মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম ।।
গত রাতের ঘটনা। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। হঠাৎ বড় ভাইয়া আর আম্মা আমাকে জাগিয়ে তুললেন। ব্যাপার কী! দেখি, ভাইয়ার হাতে এক গ্লাস পানি। বলছেন, নে খা! (এভাবে তো বলেননি; বলেছেন নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায়- ল খা!) আমি তো অবাক! আমার বড় ভাই আমাকে পানি খাওয়াচ্ছে! তাও এ গভীর রাতে! বললাম, কী এটা? বললেন, আগে খা, তারপর ‘কইয়ের’। হাতে নিয়ে দেখি, বেশ গরম, দেখতে ঘোলাটে। গ্লাসটা মাথার কাছে রেখে ঘুম-ঘুম চোখে দু’জনের দিকে তাকালাম। জানতে চাইলাম, কী হয়েছে?
এরপর শুরু হল এক ভয়-জাগানিয়া গল্প। লক্ষ্মীপুর চন্দ্রগঞ্জে কোন্ এক নবজাতক ভূমিষ্ঠ হবার পর নাকি মুখ ফুটে কথা বলেছে। বলেছে, ‘এ বিপদের সময় আযান দিতে, আর গরম পানিতে কালোজিরা মিশিয়ে খেতে। তাহলে এ বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।’ এটুকু বলেই নাকি ঐ শিশুটি মৃত্যুবরণ করেছে।
কেমন গা-ছমছমকারী ঘটনা! সত্যমিথ্যা তো আল্লাহই জানেন। যারা যারা এ ঘটনার খবর শুনেছে, সবাই তৎক্ষণাত এর অনুসরণ আরম্ভ করে দিয়েছে। লক্ষ্মীপুর থেকে ভাবি ফোন দিয়ে ভাইয়াকে জানিয়েছে। আর ভাইয়া প্রথমে আম্মার জন্য, এরপর আমার ও ছোট ভাইয়ের জন্য কালোজিরার পানি নিয়ে হাজির! আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এসব ঘটনা কেবল মধ্যরাতেই ঘটতে শোনা যায়।
আল্লাহ ক্ষমা করুন, আমি ভয় না পেয়ে উল্টো বিরক্ত হলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, আমাদের সমস্যা হল, আমরা আল্লাহ-আল্লাহ্র রসূলের কথার চাইতে এসবকে বেশি বিশ^াস করি। আমার কথা শেষ হতে না হতেই বাইরে মাইকের শব্দ শুনতে পেলাম। আ! এ গভীর রাতে মহল্লার মসজিদে আযান শুরু হয়ে গেছে! আরেক জায়গায় শুনলাম, জোরে জোরে মাইকে জিকির আরম্ভ হয়েছে।
আম্মা নরম দিলের মানুষ। ভাইয়াও আম-মানুষ। দু’জনেরই বিশ্বাস যেন ইয়াকীনে পরিণত হয়ে গেল। এবং উভয়েই আমাকে পানিটা খেতে সাধাসাধি করতে লাগলেন। আমি চুপ করে রইলাম। ভাবনায় পড়ে গেলাম। হঠাৎ সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি বললাম, এ বিপদের সময় কী করণীয়, তা কুরআন-হাদীসে পরিষ্কার বলা আছে। সেগুলো আমল করুন। যেসব দোআর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো পড়–ন। বেশি ভয় লাগলে ওযু করে নামাযে দাঁড়িয়ে যান। মুনাজাত করে কান্নাকাটি করুন। কালোজিরা সর্বরোগের মহৌষধ। সত্যমিথ্যা কী ঘটেছে জানি না। তবে এমন অসময়ে মাইকে আযান দিয়ে মানুষের মধ্যে আতংক ছড়ানো অন্যায়। আম্মা তো তখনই নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। আর আমি মাইকের শব্দ শুনতে শুনতে গভীর চিন্তায় হারিয়ে গেলাম।
ফযরের সময় ভাবলাম, কোন্ মসজিদে গেলে পুরো বৃত্তান্ত জানা যাবে। ভেবেচিন্তে মহল্লার বাদশাহ বাড়ির মসজিদে গেলাম। সেখানকার বাসিন্দারা দ্বীনী ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে এবং বেশ ঝগড়া-প্রবণ। কাতারে বসেই টের পেলাম, পাশে ওযুখানায় যুবকরা এ প্রসঙ্গেই বলাবলি করছে। অনেকে করছে হাস্যরস-কৌতুক। নামায শেষে ইমাম সাহেবই আলোচনা শুরু করলেন। কোনো একজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এত গভীর রাতে আযান দিয়ে মানুষের আমল নষ্ট করেন! সৌদি আরবে তো তাহাজ্জুদের আযান হয়, এখানে তো আপনার আযানের কারণে অনেক মহিলা মনে করেছে, ফযরের সময় হয়ে গিয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
মসজিদ থেকে বের হয়ে এলাম। ছোট ভাইকে শোনালাম, কেরাণীগঞ্জের থানকুনি পাতার ঘটনা। থানকুনি পাতা খেলে করোনা ভাইরাসের রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে- এ গুজব শুনে এইতো সেদিন এ ঔষধি পাতা বহুদামে বিক্রি হয়েছিল সেখানে।
আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আশপাশের আত্মীয়-স্বজন কারো সঙ্গেই আমাদের দেখা-সাক্ষাত নেই। সবাই এমনভাবে নিজেদেরকে ঘরবন্দী করে নিয়েছে যে, চেনা মহল্লা একদম অচেনা হয়ে গেছে। সারাদিন ঘর স্প্রে করে, হাতমুখ ধোয় আর করোনার খবর দেখে সময় কাটায়। এমন আযাবের সময় আল্লাহ-আল্লাহ্র রসূল কী বলেছেন, কী করণীয় বাতলে দিয়েছেন- তার চাইতেও আমাদের নিকট গুরুত্ব পাচ্ছে মধ্যরাতের বিস্ময়কর কোনো রটনা! সবাই যেন কোনো অদ্ভূত ও ভূতুড়ে কিছু শুনতে আগ্রহী! কী আশ্চর্য, নামাযের খবর নেই, জামাতের ইহতেমাম নেই, নিজের ইহতেসাব ও তওবার ফিকির নেই; কিন্তু আমরা থানকুনি পাতা আর কালোজিরার পানি নিয়ে অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করছি। কবে হুঁশ হবে আমাদের! কবে বন্ধ হবে এ কুসংস্কার-প্রবণতা!
















