কাতারে মার্কিন-তালেবান চুক্তি : কার কী প্রাপ্তি?

মার্কিন-তালেবান যুদ্ধবিরত ও শান্তি চুক্তি হয়েছে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি। কাতারের দোহায় শান্তিচুক্তি নিয়ে ঘরে বাইরে নানা উত্তেজনা। আফগানিস্তানের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র পাকিস্তানে দীর্ঘ ১৯ বছরের যুদ্ধে তাদের ক্ষতি এবং শান্তি চুক্তিতে তাদের প্রাপ্তি নিয়ে নানামাত্রিক বিশ্লেষণ। শান্তিচুক্তির বাস্তবতা, যথার্থতা এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে গত ৪ মার্চ বিস্তারিত কলাম লিখেছেন পাকিস্তানের জিও নিউজ উর্দুর অ্যংকর, বিশিষ্ট আফগান গবেষক ও সাংবাদিক সালিম সাফি। গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়ায় ইসলাম টাইমস-এর পাঠকদের জন্য তা অনুবাদ করে দিয়েছেন রায়হান মুহাম্মদ।


 

আফগান আমেরিকা চুক্তির মাধ্যমে আফগানিস্তান কি ফিরে পেল বিশ বছর আগে হারিয়ে ফেলা শান্তি ও নিরাপত্তা? নাইন ইলিভেনের পর শহিদ হওয়া নিরাপরাধ আফগান অথবা পাকিস্তানের সত্তর হাজার শহিদ কি পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এই চুক্তির মাধ্যমে ?? উত্তর অবশ্যই – না।

আমেরিকা কি পুরোপুরি আফগানিস্তান ছাড়ল যেমন ছেড়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। অথবা আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া আমেরিকা কি সেভাবে টুকরো টুকরো হয়েছে যেভাবে টুকরো টুকরো হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন?? অবশ্যই হয়নি। তাহলে পাকিস্তানের ধর্মীয় রাজনীতিবীদ ও বুদ্ধিজীবী মহল কোন বিজয়ের আনন্দে মেতেছেন?

আফগান আমেরিকা চুক্তির পর এমন অবস্থা বিরাজ করছে যেন মাওলানা ফজলুর রহমান বিগত ১৯ বছর ‘তোরা বোরা’য়( আফগানিস্তানের একটি পাহাড়ি উপত্যকা) অযথাই যুদ্ধ করে কাটিয়েছেন। তালেবান এই যুদ্ধে মোল্লা ওমর, মোল্লা আখতার মানসুর ও মোল্লা হাইবাতুল্লাহর নেতৃত্বে নয় বরং সিরাজুল হকের নেতৃত্বে লড়েছেন। মরহুম হামিদগুল পিন্ডিতে নয় কান্ধাহারে তালেবানের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে শহিদ হয়েছেন।এবং মরহুম মাওলানা সামিউল হক হক্কানী জালালাবাদে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আত্মঘাতী যুদ্ধ করতে গিয়ে শহিদ হয়েছেন।

সব থেকে অবাক করা ব্যাপার হল জামায়েতে ইসলামির অঙ্গ সংগঠনগুলোও তালেবানের বিজয়ে উৎসবে মেতেছে। অথচ গুলবাদিন হেকমতিয়ার ও বুরহানুদ্দীন রব্বানীর বিজয়ে এই জামায়াতে ইসলামি-এর থেকেও বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল। খালি চোখে তাকালে আমেরিকা বা রুশকে ধব্বংস করতে নয় জামায়াতের প্রিয় এই দুই মুজাহিদের সাথে লড়তেই যুদ্ধে নেমেছিল তালেবান।

আফগানিস্তানের যে শাসন ব্যবস্থাকে কাঠের পুতুল বলে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন লড়ে এসেছে তালেবান।জামায়াতে ইসলামির হিরো গুলবাদিন হিকমতয়ার সে শাসব ব্যবস্থাকে স্বাগত জানিয়েই কাবুলের রাজনীতিতে এসেছিল। গুলবাদিন ও রাব্বানির বিজয় সাথে সাথে তাদের শত্রু – আমাদের ধর্মীয় নেতা তালেবানের বিজয়। দুটোই কিভাবে জামায়াতের বিজয় আনন্দে মেতে ওঠার উপলক্ষ হয় তা এক আশ্চর্য। সাথে রহস্যও বটে!

এদিকে ইমরান খান ও শাহ মাহমুদ কোরেশী আফগান আমেরিকা চুক্তিকে নিজেদের সাফল্য বলে উপস্থাপন করতে মরিয়া। অথচ এতে তাদের যৎসামান্য ভূমিকার ব্যাপারে তারা নিজেরাও ওয়াকিবহাল।

কঠিন বাস্তবতা হল, আফগান আমেরিকা চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা বা আফগানিস্তান কারো বিজয় অর্জিত হয়নি। বিজয় তো বলা হয়, যাতে অন্যকে নিজের দাবি মানাতে বাধ্য করা হয়। এটা তো একটা চুক্তি মাত্র। যাতে দুই দলই নিজেদের অপারগতা ও বাস্তবতা মেনে নিয়েছে এবং নিজেদের অতীত দাবিগুলো থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে।

নাইন ইলেভেনের আগে অথবা পরে আমেরিকা যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এগোলে লাখ লাখ আফগানি ও মার্কিন সৈন্যের মৃত্যু না ঘটিয়েই তালেবানের সাথে একটি কার্যকর শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারত। এতোদিন পর যে চুক্তিটির প্রয়োজনীতা অনুভব করল আমেরিকা। অথচ তখন তারা আত্মগরিমা, শক্তি প্রদর্শন ও তালেবানকে ধব্বংস করতে ব্যস্ত ছিল। তবে দেরিতে হলেও এখন তারা তালেবানকে একটি রাজনৈতিক শক্তি মেনেই তালেবানের সাথে চুক্তি করছে। একে আমেরিকার পরাজয় ছাড়া অন্য কোন ভাষা দেওয়া যায় না।

অপরদিকে সে সময় আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বের দাবি ছিল তালেবান যেন আল কায়েদার সাথে সব রকম সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্ত তালেবান তখন আল কায়েদার সাথে সম্পর্ক ছিন্নের ব্যাপারটিকে তাদের ইমান ও আত্মমর্যাদার বিপরীত আখ্যা দিয়েছিল।অথচ এখন তারা আল কায়দা ও এজাতীয় সংগঠনগুলোর সাথে কোন রকম সংশ্লিষ্টতা না রাখার ভিত্তিতেই চুক্তি সাক্ষর করল। একে তালেবানের বিজয় বলে আখ্যা দেওয়া যায় কি?

এখন যারা আফগান আমেরিকা চুক্তিতে বিজয় উল্লাসে মেতেছেন এক সময় তারা উসামা বিন লাদেনকে হিরো মানতো। কিন্তু তালেবান তাদের হিরো উসামা বিন লাদেনের নীতি ভেঙ্গে চুক্তি সাক্ষর করার পরও তালেবান তাদের হিরোর আসন দখল করে আছে।কেউ এটা বলছে না নাইন ইলেভেনের পর তালেবান আল কায়দার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও নিজেদের জন্য এমন এক যুদ্ধের আহবান জানিয়েছিল যা শুধু তাদের ক্ষমতাকে নিঃশেষ করেনি বরং তাদের মহান দুই নেতার জানাজা প্রকাশ্যে পড়তে না পারার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

পাকিস্তানের যেসব ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী ও অবসর প্রাপ্ত জেনারেল বিজয় উল্লাসে মেতেছেন তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ছেড়ে গেছে কিছু শর্ত সাপেক্ষে।সেই শর্তগুলো খুব সহজেই পূর্ণ হবে বলে মনে হয় না। অনেকটা জোর দিয়েই বলতে পারি মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি আফগান ছাড়েনি। আফগানিস্তান এখনো শঙ্কা মুক্ত হয়নি।

চুক্তি কার্যকর হয়ে আফগানিস্তানে তালেবানের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও বলা যাবে না আমেরিকা আফগান ছেড়ে গেছে। কারণ দেশ চালাতে আফগানের যে অর্থনৈতিক সহায়তার প্রয়োজন হবে এখন আফগানকে আমেরিকা ছাড়া অন্য কেউ সে সহায়তা করবে না। আলোচনা চুক্তি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে এ আশঙ্কাও রয়েছে যে তা কোনভাবে ভেঙ্গে গেলে অবস্থা অতীতের থেকেও আশঙ্কাজনক হবে।

আর আলোচনা কোনভাবে ভেস্তে গেলে আফগানিস্তান পাকিস্তানকে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি দুষবে। কোনভাবে আবারো আফগান আমেরিকা যুদ্ধ লেগে গেলে তালেবানের সাথে পাকিস্তানের কোন সম্পর্ক নেই একথা বলে পার পাবার কোন সুযোগ থাকবে না পাকিস্তানের। তাই আফগান আমেরিকা চুক্তিতে সাফল্য অর্জনের কৃতিত্ব নিজের ঝুলিতে ভরার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।খামোখা তালেবানের মামা খালুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তালেবান ও নিজেদের বিপদ বাড়ানো অনুচিতই হবে ।

আফগান আমেরিকা চুক্তিতে সাধারণের অতিশয় আবেগ,বিজয় আনন্দে মেতে ওঠার ব্যাপারটি তো বোধগম্য। কিন্তু চুক্তির সাফল্য ও কৃতিত্ব নিজের ঝুলিতে ভরতে শাহ মাহমুদ কোরেশীর হাব-ভাব এক রকম বোধের বাইরেই বলা চলে।আকার ইঙ্গিতে তিনি যেন বুঝাতে চাইছেন তালেবান তার এক পকেটে ছিল, আমেরিকা ছিল আরেক পকেটে। ইমরান খানের মাধ্যমে দু’দলের মাঝে মধ্যস্থতা করেছেন তিনি।

লাখো আফগানি,সত্তর হাজার পাকিস্তানি জীবন খুঁইয়েছে রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে। শুধু আফগানিস্তান নয় পাকিস্তানও বিশ বছর ধব্বংস স্তূপে পরিণত হয়েছিল।তারপরও আমরা বুক উঁচিয়ে বলছি সমস্যা কোথায়, আমরা তো মার্কিনীদের আফগান ছাড়তে বাধ্য করেছি।অথচ যুদ্ধ মাত্র শেষ হল, আফগানিস্তানে তালেবানের পূর্ণ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি এখনো, আমেরিকাও পুরোপুরি আফগান ছাড়েনি।

পূর্ববর্তি সংবাদআবহাওয়া পূর্বাভাস: চলতি মাসে বয়ে যেতে পারে তিন–চারটি কালবৈশাখী
পরবর্তি সংবাদসাম্প্রদায়িক মোদি করোনা থেকেও বিপদজনক: তৃণমূল নেতা