মিসাইল নয়, চাই মৌলিক সক্ষমতা

মুহাম্মাদ ইলিয়াছ খান ।।

২০২০ সাল । করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পৃথিবীতে । এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় করোনা ভাইরাস । আজকের এই সময় পুরো পৃথিবীটা অনেক বেশি ব্যস্ত ছিল মিসাইল, যুদ্ধবিমান, ড্রোন বিমান এবং উন্নত সামরিক শক্তিমত্তা অর্জনে । কিন্তু একটা ভাইরাসের সামনে পৃথিবীর উন্নত ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো এতটা অসহায় হয়ে পড়বে তা হয়ত তারা কখনো ভাবে নি । উন্নত রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা রক্ষায় এতটা অসহায় হয়ে পড়েছে যে সত্যি তাদের প্রতি করুণা জাগে ।

আজকের পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর সবচেয়ে বেশি মনোযোগ সামরিক শক্তি অর্জনের প্রতি । আধিপত্য বিস্তারের এক অদম্য নেশা ও লালসা বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকে পেয়ে বসেছে । কিভাবে অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে, কিভাবে অন্য দেশকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে পরাজিত করে নিজেকে এগিয়ে নিতে পারবে- এই যেন সকলের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু । আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা ছাড়া অন্য সবকিছুই যেন গৌণ হয়ে পড়েছে । পৃথিবী যেন প্রতিদিন আগের দিনের চেয়ে জ্যামিতিক হারে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ।

এমনই এক সময় ক্ষুদ্র এক ভাইরাসের মাধ্যমে প্রকাশ পেল ক্ষমতাধর দেশগুলোর দুর্বলতা । বস্তুগত শক্তি যতই প্রকাশিত হোক মানুষ যে কতটা অসহায় আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও ফায়সালার সামনে সে কতটা নিরুপায় তা যেন নতুন করে প্রকাশিত হল ।
পাশাপাশি আরও একটি দিক সমান গুরুত্বের সাথে লক্ষণীয় । আজকের পৃথিবী কামান, মিসাইল, ড্রোন বিমান ও পারমাণবিক বোমা এর মত শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে যতটা মনোযোগী ও আগ্রহী দেশের গণমানুষের স্বাস্থ্যগত সমস্যা সমাধান করা এবং এ বিষয়ের যাবতীয় বিষয়াদিতে নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন করার ক্ষেত্রে ততটা আগ্রহী ও মনোযোগী নয় । বিষয়টি পৃথিবীর সব দেশেই তুলনামূলক উপেক্ষিত । এ বিষয়ে বিনিয়োগের পরিমাণও সামরিক খাতের চেয়ে কমই হয়ে থাকে ।

পুঁজিবাদী পৃথিবী যাদেরকে নিম্নবিত্ত বলে থাকে তাদের স্বাস্থ্য সমস্যা যে (পুঁজিবাদী পরিভাষার) উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে এমনকি ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে থাকা ব্যক্তিদের জন্যও অনেক বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে তা হয়তো নতুন করে সামনে আসলো । উচ্চবিত্ত ও ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্থানে থাকা ব্যক্তিবর্গ সাধারণত নিম্নবিত্ত ও সমাজের সাধারণ শ্রেণীর মানুষকে নিয়ে এবং তাদের সুস্বাস্থ্য রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে আগ্রহ বোধ করে না । এমনকি এটা যে তার নিজের জন্য এবং নিজের সুরক্ষার জন্যই বিশেষ প্রয়োজন তাও মনে করে না ।
করোনাভাইরাস থেকে কেউ শিক্ষা নিতে চাইলে দেশের উচ্চবিত্ত ও ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্থানে থাকা ব্যক্তিবর্গের জন্য রয়েছে অনেক বড় এই শিক্ষাটি ।

ইউরোপের বড় বড় পুঁজিবাদী দেশগুলোও -যাদের দেখে পৃথিবীর তাবৎ মানুষ ঈর্ষা করে থাকে, যেসব দেশের সিটিজেনশীপ পাওয়াটা যেন সোনার হরিণ- তাদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতিও চোখে পড়ার মত । খুবই সাধারণ একটি জিনিস হল মাস্ক । কিন্তু এটিও অনেক ক্ষেত্রে তারা তাদের নাগরিকদেরকে প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ সরবরাহ করতে পারেনি । অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে অন্য দেশের ।

আসলে পুঁজিবাদময় বিশ্বে সবার চিন্তা ও চেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু থাকে শুধু নিজেদের স্বার্থ ও পুঁজি কী করে রক্ষা করা যাবে এবং তা বৃদ্ধি করা যাবে । তাই কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হবে, কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হবে না পুঁজিবাদী মাপকাঠিতে তা উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় লাভের অঙ্কের হিসাবে । তাই যা উৎপাদনে লাভ বেশি পুঁজি বিনিয়োগ হবে সেখানেই । কিন্তু এর পরিবর্তে উৎপাদনের মাপকাঠি ভিন্ন হওয়া দরকার। দেশের মানুষের জন্য যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এবং যেগুলো জনগণের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত তা উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে । করোনা ভাইরাস পৃথিবীর সামনে এ বাস্তবতা হয়ত আরো স্পষ্ট করে দেবে ।

আজকের এই পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে উন্নত দেশের সংজ্ঞা নতুন করে ঠিক করা দরকার । নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতাই যদি কোন দেশের না থাকে তাহলেও সে দেশকে উন্নত দেশ বলা কি আসলে ঠিক? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রচলিত এ পরিভাষাগুলো নিয়ে নতুন করে অনেক কিছু ভাবার আছে । দেখা যাক, করোনা পরবর্তী পৃথিবী এসব নিয়ে ভাবতে পারে কি না? করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে এসব ক্ষেত্রে কোন নতুনত্ব আসে কিনা?

করোনা আমাদেরকে আরো একটি বিষয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল ।
বিশ্বায়নের এ যুগেও যে কোনো সময় বিশ্বটা যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে তা হয়তো কারো চিন্তাতেও ছিল না । বিজ্ঞানের এই উন্নতির যুগেও যে বিজ্ঞানের সকল প্রস্তুতি ও চমক আল্লাহর ছোট্ট একটি মাখলুকের সামনে এতটা অসহায় হয়ে যেতে পারে তা হয়তো নতুন করে সকলের সামনে স্পষ্ট হল । এখান থেকেও যদি আল্লাহর সামনে নত হওয়ার শিক্ষাটা পৃথিবী গ্রহণ করতে পারত তাহলেও হয়ত অশান্ত পৃথিবীটা শান্ত হত।

আগামীর পৃথিবী যদি আজকের পৃথিবীর অবস্থা থেকে শিক্ষা নিতে চায় এবং চিন্তার সঠিক ধারা অনুসরণ করে অগ্রসর হয় তাহলে হয়তো আগামী পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলে যাবে । শেষ কথা হিসাবে বলতে চাই, মিসাইল নয়, আমাদের প্রয়োজন দরদী, অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল ডাক্তার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, গণস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতি মনোযোগ, মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার সক্ষমতা ।

আমরা আগামীর পৃথিবীতে আর দেশে দেশে শক্তির প্রতিযোগিতা দেখতে চাই না । গণস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতি মনোযোগ দেখতে চাই । আমরা দেশে দেশে বিলাসবহুল পণ্যের উৎপাদন দেখতে চাই না । মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতা দেখতে চাই ।

 

পূর্ববর্তি সংবাদকরোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই দৌলতদিয়া ঘাটে ঢাকামুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড়
পরবর্তি সংবাদকরোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়াল ১১ লাখ, মৃত ৬১ হাজার ১৪৪ জন