ওলিউর রহমান ।।
বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ধারা থেমে নেই। সবাইকে ঘরে অবস্থান করতে বলা হচ্ছে। সমাগম নিষিদ্ধ। পরিবহন বন্ধ। জনজীবন ক্রমেই দুর্বিসহ হয়ে উঠছে। চরম সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। সবচেয়ে ক্ষতির মুখে নিম্নআয়ের মানুষ এবং ‘দিন আনে দিন খায়’ যাদের অবস্থা। হকার, কুলি, পোশাক বা মটরযান শ্রমিক, সবজি বিক্রেতা থেকে অন্যসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন আয়ের অন্যান্য পেশাজীবী-আসু সঙ্কটের চিন্তায় চরম হতাশায় দিন কাটছে তাদের। শহর কী উপশহর কিংবা গ্রাম-সর্বত্রই একই চিত্র।
সঙ্কটকালে দেশের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষদের জীবন চাকা সচল রাখার দায় প্রধানত সরকারের। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারত, পাকিস্তান এবং দূরের উন্নত, স্বল্পোন্নত অনেক দেশে সরকারের তরফে নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বড় অঙ্কের বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে সাতকোটি মানুষকে আগামী ছয় মাস বিনামূলল্যে চাল বিতরণের ঘোষণা দিয়েছে মমতা সরকার। পাকিস্তানে ১ কোটি মানুষকে সামনের চারমাসে বার হাজার রুপি করে প্রতিমাসে অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে ইমরান খানের পিটিআই সরকার। দূরের দেশ কানাডায় আগামী কয়েকমাসের জন্য জনগণের যাবতীয় খরচ সরকারের তরফে জোগানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারও সঙ্কট উত্তরণে কতিপয় প্রকল্প গ্রহণ করেছে। অবশ্য সরকার প্রস্তাবিত সঙ্কটকালীন বাজেটে প্রতিজন ব্যক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ উল্লেখ নেই। তার উপর রয়েছে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির শঙ্কা। দুর্নীতি বাংলাদেশের সাধারণ চিত্র ও চরিত্র হলেও আমরা আশাবাদী, করোনা মহামারীকালীন সময়ে অন্তত যাদের জন্য বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে তারাই সে বাজেটের পুরো অংশ পাবে। দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টি এবার একটু সংযত থাকবে।
তবে শুধুমাত্র সরকারের অনুদানে করোনার গভীর সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। সামর্থবান মানুষেরও অসচ্চল এবং করোনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিত। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানবিক দায় থেকে করোনায় দুর্দশাগ্রস্থ মানুষদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এ দায়িত্ব পালন করছেন।
এক্ষেত্রে নিজেদের সীমীত সামর্থের মধ্যেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে কওমি মাদরাসা কেন্দ্রিক কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে। তেল, ডাল, পেঁয়াজ, চিনি নিয়ে ঘরে আটকা পড়া শ্রমজীবী মানুষের দুয়ারে হাজির হচ্ছেন এসব স্বেচ্ছাবসেবীরা। পুরাতন অনেক স্বেচ্ছাসেবামূলক সংগঠনের পাশাপাশি করোনা ইস্যুতে কওমি অঙ্গনে নতুন কিছু সংঘ তৈরি হতেও দেখা গেছে। গভীর আন্তরিকতার সাথে তারা পালন করছেন নিজেদের মানবিক এবং ঈমানি দায়িত্ব।
‘হাফেজ্জী হুজুর সেবা সংস্থা’ কাজ করছে রাজধানীর মুহাম্মদপুর এলাকায়। জামিয়া আরাবিয়া মুহাম্মদিয়া মাদরাসায় প্রতি তিনদিন অন্তর অন্তর নুন্যতম ১০০ জন মানুষকে নির্দিষ্ট প্যাকেজের সহায়তা করা হচ্ছে। প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে ১০ কেজি চাল, ২ কেজি ডাল, ২ কেজি আটা, লবণ, চিনি, সাবান সহ আরও কিছু খুচরা সামগ্রী। সংস্থাটির পরিচালক মাওলানা রাজিবুল হকের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশের অচলাবস্থা যতদিন বহাল থাকবে ততদিনই তাদের এই ইভেন্ট অব্যাহত থাকবে।
তরুণ আলেম সমাজসেবী মাওলানা গাজী ইয়াকুব করোনা বাংলাদেশে ছড়ানোর প্রথম থেকেই নানামুখী কাজ করে যাচ্ছেন। শুরুতে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সচেতনা তৈরির পাশাপাশি মিরপুরের প্রায় ২০০ মসজিদে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার ডেটল সরবরাহ করেছেন। এছাড়া মসজিদে আগত মুসল্লীদের হাত ধুঁয়ার জন্য মসজিদে মসজিদে হ্যান্ডওয়াশ সরবরাহ করেছেন।
মাওলানা গাজী ইয়াকুব ইসলাম টাইমসকে জানান, গতকাল তার টিম রাজধানীর আবদুল্লাহপুর থেকে হেমায়েতপুর হয়ে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের জীবাণুনাশক স্প্রে ছিটিয়েছেন। এছাড়া একসপ্তাহ যাবত মিরপুর অঞ্চলের দুস্থ পথচারিদের তিনি খাবার সরবরাহ করেছেন। আগামীকাল থেকে ঘরবন্দী শ্রমজীবী মানুষকে নির্দিষ্ট প্যাকেজের তেল,ডাল ও ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করা হবে বলেও জানান তিনি।
মাওলানা হাবিবুর রহমান মিসবাহ, মাওলানা এহসান সিরাজরা কাজ করছেন ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশনের ব্যানারে। রাজধানীর মুগদা, মাণ্ডা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে তাদের কার্যক্রম। আপাতত দেড়শ পরিবারকে দেড় হাজার করে নগদ টাকা প্রদানের কথা জানিয়েছেন মাওলানা এহসান সিরাজ।
স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে পিছিয়ে নেই ছাত্ররাও। শ্যামলির মাদরাসাতুল কাউসারের ছাত্র যিয়াদ তার সহপাঠী, সহযোগীদের নিয়ে পরিচালনা করছেন একটি ইভেন্ট। প্রায় ১৭০ টি করোনায় পর্যদুস্থ পরিবারকে প্রাথমিকভাবে তারা সহায়তা করবেন বলে জানিয়েছেন। ঢাকার বাইরেও সিরাজগঞ্জ, নরসিংদি, শরিয়তপুর এবং রংপুরেও যিয়াদরা তাদের কার্যকম পরিচালনা করবে বলে জানা যায়।
এছাড়াও ব্যক্তিগত ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে দেশব্যাপী সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অবশ্য ঘরবন্দী শ্রমজীবী মানুষদের দুয়ারে দুয়ারে সাহায্য নিয়ে যাওয়া স্বেচ্ছাসেবীদের নিজেদের নিরাপত্তা ও সেফটির ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট আলেম লেখক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে যারা সেবামূলক কাজ করছে তাদের প্রথমে উচিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যেকোনো সমাগম এড়িয়ে চলা। যেন কাউকে সহায়তা করতে গিয়ে বিপদের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তোলা না হয়। এছাড়া দেশবাসীকেও সচেতন সতর্ক থেকে সঙ্কটকাল উত্তরণে তওবা ইস্তেগফার করে আল্লাহর সাহায্য কামানার আহ্বান জানিয়েছেন এ আলেম লেখক।
















