মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।
বেশ কয়েকবছর যাবৎ ধ্যানমগ্নভাবে খতমে বুখারীর দরস শোনার সুযোগ হয় না। আজ আল্লাহর মেহেরবানীতে সেই সুযোগ হলো। বরং পরম সৌভাগ্য হলো। আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল শরিক হওয়ার। তদুপরি নিজের অলসতার দরুণ পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে গেল। তারপরও মেহেরবান আল্লাহ মাহরূম করলেন না। এক তালিবুল ইলমের উসিলায় একেবারে শায়খের কাছে বসে দরসটি শোনার এবং নিজের সাধ্যমতো ধ্যানমগ্ন হয়ে অংশগ্রহণ করার তাওফীক দান করলেন। আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু ওয়ালাকাশ শোকরু।
যাঁর দরসে শরিক হলাম, এইদেশে তাঁর কোনো পরিচয় তুলে ধরার প্রয়োজন নেই। আমাদের আসাতিযায়ে কেরাম এবং পুরো দেশের বিরাট সংখ্যক উলামায়ে কেরামের উস্তায হযরত মাওলানা নূর হুসাইন কাসেমী সাহেব দামাত বারাকাতুহুম। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সিহহত ও আফিয়াতের সঙ্গে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন। ইলম, দ্বীন, উম্মাহ ও দেশের জন্য আরও অনেক খেদমত করে যাওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
দরসটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকার প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া, তাঁতীবাজার মাদরাসা মসজিদে। দরসে শুনতে শুনতে আমি সাদা দুটি পৃষ্ঠায় সংক্ষেপে যে নোট করেছি তা এখানে তুলে ধরছি। সেখানে হযরতের প্রতিটি কথাই ছিল বহুমুখী কল্যাণের বার্তাবাহক। তালিবুল ইলম, অভিভাবক, সাধারণ মুসল্লি-সবশ্রেণির মানুষের জন্য খুবই উপকারী।
তিনি বলছিলেন, ‘বর্তমানের আহলে হাদীস সম্প্রদায় যেসব বিষয় নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করতে চায়, এগুলো আর এখন আলোচনার বিষয় থাকেনি। এগুলো নিয়ে বহু আগেই অনেক আলোচনা হয়ে গেছে। উম্মতের ফকীহ ইমামগণ এগুলো নিয়ে গবেষণা পর্যালোচনা করে ফলাফল বের করে দিয়ে গেছেন। বর্তমানে এই সম্প্রদায় কেবল ফিতনা, ঝগড়া ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।’
‘বর্তমানের সবচে বড় ফেতনাগুলোর একটি হলো, কাদিয়ানী ফেতনা। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমেই নবুয়ত সমাপ্ত হয়ে গেছে। একথা কোরআন ও হাদীস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এ সম্পর্কে কারো কোনোরূপ সন্দেহ থাকলে সে ঈমানহারা হয়ে যাবে। যদি কেনো কাদিয়ানীকে কেউ কাফের মনে না করে তারও ঈমান থাকবে না। অতএব মুসলমান দেশের সরকারের উচিত স্পষ্টভাবে তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করা। কোনো কাদিয়ানীকে মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করার সুযোগ নেই। মনে রাখবে, কোরআন ও সুন্নাহকে মনেপ্রাণে মেনে নেয়ার নামই হলো ঈমান।’
‘দুনিয়ার জীবনে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান হলো আমাদের প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। হালাল হারামের বিধান রয়েছে। আমাদেরকে সেগুলো মেনে চলতে হবে। আর মনে রাখতে হবে আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতে যাওয়া। কোরআন মাজীদে এটাকে চির সফলতা বলা হয়েছে। এই সফলতার জন্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করাই যথেষ্ট। অতএব প্রত্যেক মুমিনের জন্য এটা অবশ্যকর্তব্য।’
‘ইমাম বুখারী রাহ. এই কিতাবের সর্বশেষ যে হাদীস এনেছেন তার আগে কোরআন মাজীদের একটি আয়াত উল্লেখ করেছেন। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, কিয়ামতের দিন আমি ইনসাফের পাল্লা স্থাপন করব। [সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ৪৭]
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, (কিয়ামতের দিন) যার (নেক আমলের) পাল্লা ভারী হবে, সে সুখময় জীবন লাভ করবে। আর যার (নেক আমলের) পাল্লা হালকা হবে তার বাসস্থান হবে হাবিয়া দোযখ। [সূরা কারিয়া, আয়াত : ৬-১০]
নেক আমলের পাল্লা ভারী করার জন্য প্রথমে যে বিষয়টি জরূরী তা হলো, সহী নিয়তে আমল করা। এই বিষয়েই ইমাম বুখারী এই কিতাবের প্রথম হাদীস এনেছেন। যার অর্থ, সকল আমলের প্রতিদান নিয়তের উপর নির্ভর করে।
আর নিয়ত সহী করার জন্য প্রথম কাজ হলো হৃদয়কে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা। অহংকার, রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাব, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি মন্দ বিষয়গুলো থেকে হৃদয়কে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সেইসঙ্গে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর প্রতি ভরসা, আল্লাহর শোকর বা কৃতজ্ঞতা এবং আল্লাহ তাআলার যেকোনো হুকুমের উপর সবর বা ধৈর্যধারণ করার গুণ অর্জন করার চেষ্টা করতে হবে।
একসময় মানুষের মধ্যে এসব গুণ বেশি পরিমাণে ছিল। এখন খুব কমে গেছে। তার অন্যতম কারণ হলো, আগে গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে সকল মসজিদে কোরআনের তালিম হতো। সবাই কোরআন শিখত। ছোট বড় সবাই কোরআন তিলাওয়াত করতে পারত। এখন সেসব নেই। এখন গান-বাদ্যের ছড়াছড়ি। আগে ঘরে ঘরে শান্তি ছিল। এখানে মুরুব্বীরা আছেন। তারা বলুন, আগে যেমন শান্তি ছিল এখন কি তেমন শান্তি আছে?
: না
আল্লাহর নবীর শিক্ষা হলো, সন্তান জন্মের পর পর তার কানে আজান দাও। তার বয়স সাত বছর হলে তাকে নামাযের আদেশ করো। সাত বছর বয়সে নামায পড়তে হলে অবশ্যই তার আগেই কোরআন শিখতে হবে। কারণ, কোরআন ছাড়া নামায পড়া যায় না। আর শুনুন, নামায যেহেতু প্রত্যেকের উপর আল্লাহর ফরযে আইন, তাই কোরআন শেখাও ফরযে আইন। তাই কোরআন শেখাকে আপনারা ফরযে কিফায়া মনে করবেন না। পরিবারের একজন শিখলেই চলবে, এমন মনে করবেন না। এমন মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
শুনুন, কোরআন মাজীদ তিলাওয়াতের অনেক ফায়দা। বিশেষ একটি ফায়দা হলো, কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে ঈমান সতেজ হয়। অন্তর্জগতে শান্তি বিরাজ করে।
মনে রাখবেন, এখন সমাজে যত অপকর্ম হচ্ছে তার একমাত্র কারণ কোরআন থেকে দূরে সরে যাওয়া। অতএব সমাজে শান্তি আনতে চাইলে কুরআন শিখুন। সবাইকে কুরআন শেখান।
কোরআনের তিলাওয়াত শেখা হলো প্রথম কাজ। এরপরের কাজ হলো কোরআনের হাফেয হওয়া। তার পরের কাজ হলো, কোরআন বুঝার চেষ্টা করা। পারলে প্রত্যেকেই এই তিনও ধাপ অর্জনের চেষ্টা করুন।
আপনার সন্তান অবাধ্য হয় কেনো? বিশ্বাস করুন, কোরআন না শেখার কারণে। তাই সন্তানকে কোরআন শিখান। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নসীহত।
বুখারী শরীফের সর্বশেষ এই হাদীসে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুটি বাক্য আল্লাহ তাআলার কাছে প্রিয়। মুখে উচ্চারণ করাও সহজ। তবে মীযানের পাল্লায় খুব ভারী। বাক্যদুটি হলো-
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ العَظِيمِ
এই দুই বাক্য যেহেতু আল্লাহ তাআলার কাছে প্রিয়, তাই যারা বাক্যদুটি পড়বে তারাও আল্লাহর প্রিয় হয়ে যাবে। তাই খুব বেশি বেশি এই দুটি বাক্য, এই দুটি কালিমা পড়া উচিত। চলতে ফিরতে উঠতে বসতে আমরা এই কালিমা পড়ার অভ্যাস করে নিতে পারি। তাতে খুব সহজেই আমরা অনেক লাভবান হব।’
















