কাদিয়ানী মতবাদ কেন অসার: আনওয়ার শাহ কাশ্মীরীর অসাধারণ বিশ্লেষণ

মু্আয নূর ।।

مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا. “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আহযাব, ৪০)।

এ আয়াতটি আকীদায়ে খতমে নবুওতের এমন ভিত্তি যার উপর ঈমানের পরিপূর্ণতা নির্ভর করে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সবকিছু মানা সত্বেও যদি কোনো হতভাগা তাঁর খতমে নবুওত (নবুওত পরিসমাপ্তি) এর উপর বিশ্বাস না রাখে কিংবা এর অন্যকোনো ব্যাখ্যা প্রদান করে তাহলে সে ঈমান থেকে নির্ঘাত বঞ্চিত হয়ে যাবে। গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এই খতমে নবুওতের সর্বাঙ্গীন আকীদাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে এবং আপন অনুসারীসহ ঈমান থেকে বের হয়ে গেছে।

হযরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহিমাহুল্লাহ উপরোক্ত আয়াত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।  আলোচনাটি বিজ্ঞোচিত এবং পান্ডিত্যপূর্ণ। আর সময় বিবেচনায় বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

“হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওতের সূচনা করার জন্য আবির্ভূত হননি বরং নবুওতের ইতি টানার  জন্য তাঁর আগমন ঘটেছে। তাই কোনোরূপ ফাঁক ছাড়াই তাঁর নবুওতের ব্যাপ্তি কিয়ামত পর্যন্ত। আর যেহেতু নবুওত আল্লাহ প্রদত্ত জিনিস এবং এটাকে শুম দ্বাা অর্জন করা যায় না , তাই রাসূল-এর পর কোনো ব্যক্তিই-চাই তিনি যত জ্ঞানগরিমা এবং পূর্ণতারই অধিকারী হোন না কেন- নবী হতে পারবেন না”।

আল্লামা কাশ্মীরী রহ. প্রথমে এই আয়াতের আভিধানিক ব্যাখ্যা করেছেন। পরে হাদিসের আলোকে এবং সাহাবি, তাবেয়ীদের বিভিন্ন উক্তি দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলােইহি ওয়া সাল্লামের শেষ নবী হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করেছেন।

শাব্দিক ব্যাখ্যা

উপরিউক্ত আয়াতের মধ্যে    رسول اللهও  خاتم النبين এর মধ্যে واو হচ্ছে عاطفة । আর আরবী ভাষায় لكن কোনো সন্দেহ দূর করার জন্য ব্যবহৃত হয়।

রাসূল-এর সাধারণ অর্থ, সংবাদ বাহক। কিন্তু রাসূল ও নবী- এর অর্থের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। অবশ্য কারো করো মতে উভয় শব্দই সমার্থক। মু’তাযিলাদের অভিমত তাই। কারো কারো মতে, একমাত্র মানুষই নবী হতে পারে। অপরদিকে, রাসূল শুধু মানুষ নন, বরং ফেরেশতাও হতে পারে। যেমন জিবরীল আলাইহিসসালাম হযরত মারয়ামকে সম্বোধন করে বলেছিলেন- إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكِ غُلَامًا زَكِيًّا (অর্থ) আমি তো কেবল তোমার প্রতিপালকের রাসূল (প্রেরিত), তোমাকে একটি পূত-পবিত্র পুত্র দান করার জন্য। মারয়াম, ১৯।

কিন্তু আহলুসসুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের মতে, নবী শরীয়তের অধিকারী (সাহিবে শরীয়ত) হতে পারেন। আর যদি তাঁর উপর শুধু অহী এসে থাকে তাহলেও তাঁকে নবী বলা যেতে পারে। কিন্তু রাসূল  শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তিকেই বলা যাবে যাঁর কাছে কোনো নতুন কিতাব  এবং নতুন শরীয়ত এসেছে।

خاتم -খাতাম।

خاتم    শব্দের تا অক্ষরকে فتحة এবং كسره উভয় ভাবেই ব্যবহার করা হয়। হাসান বসরী এবং ইমাম আ’সিম রহিমাহুমাল্লাহ تا অক্ষরকে فتحه এর সাথে পড়তেন। বাকি সব কা’রী تا- কে كسره এর সাথে পড়ার ব্যাপারে একমত। ই’রাব এর এই মতানৈক্য দ্বারা মূল অর্থে কোনো পরিবর্তন আসেনা। অর্থাৎ উভয় অবস্থাতেই অর্থ হবে- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ নবী এবং তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেননা। ইবনে জারীর এবং বায়যাভী সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, تا  কে فتحه বা كسره যে অবস্থাতেই পড়া হোক, অর্থ একই হবে। ইমাম রাগেব আস্ফাহানী, আবু তাহের পাটনী এবং আবুল বাকা’ তাদের নিজ নিজ কিতাবে অনেক উপকারী তথ্য পরিবেশন করেছেন এ ব্যাপারে।

النبيين -আন নাবিয়্যীন।

نبيين  হচ্ছে نبي এর বহুবচন। نبي শব্দের অর্থ সুপরিচিত। আরবী ভাষায় الف এবং لام   – تعريف তথা নির্দিষ্টকরণ এর জন্য ব্যবহৃত হয়। এর চারটি অবস্থা রয়েছে।

ব্যাকারণবিদদের মতে, যদি আলিফ ও লাম বহুবচনের উপর ব্যবহৃত হয় যেমন,  النبيين এর উপর হয়েছে। তখন এর অর্থ জিনসী না হয়ে বরং অন্য কোনো মা’হুদ থাকলে তাই হবে। আর যদি মা’হুদ না থাকে তাহলে আলিফ ও লাম ব্যবহৃত হবে إستغراقي  অর্থে। ‘কুল্লিয়াতে আবুল বাকা’ শীর্ষক  গ্রন্থে আছে, আরবী ভাষাবিদদের ধারণামতে, ‘লামে তা’রীফ’ চাই এক বচনের উপর ব্যবহৃত হোক বা বহুবচনের উপর- তা থেকে إستغراقي অর্থই পাওয়া যাবে। তবে মা’হুদ থাকলে তা ব্যাপকার্থে ব্যবহৃত হবে। উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায়, খাতামুননাবিয়্যীন এর অর্থ হচ্ছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী, তাঁরপর আর কোনো নবী আসবেন না।

হাদীসের আলোকে ব্যাখ্যা

আল্লাহ তাআলা সর্বজ্ঞ। দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছুর খবর তিনি রাখেন। তিনি ভালো করেই জানেন, কিয়ামতের আগ পর্যন্ত এই উম্মতের সামনে কি কি ভয়ঙ্কর ফিতনা মাথাচারা দেবে। কত হৃয়বিদারক ঘটনা ঘটবে। বিভ্রান্তি  এবং ভ্রষ্টতার কোন কোন আহ্বায়কেরা আসবে, যারা ইসলামের মৌলিক আকীদাসমূহের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে শুধু নিজেরাই ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হবেনা বরং সাথে আরো অনেক হতভাগাকে সেই লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা অংশীদার করবে। সর্বজ্ঞ যেরূপ সমিচীন ও প্রয়োজনীয় মনে করেছেন সেরূপ আগত ঘটনাবলীর  কিছু কিছু বিবরণ রাসূলের কাছে ব্যক্ত করেছেন। এ কারণেই রাসূল অনেক হাদীসের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন- أنا أخر الأنبياء وأنتم أخر الأمم (অর্থাৎ) আমি সর্বশেষ নবী এবং তোমরা সর্বশেষ উম্মত। এ হাদীস সুস্পষ্ট করে দিয়েছে, রাসূল-এর আর কোনো নবী আগমন করবেন না।

খাতামুন্নাবিয়্যীন- এর অর্থ যা স্বয়ং নবী বর্ণনা করেছেন, তাহলো, ‘তাঁর মাধ্যমেই নবুওতের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। চাই তিনি শরীয়ত আনয়নকারী নবী হোন বা সাধারণ নবী হোন’। এ তথ্যটি আরেকটি হাদীসের দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায়।  একদা রাসূল আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন- ‘তোমার আর আমার মধ্যে ভ্রাতৃত্ব এবং ঘনিষ্টতা সেই রং ধারন করেছে, যা মূসা ও হারুন আলাইহিসসালামের মধ্যে ছিল।’  আর এ কথা তো সবার জানা, হারুন আলাইহিসসালাম স্বয়ং নবী ছিলেন- তবু তাঁর উপরোক্ত কথার দ্বারা পাছে কোনো বাঁকা বুদ্ধির লোক হযরত আলীর গায়ে নবুওয়াতের ‘রং’ চড়িয়ে বসে তাই এ সম্ভাবনাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য নাকচ করে দেন-  إلا أنه لا نبي بعديবলে। (তবে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, আমার পর আর কোনো নবী আসবেনা। আরো পার্থক্য হলো, হারুন নিজে নবী কিন্তু তুমি নবী নও। খাতমে নবুওতের ঘোষণার সাথে এই হাদীস এ তথ্যটিও প্রকাশ করে দিয়েছে- নবুওতের ধারায় উত্তরাধিকার চলেনা।

 

সাহাবীদের বর্ণনা দ্বারা উক্ত আয়াতের তাফসীর 

কুরআনে কারীমের প্রথম সম্বোধিত ব্যক্তিগণ এছাড়া আর কোনো অর্থ করতেননা- মুহাম্মাদ সর্বশেষ নবী তাঁরপর আর নবী আগমন করবেননা। এ প্রসঙ্গে ইবনে জারীর সুয়ূতী প্রমুখের বরাতে মুসান্নিফে ইবনে আবী শায়বার যে রেওয়ায়েত বর্ণনা করা হয়েছে- তাঁকে খাতামুন্নাবিয়্যীন বলো, কিন্তু বলোনা, তাঁর পর আর নবী নেই।

হযরত আয়েশার রাযিয়াল্লাহু আনহার ঐ ব্যাখ্যা দ্বারা দুর্জনেরা তাঁর পর নবী আগমনের বৈধতা উদ্ভাবন করে নিয়েছে, অথচ আয়েশার উদ্দেশ্য ছিল শুধু এ কথা বলা, তিনি নবুওতের ধারাকে চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর পরে আর কোনো নতুন নবী আগমন করবেন না। তবে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা আলাইহিসসালাম অবতীর্ণ হবেন। সবাই জানে, তিনি নতুন নবী হিসাবে আসবেননা।  তাই তার আগমনের দ্বারা খাতমে নবুওতে কোনো তারতম্য ঘটবেনা।

তাছাড়া আনুমানিক ষাটজন মুহাদ্দিস বিশুদ্ধ রিওয়ায়েত দ্বারা খাতমে নবুওয়াত প্রমাণ করেছেন। আকীদাতুতাহাবী নামক কিতাবে আছে- ‘রাসূলের পরে নবুওতের দাবি পথভ্রষ্টতা ও বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়। বরং এটি ইসলামের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ।’

কাস্তাল্লানীর মতে রওযায়ে আতহারে সালাম পেশ করার সবচে’ উত্তম শব্দাবলী হচ্ছে- السلام عليك يا سيد المرسلين وخاتم النبيين – হে রাসূলগণের সর্দার এবং সর্বশেষ নবী! আপনার উপর সালাম।

সহায়ক ফিকহী উপাদান

খাতমে নবুওয়ত প্রসঙ্গে ফুকাহায়ে কিরামেরও এমনসব উক্তি বর্ণিত আছে, যার দ্বারা নবুওয়ত পরিসমাপ্তির প্রকৃত ধারণা লাভ করা যায়।

আল আশবাহ ওয়াননাযায়ের নামক কিতাবে আছে- যদি কোনো ব্যক্তি রাসূলকে  খাতামুন্নাবিয়্যীন বলে না জানে তাহলে সে মুসলমান নয়। যেহেতু তাঁর শেষ নবী হওয়াটা দ্বীনের আবশ্যক বিষয়াদীর অন্তর্ভূক্ত এবং আবশ্যক বিষয়াদীর জ্ঞান রাখা জরুরী।

কানযুদ্দাকায়িক কিতাবে আছে, যদি কোনো ব্যক্তি বলে, ‘আমিও আল্লাহর রাসূল তাহলে সে কাফির।

ফতওয়ায়ে আলমগীরীতে আছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ফারসী, উর্দূ বা অন্য কোনো ভাষায় বলে-‘ আমি নবী বা পয়গাম্বর তাহলে সেও কাফির।

হাফিয ইবনে হাযাম উন্দুলুসী ‘আল মিলাল ওয়াননিহাল’ নামক কিতাবে বলেছেন, ‘এই কথা বিশ্বাস করা ওয়াজিব যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে নবুওয়তের দাবি সর্বোতভাবে প্রত্যাখ্যাত।’

আব্দুস সালাম ইবনে ইবরাহিম আল মালিকী বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামের উপর নবুওয়তের ধারা চিরদিনের জন্য রুদ্ধ করে দিয়েছেন। কারণ আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন খাতামুন্নাবিয়্যীন উপাধি। অতএব রাসূলের পর না কোনো নবীর আবির্ভাব হরে আর না কোনো শরীয়তের।

প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, আহলে কিতাবদের কাছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেসব বৈশিষ্ট্য সুপরিচিত ছিল এরমধ্যে অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল- তিনি ‘খাতামুন্নাবিয়্যীন।

পূর্ববর্তি সংবাদপাকবাহিনীর হামলায় এক ভারতীয় সেনা নিহত, গুরুতর আহত ৩
পরবর্তি সংবাদ৯ মাসে ডাকসু নেতাদের খরচ ৮৩ লাখ টাকা! ভিপি নুরের বাজেট ছিল ৫ লাখ