মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।
মানুষ মরণশীল কথাটা বলা যত সহজ, অনুভব করা তত সহজ নয়। আমাদের চারপাশে প্রতিদিন কত মানুষ মারা যায়। প্রতিদিন সকালে মাইকে কত মানুষের মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করা হয়। আমরা শুনি। কখনো আনমনে, কখনো আপন কাজে মগ্ন থেকে, কখনো হাসি গল্পের এক ফাঁকে একটু মনোযোগ দিয়ে। শুনি অমুকের আত্মীয়। অমুকের বাবা। অমুকের ছেলে। অমুকের মা। অমুকের স্ত্রী ইনতিকাল করেছে। সে ব্যক্তি কখনো আমাদের পরিচিত হয়। কখনো অপরিচিত। কখনো হয় শুধুই চেনা। কখনো নিকটাত্মীয়। এই আত্মীয়তা ও পরিচয়ের মাত্রা হিসাবে মৃত্যু সংবাদ আমাদের মাঝে প্রভাব ফেলে। হয়ত কখনো হৃদয় গহীনে রেখাপাত করে। কিন্তু এর মাধ্যমে মৃত্যুর আসল রূপ আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় না। মৃত্যুর প্রকৃত অবস্থা আমাদের হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয় না। মৃত্যু আমাদের কাছে অপরিচিতই থেকে যায়। থেকে যায় দুর্বোধ্য কাল্পনিকতা হয়ে। তবে কখনো বয়ানে, ঘরোয়া আলাপচারিতায় কিংবা একান্ত মনে ভাবি এবং বিশ্বাস করি—মানুষ মরণশীল। এই ভাবনা ও বিশ্বাসের মাত্রা তারতম্য হলেও প্রকৃত বিষয়টির উপলব্ধি আমাদের জন্য কঠিন।
মৃত্যুর আসল রূপ ও প্রকৃত অবস্থা কেবল সে-ই যথাযথ অনুভব করে, যে মৃত্যু বরণ করে। কিন্তু যে মৃত্যু বরণ করে সে তো তার অনুভূতি বলে যেতে পারে না। বলে যেতে পারে না মৃত্যুর স্বাদ ও কষ্টের কথা।
নিত্যদিনে ঘটে যাওয়া চারপাশের এত এত মৃত্যু সংবাদও আমাদের মাঝে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। তীব্র রকমের কোনো ভাবান্তর আনে না। এ প্রসঙ্গেই আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন-
كل يوم يقال : مات فلان و فلان، ولابد من يوم يقال فيه : مات عمر
প্রতিদিন ঘোষণা করা হয় অমুক মারা গেছে, অমুক মারা গেছে। অবশ্যই একদিন ঘোষণা করা হবে-উমর মারা গেছে! নাহজুল বালাগাহ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৮৭
হযরত উমরের এই বাণী আমাদেরকে একটু সময়ের জন্যে হলেও ভাবায়। ভাবনার পথে সামান্য হলেও থমকে যেতে বাধ্য করে।
গত দুইদিন আগে আমার ঘনিষ্ট এক ‘আত্মীয়’ ইনতিকাল করছেন। ভোররাত সোয়া চারটার দিকে তিনি এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেছেন। সকালে যখন তার মৃত্যু সংবাদ শুনলাম প্রথমে একটু হোঁচট খেলাম। পরক্ষণই মনে হলো, না। তিনি বেঁচেই আছেন। ঢাকায় গেলে আবার দেখা হবে। কথা হবে। আগের মতোই নাস্তার দস্তরখানে স্মৃতিচারণ ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে গল্প হবে।
বিকেলে ফোন করে খোঁজ নিলাম। দাফন কোথায় হয়েছে শুনলাম। ঢাকায় এলেই কবর যিয়ারত করব এবং বাসায় যাব—ওয়াদা দিলাম। রাতে আরেকজন ফোন করে বলল, জুনায়েদ মাহদীর বাবা ইনতিকাল করেছেন শুনেছেন? হঠাৎ ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।আচ্ছা, তিনি কি সত্যিই ইনতিকাল করেছেন? অন্যরাও জানে এই সংবাদ? তার মানে আর কোনোদিন তার সঙ্গে দেখা হবে না? অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র, অমায়িক, বিনয়ী এই মানুষটির সঙ্গে আর কোনোদিন কথা হবে না? তাহলে কি…? এত কষ্ট হলো যে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মনে হলো, আমিই মৃত্যু বরণ করেছি। আমি মৃত্যু বরণ করলে কি এরচেয়ে বেশি কষ্ট হবে?
তিনি চলে গেছেন। কিন্তু দুনিয়ার সবকিছু চলছে আগের মতোই। সবাই আপন গতিতে কাজ করছে। একান্ত আপনজনেরা খুব শোকাহত। শোকাহত থাকবে কিছুদিন। এরপর তাদের জীবনও আবার গতি পাবে। স্বাভাবিকভাবেই চলবে তাদের সব কার্যক্রম। একটা শূন্যতা তাদের থাকবে ঠিক। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাই স্বাভাবিক হয়ে যাবে একসময়। আরো কয়েক দশক অতিক্রান্ত হলে হয়ত তাকে মনে করার সময় সুযোগও কমে যাবে। আপন ব্যস্ততায় সবাই আপন গতিতে চলবে। তাহলে….? ভাবতে ভাবতে বেশ কিছুক্ষণ দম বন্ধ লাগছিল। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছিল, হে পৃথিবী! তুমি আমার কেউ না। এই পৃথিবীর কেউ আমার আপন না। আমি একা। একা এসেছি। একাই চলে যাব। আমার আমল ছাড়া আর কিছুই আমার সঙ্গে যাবে না। যতদিন হিতকামী ঘনিষ্ট কেউ আমার কথা মনে করবে, বুঝ সমঝ থাকলে কিছু ইসালে সওয়াব হয়ত করবে। এরপর? আমি মুছে যাব এই দুনিয়া থেকে। এই দুনিয়ার সবকিছু থেকে। তাহলে কেন নিজেকে ভুলে, নিজের আমলের কথা ভুলে, আখিরাতকে উপেক্ষা করে অন্যের জন্য মরিয়া হয়ে ছুটি? কেন?
ভাবতে ভাবতে চোখে পানি চলে এলো। তখন মাহদীর বাবার জন্যও কিছু ইসালে সওয়াব করলাম। আর আল্লাহকে বললাম, হে আল্লাহ! এই বুঝ ও অনুভূতি আমার মাঝে সজাগ করে দিন। এই বুঝের তাকাযা অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। মাহদীর বাবা জনাব সিরাজুল ইসলাম সাহেবকে আপনি জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। সকল মুমিন মুসলমানকে আপনি ক্ষমা করে দিন। জান্নাত দান করুন। আমাদের জন্যও জান্নাতের ফায়সালা করুন হে মালিক!
















