রমপুর বাদশাহী মাদরাসার শিক্ষক